Posts

চিন্তা

কওমি শিক্ষা, জামায়াত এবং ধর্মীয় রাজনীতির ভবিষ্যৎ

July 18, 2026

ফারদিন ফেরদৌস

29
View

আমাদের দেশে কওমি শিক্ষাব্যবস্থার একটি অদ্ভুত সাংস্কৃতিক রূপান্তর চোখে পড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে "দুষ্টু হুজুর", "মিষ্টি হুজুর", "কওমির কিং", "কিউট হুজুরনি", "ছেলে সুন্দরী", "বিয়ে পাগলামি", "যৌবন জ্বালা" -এ ধরনের নামে অসংখ্য আইডি ও কনটেন্ট জনপ্রিয় হচ্ছে। জ্ঞাতসারে অথবা না বুঝেই পেডোফিলিয়া ও পেডারাস্টি প্রমোট করা হচ্ছে। ঘরে ঘরে তৈরি হচ্ছে pedophile ও pedarast. 

ছেলে বা মেয়েশিশু ধর্ষণ কিংবা যৌন নিপীড়নের পক্ষে সম্মতি উৎপাদন করা হচ্ছে। বাল্যবিয়ে ও বহুবিবাহ নামের নারী হেনস্থাকে স্বাভাবিকীকরণ করবার প্রয়াস পাওয়া হচ্ছে। 

ধর্মীয় জ্ঞানচর্চার পরিবর্তে যখন মনোযোগের বড় অংশ এমন বিকৃত বিনোদননির্ভর বা ইঙ্গিতপূর্ণ উপস্থাপনার দিকে ঝুঁকে পড়ে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে -একটি বৃহৎ শিক্ষাধারা কি তার প্রকৃত বৌদ্ধিক ও সামাজিক ভূমিকা যথাযথভাবে পালন করতে পারছে? 

আরও একটি প্রশ্ন আমাদেরকে ভাবায়। কওমি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কতজন চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, গবেষক, অধ্যাপক, ব্যারিস্টার, সাংবাদিক, শিল্পী, সাহিত্যিক, প্রশাসক কিংবা প্রযুক্তিবিদ তৈরি হচ্ছেন? সমাজের প্রতিটি পেশাজীবীর সেবা তো তারা সানন্দচিত্তে গ্রহণ করেন; কিন্তু আধুনিক জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র নির্মাণে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক অবদান কতটুকু? তারা কৃষিকাজের মতো জীবনদায়ী কাজটার ছিটেফোঁটাও কি করতে পারেন? আবহাওয়া, বীজ, সার ও পেস্টিসাইড ব্যবস্থাপনার সামান্যতম কিছুও জানেন? এটি কোনো বিদ্বেষের প্রশ্ন নয়, বরং একটি শিক্ষাব্যবস্থার সামাজিক সক্ষমতা নিয়ে আত্মসমালোচনার প্রশ্ন। 

একই সঙ্গে এটিও সত্য, কওমি অঙ্গনকে ঘিরে যৌন নিপীড়ন ও শিশুর প্রতি সহিংসতার অভিযোগ যখনই সামনে আসে, তখন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা কেবল বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে নয়, রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। অপরাধের নিরপেক্ষ বিচার অবশ্যই হওয়া উচিত; কিন্তু কোনো অপরাধকে পুরো একটি শিক্ষাব্যবস্থার স্থায়ী পরিচয় বানিয়ে ফেলা যেমন অন্যায়, তেমনি অপরাধ আড়াল করাও সমান অন্যায়। জবাবদিহি ও সংস্কার -দুটিই গুরুতরভাবেই প্রয়োজন। 
খেয়াল করলেই দেখবেন সারা পৃথিবীর বিচারে ৬০ ভাগ কওমি জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের দখলে আছে। কিন্তু তারা দেশের রাজনীতি বদলের ক্ষমতা রাখে না। আল্টিমেটলি ঢিলা কুলুপে মজে থেকে অলিগার্ক ও ক্যাপিটালিস্টদের রাজনীতি অনুধাবন করা সম্ভবপর না। ব্যক্তির মনস্তত্ত্ব আধুনিক না হলে -পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র বদলের স্বপ্ন দেখা রীতিমতো অপরাধ। 

আমাদের পর্যবেক্ষণে, বাংলাদেশের ধর্মীয় রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতা আজ কেবল ভোটের নয়; এটি প্রভাবের প্রতিযোগিতা, বিশেষকরে ধর্মীয় শিক্ষার ওপর প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা। জামায়াতে ইসলামীর নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষের উপস্থিতি লক্ষণীয়। কিন্তু তাদের সাংগঠনিক কৌশল এমন যে, আধুনিক রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে ধর্মীয় আবেগকে দক্ষতার সঙ্গে মিলিয়ে ফেলতে পারে। এই কারণেই তাদের প্রভাব কেবল সাংগঠনিক শক্তিতে নয়, আদর্শিক পরিসরেও বিস্তৃত। 

জামায়াতের রাজনীতিটা কেন এতটা প্রভাববিস্তারি? জামায়াতের যারা নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে আছে তারা সবাই সুশিক্ষিত, তাদের সন্তানেরাও বৃটেন-আমেরিকায় পড়াশোনা করা মানুষ। কিন্তু তাদের চাতুরিটা হলো -প্রান্তিক সদস্য ও অনুসারীদের মধ্যে ধর্মের জুজুটা ঠিকঠাক বহাল রাখতে পারে। বাস্তবে তারা অত্যাধুনিক -কিন্তু কৌশলে দেখনদারি র‌্যাডিক্যাল। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ র‌্যাডিক্যালিজম খায়। এমনকি ইঞ্জিনিয়ার-ডাক্তার-প্রফেসর-আমলারাও। 

তাই প্রশ্নটি কওমি বনাম জামায়াত নয়; বরং ধর্মীয় শিক্ষার ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে? যদি ধর্মীয় শিক্ষা এমন কোনো রাজনৈতিক শক্তির একচ্ছত্র প্রভাবের অধীনে চলে যায়, তবে তার প্রভাব শুধু মাদ্রাসায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; রাষ্ট্র, সমাজ, সংস্কৃতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চিন্তার জগতেও তার দীর্ঘ ছায়া পড়বে। 

আমাদের বিশ্বাস, বাংলাদেশের সংকট ধর্মীয় নয়, রাজনৈতিকও নয়; সংকটটি মূলত বুদ্ধিবৃত্তিক। যতদিন ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থ মানুষের সামষ্টিক কল্যাণের ঊর্ধ্বে থাকবে, ততদিন সভ্যতার ভাষা বারবার পরাজিত হবে ক্ষমতার ভাষার কাছে। রাষ্ট্রের মুক্তি তখনই সম্ভব, যখন শিক্ষা -ধর্মীয় হোক বা আধুনিক; মানুষকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে শেখাবে, কেবল অন্ধ অনুসরণ করতে নয়। আপনাদের কী মনে হয়? 
লেখক: সাংবাদিক 
১৮ জুলাই ২০২৬
 

Comments

    Please login to post comment. Login