ঘড়িতে তখন ভোর সাড়ে চারটে। কুয়াশায় মোড়া শিয়ালদহ স্টেশন চত্বরটা যেন এক মায়াপুরী। পিঠে ভারী ট্র্যাকিং ব্যাগটা চাপিয়ে যখন কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেসে উঠলাম, তখনো মনের ভেতর একটা অদ্ভুত উত্তেজনা কাজ করছিল। কলকাতার চেনা কোলাহল, অফিসের ল্যাপটপ স্ক্রিন আর ইমেলের চোরবালির থেকে কয়েক দিনের মুক্তি। আমার গন্তব্য উত্তরবঙ্গের এক ছোট্ট, অচেনা পাহাড়ি গ্রাম—লেপচাজগৎ।
ট্রেন যখন নিউ জলপাইগুড়ি পৌঁছাল, তখন ঘড়িতে দুপুর। সেখান থেকে একটা গাড়ি ভাড়া করে পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে আমাদের যাত্রা শুরু হলো। যত ওপরে উঠছি, সমতলের গরম কমে বাতাস তত ঠান্ডা আর খাঁটি হয়ে উঠছে। দুপাশে পাইন আর ধূপির জঙ্গল, আর মাঝে মাঝে মেঘের দল এসে রাস্তাটাকে ঢেকে দিচ্ছে। ড্রাইভার শেরপা জাস্টিন একটা নেপালি গান গুনগুন করছিলেন, যা পাহাড়ি পথের আবহাওয়াকে আরও মায়াবী করে তুলেছিল।
বিকেলের দিকে যখন লেপচাজগৎ পৌঁছালাম, সূর্য তখন অস্তাচলে। আমাদের হোমস্টে-র বারান্দা থেকে দূরে কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়াটা আবছা দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু আসল চমকটা অপেক্ষা করছিল পরের দিন ভোরের জন্য।
সেই জাদুকরী ভোর
ভোর পাঁচটায় অ্যালার্ম বাজার আগেই কনকনে ঠান্ডায় ঘুমটা ভেঙে গেল। গায়ে থার্মাল আর জ্যাকেট চাপিয়ে চটজলদি বেরিয়ে পড়লাম হোমস্টে-র ছাদে। বাইরে তখনো হালকা অন্ধকার। চারিদিক নিস্তব্ধ, শুধু পাইন বনে হাওয়ার শনশন শব্দ।
হঠাৎ করেই আকাশের পূর্ব কোণটা লাল হতে শুরু করল। আর ঠিক তখনই, মেঘের পর্দা সরিয়ে রাজকীয় ভঙ্গিতে দেখা দিলেন তিনি—কাঞ্চনজঙ্ঘা।
- প্রথমে চূড়াটাতে যেন কেউ গলানো সোনা ঢেলে দিল।
- আস্তে আস্তে সেই সোনালী রঙ বদলে গেল টকটকে কমলায়।
- সবশেষে, ভোরের আলো ফুটতেই পাহাড়ের গা ধোয়া সাদা বরফ রুপোর মতো চকচক করে উঠল।
সেই দৃশ্য দেখে আমার মুখ থেকে কোনো কথা বেরোচ্ছিল না। ক্যামেরার শাটার চাপতেও ভুলে গিয়েছিলাম কয়েক মুহূর্তের জন্য। প্রকৃতির এই বিশালতার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে খুব ছোট, কিন্তু ভীষণ সুখী মনে হচ্ছিল। শহরের সব ক্লান্তি, সব মানসিক চাপ যেন ওই এক পলকেই কর্পূরের মতো উবে গেল।
অরণ্যের নিস্তব্ধতা
দুপুরে আমরা হেঁটে রওনা দিলাম পাইন বনের ভেতর দিয়ে। শুকনো পাইন পাতার ওপর দিয়ে হাঁটার সময় একটা মচমচ শব্দ হচ্ছিল। জঙ্গলটা এতই শান্ত যে নিজের হৃদস্পন্দন নিজেই শুনতে পাওয়া যায়। মাঝে মাঝে অচেনা কিছু পাহাড়ি পাখির ডাক সেই নিস্তব্ধতা ভাঙছিল।
হাঁটতে হাঁটতে এক জায়গায় এসে বসলাম একটা পাথরের ওপর। মেঘেরা তখন আমাদের পায়ের নিচ দিয়ে ভেসে যাচ্ছে। মনে হচ্ছিল, কোনো এক রূপকথার দেশে চলে এসেছি, যেখানে সময়ের কোনো তাড়া নেই, ডেডলাইনের কোনো ভয় নেই।
ফিরে আসা
তিনটে দিন কীভাবে কেটে গেল বুঝতেই পারলাম না। স্থানীয় পাহাড়িদের সরল হাসি, গরম মোমো আর থুপকার স্বাদ, আর পাহাড়ি আতিথেয়তা আমার মনের মণিকোঠায় পাকাপাকি জায়গা করে নিল।
কলকাতায় ফেরার ট্রেনে যখন উঠলাম, তখন ল্যাপটপের ব্যাগটা আর ভারী মনে হচ্ছিল না। কারণ আমার মনের ব্যাগে তখন জমা হয়ে গেছে পাহাড়ের তাজা বাতাস, পাইন বনের সুবাস আর কাঞ্চনজঙ্ঘার সেই প্রথম আলোর জাদু। পাহাড় আমাকে আবার নতুন করে বাঁচার শক্তি দিয়ে ফিরিয়ে দিল।