জামালকে বললাম, ‘বন্ধু, আজকের রাতটা আমার সাথে থাকনা। গল্প করতে করতে ঘুমানো যাবে’। জামাল এর কিছু একটা সন্দেহ হলো।
বললো, ‘আমি বুঝতে পারছি তোর একা থাকতে ভয় করছে। কোন অসুবিধা নেই। আমি থাকবো’। রাতে আয়তুল কুরসি পড়ে মনে সাহস নিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। ভোরবেলা যথারীতি ঘুম ভাঙতেই খেয়াল করলাম কোন শব্দ আছে কিনা। কিন্তু ভোরের স্নিগ্ধ নিরবতা ছাড়া কিছু টের পেলাম না। এ কি আশ্চর্য কাণ্ড! তবে যাই হোক একটা অদ্ভুত প্রশান্তি অনুভব করলাম। যাক! সবই মনের ভুল! কখনো একা থাকিনি তাই উল্টোপাল্টা কল্পনা করেছি। ধুর! নিজের কাছেই লজ্জা লাগলো।
রাতে জামালের সাথে অনেক রাত পর্যন্ত গল্প করে ওকে বিদায় দিয়ে নিজের রুমে ঘুমিয়ে পড়লাম। ভোরে ঘুম ভাঙতেই আমার মাথার পাশের টেবিল থেকে ধাম করে কিছু একটা চেয়ারে পড়লো, তারপর আবার বিকট শব্দে ফ্লোরে পড়লো, তারপর ঝপাস করে পানিতে পড়লো। এই অবস্থা দেখে আমি জোরে জোরে আয়তুল কুরসি পড়তে পড়তে রুম থেকে এক দৌড়ে বেড়িয়ে যাই। কলেজে সারাদিন কারও সাথে কোন কথা বললাম না। বিকেলে বাচ্চাদের পড়ানোর সময় রুমটার দিকে তাকাতে কেমন গা ছমছম করছিলো। মনে হচ্ছিলো যেন কেউ আমার জন্য অপেক্ষা করে আছে!
রাতে কোন খেয়ে খুব তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ালাম এখানে বেশিদিন থাকা যাবে না বুঝে গিয়েছি। কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানিনা। ভোরে আজানের শব্দে আস্তে করে চোখটা খুললাম। টের পেলাম খাটটা নড়ছে। ভূমিকম্প হচ্ছে? মাথাটা তুলতেই কিছু একটা ধাপ করে টেবিলে লাফ দিলো। আমি টেবিলের উপরে সাথে সাথে তাকালাম। স্পষ্ট নড়ে উঠতে দেখলাম টেবিলটাকে। টেবিল থেকে জিনিসটা চেয়ারে পড়লো, তারপর মেঝেতে, তারপর মেঝে থেকে পানিতে। এই পুরোটা ঘটনা যেন আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম। কিন্তু কি এভাবে চলে গেলো কিচ্ছুটি বুঝতে পারলাম না!
বন্ধু জামালকে পুরো ঘটনা খুলে বললাম। জামাল সব শুনে কোন সুরাহা করতে পারলো না। কারণ এমন ঘটনা এবারই প্রথম শুনেছে। অবশ্য না শোনারই কথা কারণ আমার আসার আগে এই কামরা সবসময় খালিই পড়ে থাকতো। জামাল আমাকে নিয়ে রুমে আসলো। আমি ব্যাগপত্র গোছাতে লাগলাম। আজকের গাড়িতেই বাড়ি যাব। কাজের ফাঁকে খেয়াল জামাল জানালা দিয়ে শূন্যে তাকিয়ে কিছু একটা ভাবছে।
‘জামাল আমি দুপুর বারোটার গাড়িতে রওনা হবো।’
আমি কাছে এসে ডাকতেই ওর ভাবনার জগতে ছেদ পড়লো।
‘জানালা দিয়ে কি দেখছিস বলতো। এখান থেকে কিছু দেখতে পাবি না। ভৌতিক কোন সত্তা…’
‘তুই কি একটা ব্যাপার খেয়াল করেছিস?’
‘কি ব্যাপার?’
‘তুই যে ঘটনাটা শোনালি আজ, আমি প্রতিটা ঘটনার মাঝে একটা প্যাটার্ন লক্ষ্য করলাম। যে ‘অশরীরী সত্ত্বা’ বা ‘ভৌতিক সৃষ্টি’ যাই বলিস না কেনো, তোকে বিরক্ত করলো, প্রথমদিন সেটি মেঝে থেকে পানিতে পড়লো। দ্বিতীয় দিন প্রথমে খাটের পাশের চেয়ার থেকে মেঝে, তারপর মেঝে থেকে পানিতে পড়লো। তৃতীয় দিন প্রথমে খাটের সাথে লাগোয়া টেবিল থেকে চেয়ারে, তারপর চেয়ার থেকে মেঝেতে এবং শেষে মেঝে থেকে পানিতে পড়লো। আর সর্বশেষ দিন এটি খাট থেকে টেবিল, টেবিল থেকে চেয়ার, চেয়ার থেকে মেঝে এবং সবশেষে মেঝে থেকে পানিতে পড়লো।’
‘তুই কি বুঝতে পারছিস জিনিসটা একটু একটু করে তোর কাছে আসছিলো। আমি সত্যিই জানি না এই রুমে আর একটা রাত কাটালে তোর সাথে কি ঘটবে!’
জামাল হঠাৎ কি যেন দেখতে পেলো।
এগিয়ে গিয়ে খাটের হার্ডবোর্ড টায় কিছু খুঁজে পেলো। জামালের সাথে সাথে আমিও গিয়ে দেখলাম ছাপগুলো। লম্বা চার আঙুলের ছাপ ডেবে আছে খয়েরী কাঠের উপর।
‘মনে হচ্ছে অনেকক্ষণ বসে ছিলো। তোকে সারারাত দেখতো জিনিসটা।’
‘জামাল এখন এসব বাদ দে প্লিজ। আমার কেমন যেন বমি বমি লাগছে। সুমি আপুকে বলে দিস বাচ্চাদের পরীক্ষা পর্যন্ত থাকতে পারলাম না। আমার উপর যেন কোন রাগ না রাখে।’
তার কিছুক্ষণ পরই আমি রওনা দিলাম সবার কাছে বিদায় নিয়ে। সুমি আপা বেশ রাগ করলেন প্রথমে। তবে নতুন চাকরি হয়েছে শুনে অবশ্য খুশি হলেন। বাসে উঠে যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। এ জীবনে তারপরে আর কখনও লজিং থাকা হয়নি। তবে এই ঘটনা আমি আমার জীবনে ভুলবো না।