আমি দ্রুত পদে ঘরে চলে গেলুম। বুঝলুম ইনি ঘটক ঠাকুরন আমার সম্বন্ধ এনেছেন।
মা চেচিয়ে বললেন কাপড় ছেড়ে একবার এসে বস মা।
কাপড় ছাড়া চুলোয় গেল, ভিজে কাপড়ে দোরের আড়ালে দাঁড়িয়ে কান পেতে শুনতে লাগলুম। বুকের কাঁপুনি যেন আর থামতে চায় না শুনতে পেলুম চিতর গ্রামের কে একজন রাধা বিনোদ মুখুজের ছেলে ঘনশ্যাম পোড়া কপালে নাকি অনেক দুঃখ ছিল ,তাই আজ যে নাম জপের মন্ত্র সে নাম শুনে সেদিন গা জ্বলে যাবে কেন?
শুনলুম বাপ নেই কিন্তু মা আছেন। ছোট দুটি ভাই এক ভাইয়ের বিয়ে হয়েছে ।একটি এখনো পড়ে ।সংসার বড়ই ঘরে তাই এন্ট্রাস পাস করেই রোজগারের ধান্দায় পড়া ছাড়তে হয়েছে।ধান,চাল, পাট তিসি প্রভৃতির দালালি করে উপায় মন্দ করেন না ।তার ই ওপর নির্ভর। তাছাড়া ঘরে নারায়ণ শিলা আছেন ,দুটো গরু আছে বিধবা বোন আছে- নেই কি?
নেই শুধু সংসারের বড় বউ। সাত বছর আগে বিয়ের এক মাসের মধ্যেই তিনি মারা যান । আর তারপর এতদিন বাদে এই চেষ্টা। সাত বচ্ছর ! ঘটকিকে উদ্দেশ্য করে মনে মনে বললুম পোড়ামুখী এতদিন কি তুই শুধু আমার মাথা খেতেই চোখ বুঝে ঘুমুচ্ছিলি?
মায়ের ডাকাডাকিতে কাপড় ছেড়ে কাছে এসে বসলুম!
সে আমাকে খুটিয়ে দেখে বললে, মেয়ে পছন্দ হয়েছে,
এখন দিন স্থির করলেই হল মায়ের চোখ দুটিতে জল টলটল করতে লাগলো , বললেন তোমার মুখে ফুল চন্দন পড়ুক মা আর কি বলব!
মামা শুনে বললেন এন্ট্রান্স ? তবে বলে পাঠা এখন বছর দুই শুরুর কাছে ইংরেজি পড়ে যাক তবে বিয়ের কথা কওয়া যাবে।
মা বললেন তোমার পায়ে পড়ি দাদা অমত করোনা , এমন সুবিধে আর পাওয়া যাবে না দিতে ঠুতে কিছু হবে না-
মামা বললেন তাহলে হাত-পা বেঁধে গঙ্গায় ডেগে যা , সেও এক পয়সা চাইবে না!
মা বললেন পনেরো ই পা দিলেন যে,
মামা বললেন তা তো দেবেই ১৫ বছর বেঁচে রয়েছে যে!
মার আগে দুঃখে কাঁদো কাঁদো হয়ে বললেন তুমি কি ওর তবে বিয়ে দেবে না দাদা ?এরপরে একেবারেই পাত্র জুটবে না।
মামা বললেন সেই ভয়ে তো আগে থেকে ওকে জলে ফেলে দিতে পারা যায় না!
মা বললেন ছেলেটিকে একবার নিজের চোখে দেখে এসো না দাদা , পছন্দ না হয় না দেবে।
মামা বললেন সে ভালো কথা রবিবার যাব বলে চিঠি লিখে দিচ্ছি।
ভাঙচির ভয়ে কথাটা মা গোপনে রেখেছিলেন এবং মামাকেও সাবধান করে দিয়েছিলেন ।তিনি জানতেন না এমন চোখ-কানো ছিল যাকে কোন সতর্কতা ফাঁকি দিতে পারেনা ।
বাগানে এক টুকরো শাকের ক্ষেত করেছিলুম। দিন দুই পড়ে দুপুরবেলা একটা ভাঙ্গা খুন্তি নিয়ে তার ঘাস তুলছি, পায়ের শব্দে মুখ ফিরিয়ে দেখি নরেন । তার সেরকম মুখের চেহারা অনেকদিন পরে আর একবার দেখেছিলুম । সত্যি কিন্তু আগে কখনো দেখিনি ওকে । এমন একটা ব্যথা বাজলো যা কখন কোন দিন পাইনি। সে বললে আমাকে ছেড়ে কি সত্যিই চললে?
কথাটা বুঝেও যেন বুঝতে পারলুম না ।বলে ফেললুম কোথায়?
সে বললে চিতোর ,স্পষ্ট হবা মাত্রই লজ্জায় আমার মাথা হেঁট হয়ে গেল কোন উত্তর মুখে এলো না।
সে পুনরায় বললে, তাই আমিও বিদায় নিতে এসেছি বোধহয় জন্মের মতই কিন্তু তার আগে দুটো কথা বলতে চাই- শুনবে?
বলতে বলতে তার গলাটা যেন ধরে গেল তবুও আমার মুখে কথা যোগালো না ,কিন্তু মুখ তুলে চাইলুম একি! দেখি তার দুচোখ বেয়ে ঝরঝর করে জল পড়ছে।
ওরে পতিতা! ওরে দুর্বল নারী! মানুষের চোখের জল সহ্য করবার ক্ষমতা ভগবান তোকে যখন একেবারে দেননি তখন তোর আর সাধ্য ছিল কি!
দেখতে দেখতে আমারও চোখের জলে বুক ভেসে গেছে নরেন কাছে এসে খোঁচার খুঁট দিয়ে আমার চোখ মুছিয়ে হাত ধরে বললে,, চলো ওই গাছটার তলায় গিয়ে বসি গে, এখানে কেউ দেখতে পাবে।
মনে বুঝলুম এ অন্যায় ,একান্ত অন্যায় ! কিন্তু তখনও যে তার চোখের পাতা ভিজে তখনও যে তার কণ্ঠস্বর কান্নায় ভরা।
বাগানের এক প্রান্তে একটা কাঁঠালি চাপারকুঞ্জ ছিল তার মধ্যে সে আমাকে ডেকে নিয়ে গিয়ে বসালে।
একটা ভয়ে আমার বুকের মধ্যে দূর দূর করছিল ,কিন্তু সে নিজেই দূরে গিয়ে বসে বললে এই একান্ত নির্জন স্থানে তোমাকে ডেকে এনেছি বটে কিন্তু তোমাকে ছোঁব না এখনো তুমি আমার হওনি।
তার শেষ কথায় আবার পোড়া চোখে জল এসে পড়ল।
আচলের চোখ মুছে মাটির দিকে চেয়ে চুপ করে বসে রইলুম।
তারপর অনেক কথাই হল, কিন্তু থাক শেষ সব আজও তো প্রতিদিনকার অতি তুচ্ছ ঘটনাটি পর্যন্ত মনে করতে পারি মরনেও যে বিস্তৃতি আসবে সে আশা করতেও যেন ভরসা হয় না।
একটা কারণে আমি আমার এত বড় দূর গতিতেও কোনদিন বিধাতাকে দোষ দিতে পারিনি। স্পষ্ট মনে পড়ে আমার চিত্তের মাঝে থেকে নরেনের সংসদ তিনি কোনদিন প্রসন্ন চিত্তে গ্রহণ করেননি। সে যে আমার জীবনে কত বড় মিথ্যা ,এ তো তার অগোচর ছিল না। তাই তার প্রণয় নিবেদনের মুহূর্তের উত্তেজনা পরক্ষণেক্ষণের কত বড় অবসাদে যে ডুবে যেত সে আমি ভুলিনি।
যেন কার কত চুরি -ডাকাতি সর্বনাশ করে ঘরে ফিরে এলুম এমনি মনে হতো। কিন্তু এমনই পোড়া কপাল যে অন্তর্যামীর এত বড় ইঙ্গিতেও আমার হুশ হয়নি। হবেই বা কি করে ,,কোনদিন তো শিখিনি যে ভগবান মানুষের বুকের মধ্যেও বাস করেন এই সবই তারই নিষেধ।
মামা পাত্র দেখতে যাত্রা করলেন ।যাবার সময় কতই না ঠাট্টা তামাশা করে গেলেন ।মা মুখ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। মনে মনে বেশ বুঝলেন এ যাওয়া পন্ডশ্রম। পাত্র তার কিছুতেই পছন্দ হবে না।
কিন্তু আশ্চর্য ফিরে এসে সে আর বড় ঠাট্টা- বিদ্রুপ করলেন না। বললেন হ্যাঁ ছেলেটি পাস টাস তেমন কিছু করতে পারেনি বটে, কিন্তু মুখ্য বলেও মনে হলো না ,তাছাড়া বড় নম্র বড় বিনয়ী আর একটা কি জিনিস ছেলেটির মুখের ভাবে কি একটা আছে ইচ্ছে হয় বসে বসে আরো দুদন্ড আলাপ করি।
মা আহ্লাদে মুখখানি উজ্জ্বল করে বললেন তবে আর আপত্তি করো না দাদা মত দাও- সদুর একটা কিনারা হয়ে যাক।
মামা বললেন, আচ্ছা ভেবে দেখি।
আমি আড়ালে দাঁড়িয়ে নিরাশার আশাটুকু বুকে চেপে ধরে মনে মনে বললুম ,মামা এখনো মতি স্থির করতে পারেনি ।এখনো বলা যায় না । কিন্তু কে জানত তার ভাগ্নির বিয়ের সম্বন্ধে মত স্থির করবার পূর্বেই তার নিজের সম্বন্ধে মতিস্থিতির করবার ডাক এসে পড়বে । যাকে বলে সারা জীবন সন্দেহ করে এসেছেন তার দূত
এসে যখন একেবারে মামার শিয়রে দাঁড়ালো তখন তিনি চমকে গেলেন তার কথা শুনে আমাদেরও বড় কম চমক লাগল না।