আর ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন অধ্যাপক আরিফ সামদানী।
"কী সামদানী বাবু, রহস্যের জট খুলল? দরজা ভেতর থেকে বন্ধ থাকলে খুনটা করল কে? ভূত?" মাহবুব সাহেব অধৈর্য হয়ে উঠলেন।
"ভূত নয় মাহবুব সাহেব, খুনটা করেছে বিজ্ঞান। আর খুনি এই ঘরের ভেতরেই আছেন," আরিফ চশমাটা মুছে আবার চোখে পরলেন। "এটি একটি নিখুঁত 'বদ্ধ ঘরের রহস্য' বা ক্লোজড-রুম মিস্ট্রি। কিন্তু খুনি একটা মস্ত বড় ভুল করে গেছেন। তিনি ভুলে গিয়েছিলেন যে, প্রকৃতির নিয়মকে ফাঁকি দেওয়া গেলেও পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রকে ফাঁকি দেওয়া যায় না।"
ড. সুরঞ্জিত কিছুটা আমতা আমতা করে বললেন, "আপনি কী বলতে চান পরিষ্কার করে বলুন।"
"বলছি। ড. রাশেদ করিম গত কয়েক মাস ধরে একটা গোপন প্রজেক্টে কাজ করছিলেন। প্রজেক্টের নাম—'মাইক্রো ব্ল্যাক হোল' বা অতি-ক্ষুদ্র কৃত্রিম কৃষ্ণগহ্বর তৈরি। তিনি ল্যাবের এই শক্তিশালী কণা ত্বরক যন্ত্র ব্যবহার করে মাত্র কয়েক মিলিমিটার ব্যাসের একটি কৃত্রিম ব্ল্যাক হোল তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি জানতেন, হকিং রেডিয়েশনের কারণে এই ব্ল্যাক হোলটি তৈরি হওয়ার এক সেকেন্ডের মধ্যেই বিপুল শক্তি বিকিরণ করে নিজে থেকেই ধ্বংস হয়ে যাবে। ফলে ভয়ের কিছু নেই।"
আরিফ সাজিদের দিকে তাকালেন। সাজিদ তখন ভয়ে কাঁপছে।
"কিন্তু," আরিফের গলা গম্ভীর হয়ে উঠল, "ড. রাশেদের এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের কৃতিত্ব নিজের নামে চালাতে চেয়েছিলেন ড. সুরঞ্জিত দত্ত। তিনি সাজিদকে মোটা অঙ্কের টাকার লোভ দেখিয়ে হাত করেন। সাজিদ ল্যাবের মূল কম্পিউটারের প্রোগ্রামিংয়ে একটা সূক্ষ্ম পরিবর্তন এনেছিল। গত রাত ঠিক দুটোয় ড. রাশেদ যখন এই চেয়ারে এসে বসেন, তখন সাজিদের সেট করা প্রোগ্রাম অনুযায়ী কণা ত্বরক যন্ত্রটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হয়ে যায় এবং ঠিক ড. রাশেদের মাথার এক ইঞ্চি ওপরে একটি তীব্র মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র—অর্থাৎ একটি মাইক্রো ব্ল্যাক হোল তৈরি করে।"
ঘরে তখন পিনপতন নীরবতা। আরিফ বলতে থাকলেন, "ব্ল্যাক হোলের মহাকর্ষ বল কতটা তীব্র তা আমরা জানি। ওই এক সেকেন্ডের জন্য ড. রাশেদের মাথার ওপর যে টান তৈরি হয়েছিল, তা তার শরীরের ভেতরের কোষ আর হাড়কে এক নিমেষে চূর্ণ করে দেয়। যেহেতু ব্ল্যাক হোলের আকর্ষণ শুধু একটা নির্দিষ্ট কেন্দ্রে কাজ করছিল, তাই তার চারপাশের ল্যাব কোটটি অক্ষত রয়ে যায়। কিন্তু তীব্র মহাকর্ষের টানে টেবিলের ওপর থাকা কফির মগটি বিকৃত হয়ে যায়।"
"কিন্তু সময়? ঘড়ির সময়ের অমিল কেন?" মাহবুব সাহেব প্রশ্ন করলেন।
"আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার সূত্র বা থিওরি অফ রিলেটিভিটি," আরিফ হাসলেন। "তীব্র মহাকর্ষের কারণে ব্ল্যাক হোলের ঠিক কাছাকাছি এলাকায় সময় ধীর হয়ে যায়, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে 'টাইম ডাইলেশন'। ড. রাশেদের হাতঘড়িটি ব্ল্যাক হোলের একদম কাছে ছিল, তাই সেটি ৩ মিনিট পিছিয়ে যায়। আর তীব্র শক্তির বিকিরণে দেয়ালঘড়ির ইলেকট্রনিক্স সিস্টেম রাত ২টা ১৪ মিনিটে চিরতরে নষ্ট হয়ে যায়। এটাই হলো তিন মিনিটের রহস্য।"
ড. সুরঞ্জিত চিৎকার করে উঠলেন, "এসব আপনার মনগড়া গল্প! প্রমাণ কোথায়? দরজা তো ভেতর থেকে লকড ছিল!"
"প্রমাণ আছে সুরঞ্জিত বাবু," আরিফ তার ব্যাগ থেকে একটা ডায়েরি বের করলেন। "পুলিশ যখন সাজিদের কোয়ার্টার তল্লাশি করে, তখন এই ডায়েরিটা পায়। এখানে সাজিদ নিখুঁতভাবে লিখে রেখেছে কীভাবে আপনি তাকে দিয়ে কোডিং করিয়েছেন এবং আপনার বিদেশি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে তাকে কত টাকা দেওয়া হয়েছে। আর দরজার রহস্য? সাজিদ যখন ল্যাব থেকে বের হয়, তখন দরজা খোলাই ছিল। আপনি রাশেদের লাশ দেখার পর চতুরতার সাথে সাজিদের কাছ থেকে মূল চাবিটি নিয়ে ল্যাবের স্বয়ংক্রিয় ড্রপ-বক্সে ওটা ফেলে দেন, যাতে মনে হয় চাবিটি ভেতর থেকেই ড্রপ-বক্সে পড়েছে এবং রুমটি লকড ছিল।"
সুরঞ্জিত দত্তের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। তিনি মেঝেতে ধপ করে বসে পড়লেন। সাজিদ ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে নিজের অপরাধ স্বীকার করল।
ডিএসপি মাহবুব মুগ্ধ চোখে আরিফ সামদানীর দিকে তাকিয়ে রইলেন। "ধন্য মশাই আপনার বুদ্ধি! আপনি তো পুরো ফেলুদার মতো কেসটা সমাধান করে দিলেন।"
আরিফ সামদানী মৃদু হেসে তার ব্যাগটি কাঁধে তুলে নিলেন। ল্যাব থেকে বের হয়ে তিনি পদ্মার তীরের খোলা বাতাসে এসে দাঁড়ালেন। বিকেলের মিষ্টি হাওয়া তার চুলে দোলা দিয়ে গেল। বিজ্ঞান যেখানে অপরাধের হাতিয়ার হয়, সেখানে বিজ্ঞান দিয়েই তার জবাব দিতে হয়—মনে মনে ভাবলেন বাংলার এই নতুন ঘরানার গোয়েন্দা।