Posts

ফিকশন

আলেয়া বা ডাইনির আলোর বৈজ্ঞানিক রহস্য

July 19, 2026

MD.Numayer Islam Nahid

10
View

গ্রামবাংলার বিস্তীর্ণ বিল, হাওর, বাঁওড় কিংবা স্যাঁতসেঁতে জলাভূমিতে রাতের অন্ধকারে হঠাৎ আলো জ্বলে উঠতে দেখা যায়। স্থানীয় মানুষ একে 'আলেয়া' বা 'ডাইনির আলো' বলে থাকে। বহু বছর ধরে গ্রামীণ সমাজে গভীর বিশ্বাস ছিল যে, এগুলো মৃত মানুষের অতৃপ্ত আত্মা বা কোনো অপদেবতার মায়াজাল। লোককথা অনুযায়ী, এই আলোগুলো কখনো এক জায়গায় স্থির থাকে, আবার কখনো অলৌকিকভাবে বাতাসে ভেসে বেড়ায়। দূর থেকে দেখে মনে হয় কেউ লণ্ঠন বা মশাল নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। রাতের জেলেরা বা পথচারীরা এই আলোর পিছু নিয়ে অনেক সময় পথ হারিয়ে ফেলে এবং জলাভূমির কাদা বা চোরাগুপ্তা গর্তে আটকে প্রাণ হারায়। এই ভয় এবং অজ্ঞতা থেকেই যুগে যুগে একে ডাইনির আলো বা ভৌতিক কাণ্ড হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞান আজ প্রমাণ করেছে যে, আলেয়া মোটেও অলৌকিক বা কোনো অলীক আত্মার কারসাজি নয়; এটি সম্পূর্ণ একটি স্বাভাবিক রাসায়নিক বিক্রিয়া। জলাভূমি বা বিলের তলদেশে বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন গাছপালা, লতাগুল্ম, শ্যাওলা এবং জলজ প্রাণীর মৃতদেহ পচে জমা হতে থাকে। অক্সিজেনের অনুপস্থিতিতে এই জৈব পদার্থগুলোর পচনের ফলে সেখানে প্রাকৃতিকভাবে প্রচুর পরিমাণে মিথেন গ্যাস (Methane - CH₄) তৈরি হয়। এই মিথেন গ্যাসের সাথেই অত্যন্ত দাহ্য এবং অস্থির আর একটি গ্যাস উৎপন্ন হয়, যার নাম ফসফিন (Phosphine - PH₃) বা ফসফরাস ডাইহাইড্রাইড।

ফসফিন গ্যাসের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, এটি অত্যন্ত কম তাপমাত্রায় বাতাসে থাকা অক্সিজেনের সংস্পর্শে আসামাত্রই নিজে নিজে জ্বলে উঠতে পারে। একে রসায়নের ভাষায় স্বতঃস্ফূর্ত দহন (Spontaneous Combustion) বলা হয়। জলাভূমির কাদা ও জল ভেদ করে যখন এই গ্যাসগুলো একসাথে বাতাসে বেরিয়ে আসে, তখন ফসফিন নিজে জ্বলে ওঠে এবং তার সংস্পর্শে থাকা মিথেন গ্যাসেও আগুন ধরে যায়। এই দহনের ফলে যে হালকা নীলচে, হলুদ বা সবুজ রঙের মৃদু শিখা তৈরি হয়, তাকেই আমরা দূর থেকে 'আলেয়া' হিসেবে দেখি। রাতে যখন বাতাস বয়, তখন বাতাসের হালকা টানে এবং বায়ুর ঘনত্বের পার্থক্যের কারণে এই গ্যাসীয় আলো এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ভেসে বেড়ায়। দূর থেকে দেখে মনে হয় আলোটি নড়াচড়া করছে বা কাউকে তাড়া করছে।

আলেয়া দেখে মানুষের পথ হারানোর পেছনেও কোনো ভুতুড়ে শক্তি কাজ করে না। রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকারে হুট করে এমন আলো জ্বলে উঠলে মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ে অথবা কৌতুহলী হয়ে সেদিকে এগোয়। জলাভূমির ভৌগোলিক গঠনের কারণে সেখানে প্রচুর কাদা, চোরবালি ও গভীর গর্ত থাকে। আলোর মোহে বা ভয়ে দিকবিদিক জ্ঞান হারিয়ে অন্ধের মতো ছুটতে গিয়ে মানুষ সেই গর্তে পড়ে যায় এবং দুর্ঘটনার শিকার হয়। প্রকৃতির এই সাধারণ রাসায়নিক নিয়মকে না জানার কারণে এবং অন্ধবিশ্বাসের বশে মানুষ যুগ যুগ ধরে একে ভূত বা ডাইনি ভেবে ভয় পেয়ে এসেছে।

Comments

    Please login to post comment. Login