Posts

নন ফিকশন

মোস্তাফা জিলানীর জীবনী পর্ব ৮

July 19, 2026

Md Josam

Original Author MD samim sikdar

Translated by MD Shamim sikdar

10
View

অষ্টম পর্ব: শেষ জীবনের গভীর আধ্যাত্মিক প্রভাব, শিষ্যদের মাধ্যমে সিলসিলার স্থায়িত্ব, সমাজ সংস্কারের চূড়ান্ত প্রচেষ্টা, শিক্ষাদানের অবিরাম ধারা এবং উত্তরাধিকারের প্রস্তুতি (প্রায় ১১৬০ থেকে ১১৬৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত)

বয়স যখন ৮০ পেরিয়ে গেছে, তখনো হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) বাগদাদের মাদ্রাসায় নিয়মিত উপস্থিত থাকতেন। তাঁর শারীরিক শক্তি কমে এসেছিল, কিন্তু তাঁর বাণী এবং জ্ঞানের প্রভাব ছিল অপরিসীম। তিনি ছাত্রদের সামনে বসে হাদিসের দরস দিতেন এবং প্রতিটি হাদিসের সাথে বাস্তব জীবনের উদাহরণ যুক্ত করতেন। উদাহরণস্বরূপ, রাসূল (সা.)-এর দানশীলতার হাদিস বর্ণনা করে তিনি বলতেন, “আজও আমাদের সমাজে গরিবদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়ানো ফরজ।” তাঁর এই দরসে শুধু যুবক ছাত্র নয়, বয়স্ক আলেমরাও উপস্থিত থাকতেন এবং তাঁর কথায় নতুন অনুপ্রেরণা পেতেন।
তিনি শিষ্যদেরকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দিতেন। প্রত্যেক শিষ্যের ব্যক্তিগত অবস্থা অনুযায়ী আমল নির্ধারণ করতেন। কাউকে অধিক জিকির, কাউকে নফল রোজা, কাউকে দানশীলতার উপর জোর দিতেন। তিনি বলতেন, “তরিকতের পথ কঠিন, কিন্তু আল্লাহর সাহায্যে সহজ।” তাঁর পুত্র আবদুল রাজ্জাক (রহ.)-কে তিনি বিশেষভাবে তৈরি করতেন। তাঁকে ফিকহ, হাদিস এবং তাসাউফের সকল শাখা শেখাতেন যাতে তিনি পরবর্তীতে সিলসিলা চালিয়ে যেতে পারেন। অন্যান্য শিষ্যদেরকে বিভিন্ন দেশে পাঠানোর আগে তিনি তাদেরকে পরীক্ষা করতেন এবং উপদেশ দিতেন যেন তারা স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে ইসলামের খাঁটি শিক্ষা মিলিয়ে প্রচার করেন। এই প্রচেষ্টার ফলে কাদেরিয়া তরিকা ইরাক থেকে শুরু করে পারস্য, ভারত, আফ্রিকা এবং অন্যান্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে তিনি অবিরাম কাজ করে গেছেন। বাগদাদে তখন অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং সামাজিক অবক্ষয় ছিল। তিনি ধনী ব্যক্তিদেরকে ডেকে ডেকে বলতেন, “তোমাদের সম্পদ আল্লাহর আমানত। গরিবদের অধিকার আদায় করো।” তাঁর এই উপদেশে অনেকে তাদের সম্পত্তির একাংশ ওয়াকফ করে দেন। তিনি মসজিদে গিয়ে সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলতেন এবং তাদের পারিবারিক সমস্যা সমাধানে সাহায্য করতেন। বিবাহ, উত্তরাধিকার এবং ব্যবসায়িক বিরোধের ক্ষেত্রে তাঁর ফতোয়া মানুষ মেনে চলত। তিনি সবসময় ন্যায়ের পক্ষে কথা বলতেন এবং অত্যাচারের বিরুদ্ধে সতর্ক করতেন।
তাঁর গ্রন্থ ও উপদেশের প্রসার এই সময়ে ত্বরান্বিত হয়। শিষ্যরা তাঁর প্রতিটি বক্তৃতা লিপিবদ্ধ করতেন। “আল-ফতহুর রাব্বানী” গ্রন্থে তাঁর শেষ জীবনের অনেক উপদেশ সংকলিত হয়েছে। তিনি লিখতেন বা বলতেন যে, মানুষের প্রধান কাজ হলো আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা এবং নফসকে নিয়ন্ত্রণ করা। তাঁর গ্রন্থগুলো হাতে লেখা কপি করে বিভিন্ন শহরে পাঠানো হতো। এতে তাঁর শিক্ষা দূর-দূরান্তে পৌঁছে যায়। তিনি “ফুতুহুল গাইব” গ্রন্থে অদৃশ্য জগতের রহস্য এবং আধ্যাত্মিক স্তর ব্যাখ্যা করেন, যা শিষ্যদের জন্য দিকনির্দেশনা হয়ে ওঠে।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি অত্যন্ত সাধারণ ছিলেন। বার্ধক্য সত্ত্বেও তিনি নিজের কাজ নিজে করার চেষ্টা করতেন। তাঁর খাবার ছিল খুব সাধারণ—রুটি, দুধ বা সবজি। তিনি অতিরিক্ত খাওয়া পছন্দ করতেন না। রাতে ঘুম কমিয়ে নামাজ ও জিকির করতেন। তাঁর সন্তানরা তাঁর সেবা করতেন, কিন্তু তিনি বলতেন, “আমার সেবা করো না, আল্লাহর ইবাদত করো।” তাঁর বাড়িতে সবসময় অতিথি এবং শিষ্যদের ভিড় লেগে থাকত। তিনি প্রত্যেকের সাথে ধৈর্যের সাথে কথা বলতেন এবং তাদের সমস্যার সমাধান দিতেন।
এই সময়ে তিনি আরও বেশি করে মানুষের হৃদয় জয় করেন। অনেক অমুসলিম তাঁর সান্নিধ্যে এসে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি কখনো জোর করে ধর্ম পরিবর্তন করাতেন না, বরং তাঁর চরিত্র এবং শিক্ষার মাধ্যমে আকৃষ্ট করতেন। তাঁর প্রভাবে সমাজের বিভিন্ন স্তরে পরিবর্তন আসে। ব্যবসায়ীরা সৎ বাণিজ্য শুরু করে, শিক্ষকরা নতুন উদ্যমে শিক্ষাদান করেন এবং সাধারণ মানুষ ধার্মিক জীবনযাপন শুরু করে।
তাঁর উত্তরাধিকার গড়ে তোলার কাজে তিনি বিশেষ মনোযোগ দেন। তিনি শিষ্যদেরকে বলতেন, “আমি চলে গেলে তোমরা এই তরিকা অটুট রাখবে। শরীয়ত থেকে বিচ্যুত হবে না।” তিনি মাদ্রাসার ব্যবস্থাপনা শিষ্যদের হাতে তুলে দেন যাতে তাঁর অনুপস্থিতিতেও চলতে থাকে। তাঁর এই প্রস্তুতি কাদেরিয়া তরিকাকে শতাব্দী ধরে টিকিয়ে রাখে।
তিনি শেষ জীবনে প্রায়ই মৃত্যুর কথা স্মরণ করতেন। তিনি বলতেন, “মৃত্যু অনিবার্য, প্রস্তুত থাকো।” তাঁর এই কথা শুনে শিষ্যরা আরও বেশি করে ইবাদতে মনোনিবেশ করত। তিনি নিজে প্রতিদিন কুরআন তিলাওয়াত করতেন এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতেন।
তাঁর সমাজীয় প্রভাব এতটাই ছিল যে, বাগদাদের শাসকরা তাঁর মতামত নিতেন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে। তিনি সবসময় শান্তি এবং ন্যায়ের পক্ষে কথা বলতেন। তাঁর উপদেশে অনেক যুদ্ধ-বিগ্রহ এড়ানো সম্ভব হয়। তিনি কখনো নিজেকে রাজনৈতিক নেতা হিসেবে দেখাননি, বরং ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক নেতা হিসেবে থেকেছেন।
এই শেষ বছরগুলোতে তাঁর জীবন ছিল অবিরাম সেবা, শিক্ষা এবং উপদেশের। তিনি কোনো দিন অলস থাকেননি। এমনকি অসুস্থ অবস্থাতেও তিনি ছাত্রদের সাথে কথা বলতেন। তাঁর এই কর্মনিষ্ঠা তাঁর অনুসারীদের জন্য চিরকালের আদর্শ হয়ে থাকে। তাঁর শিক্ষা আজও বিশ্বের লক্ষ লক্ষ মানুষকে প্রভাবিত করে।
এই পর্যায় তাঁর জীবনের এক সোনালি অধ্যায়, যেখানে তিনি তাঁর সমস্ত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের জন্য রেখে যান। তাঁর উত্তরাধিকারীদের প্রস্তুতি সম্পূর্ণ হয় এবং তরিকা স্থায়ী রূপ লাভ করে।
(

🎉 ১ লাখ টাকা পুরস্কার জেতার সুযোগ!

আমার চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন। তারপর যেকোনো ভিডিওতে এই কমেন্টটি করুন:

🔗 https://youtube.com/@jaminatvmt
📝 @jaminatvmt

ধন্যবাদ ❤️

Comments

    Please login to post comment. Login