Posts

ফিকশন

আন্দুলিয়া রাজবাড়ির অভিশাপ

July 20, 2026

MD.Numayer Islam Nahid

9
View

ঢাকার ধানমন্ডির বাসিন্দা অয়ন। বয়স সবে আঠারো, এইচএসসি পরীক্ষা শেষ করে এখন একদম ফ্রি। ফেলুদা আর ব্যোমকেশের গল্প গোগ্রাসে গেলা অয়নের প্রধান শখই হলো যেকোনো রহস্যের পেছনে গোয়েন্দাগিরি করা। অয়নের বাবা সোহেল চৌধুরী এবং মা রেহানা চৌধুরী নাটোরের এক সময়ের বিখ্যাত জমিদার বংশের উত্তরসূরি। দীর্ঘদিন পর সোহেল চৌধুরী সিদ্ধান্ত নিলেন, শহরের কোলাহল ছেড়ে সপরিবারে নাটোরের গুরুদাসপুর গ্রামে তাদের আদি পুরুষদের পরিত্যক্ত জমিদার বাড়ি "চৌধুরী মঞ্জিল" দেখতে যাবেন। ল্যাপটপ, ক্যামেরা আর গোয়েন্দা সুলভ কৌতুহল নিয়ে অয়নও বাবা-মায়ের সাথে রওনা হলো এক রোমাঞ্চকর অভিযানের উদ্দেশ্যে।

বহু পথ পেরিয়ে যখন তারা গুরুদাসপুর গ্রামের চৌধুরী মঞ্জিলের সামনে পৌঁছাল, তখন সূর্য প্রায় ডুবুডুবু। ২০০ বছরের পুরনো বিশাল রাজবাড়িটি লতাগুল্মে ঢাকা, চারপাশে এক অদ্ভুত থমথমে নীরবতা। বাড়িটি দেখাশোনার জন্য কেবল বুড়ো কেয়ারটেকার রহমত চাচা সেখানে থাকেন। চৌধুরী পরিবারকে দেখেই রহমত চাচার চোখে-মুখে এক অদ্ভুত আতঙ্ক ফুটে উঠল। সে ঘরগুলো পরিষ্কার করে দেওয়ার সময় নিচু স্বরে সোহেল চৌধুরীকে সাবধান করে দিল, "ছোটহুজুর, দিনের বেলা যেখানে খুশি যান, কিন্তু সূর্যাস্তের পর ভুলেও পেছনের ঝুলন্ত বাগান আর দিঘির ঘাটের দিকে যাবেন না। ওইদিকে রাতের বেলা বাতাসও যেন ভারী হয়ে ওঠে।" অয়নের তীক্ষ্ণ চোখ কিন্তু অন্য কিছু লক্ষ্য করল; রাজবাড়ির বিশাল কাঠের সদর দরজায় গভীর তিনটি আঁচড়ের দাগ, যা কোনো মানুষের নখের পক্ষে করা অসম্ভব। অয়নের গোয়েন্দা মন বলে উঠল—এখানে কোনো বড় রহস্য লুকিয়ে আছে।

প্রথম রাতেই ঘটল সেই হাড়হিম করা ঘটনা। রাত তখন ঠিক পৌনে তিনটে। পুরো গ্রাম নিঝুম, শুধু জানালার বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। হঠাৎ অয়নের ঘুম ভেঙে গেল এক অদ্ভুত শব্দে। ঘরের জানালার ঠিক বাইরে কেউ যেন ভারী কোনো কিছু টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে, আর তার সাথে হালকা নূপুরের রিনরিন আওয়াজ। অয়ন বুক টান করে টর্চলাইট আর ক্যামেরা হাতে নিয়ে আস্তে করে দরজা খুলে করিডোরে বের হলো। টর্চের আলো ফেলতেই সে দেখল, করিডোরের শেষ মাথায় একটি কুচকুচে কালো ছায়া অবয়ব তার বাবার ঘরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। অয়ন পিছু নেওয়ার আগেই ছায়াটি যেন দেয়ালের সাথে মিলিয়ে গেল। পরদিন সকালে রাজবাড়িতে শোরগোল পড়ে গেল। সোহেল চৌধুরী লকার থেকে তাদের বংশের ঐতিহ্যবাহী মূল্যবান ‘রক্তমুখী আংটি’ বের করে টেবিলের ওপর রেখেছিলেন, সকালে সেটি গায়েব! অথচ ঘরের দরজা-জানালা সব ভেতর থেকে শক্ত করে বন্ধ ছিল।

পুলিশ ডাকার কথা উঠলেও অয়ন নিজের গোয়েন্দা বুদ্ধি খাটিয়ে তদন্ত শুরু করল। সে জানালার ঠিক নিচের নরম মাটিতে ভারী বুট জুুতোর ছাপ দেখতে পেল, যা গ্রামের সাধারণ মানুষের থাকার কথা নয়। এরপর সে লাইব্রেরি ঘরের ধুলোবালি ঘেঁটে জমিদার আমলের একটি পুরনো ডায়েরি উদ্ধার করল। সেখানে লেখা ছিল, শত বছর আগে এই বংশের এক পূর্বপুরুষকে বিষ খাইয়ে হত্যা করা হয়েছিল এই রক্তমুখী আংটিটি চুরি করার জন্যই। অয়ন বুঝতে পারল, এখানে শুধু ভূত নয়, বরং এর আড়ালে কোনো জীবন্ত মানুষের সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্র কাজ করছে। রহস্যভেদ করতে অয়ন পরের রাতে একটি বিপজ্জনক ফাঁদ পাতল। সে নিজের খাটের ওপর বালিশ দিয়ে মানুষ ঘুমানোর মতো অবয়ব তৈরি করে চাদর চাপা দিল এবং নিজে ঘরের কোণে থাকা বিশাল কাঠের আলমারির পেছনে অন্ধকার অংশে লুকিয়ে ওত পেতে রইল।

রাত ঠিক তিনটে। হঠাৎ ঘরের দেয়ালের একটি অংশ, যা আসলে জমিদার আমলের এক গোপন সুড়ঙ্গের দরজা ছিল, সেটি শব্দহীনভাবে সরে গেল। সেখান থেকে বের হয়ে এলো এক কঙ্কালসার ভয়ংকর আকৃতির এক অবয়ব—যা দেখতে হুবহু ডায়েরিতে পড়া সেই মৃত জমিদারের ভূতের মতো! ভূতটি খাটের দিকে এগিয়ে গিয়ে যখনই আক্রমণ করতে গেল, অয়ন অন্ধকার থেকে বাঘের মতো তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং ঘরের লাইট জ্বালিয়ে দিল। ধস্তাধস্তির পর অয়ন যখন তার মুখের মুখোশটি টেনে খুলে ফেলল, তখন সবাই চমকে উঠল। সে আর কেউ নয়, কেয়ারটেকার রহমত চাচার ছেলে! সে শহরে এক জুয়াড়ির দলে পড়ে প্রচুর ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। সে জানত বাবা-দাদাদের মুখে শোনা সুড়ঙ্গের রাস্তাটি কোথায়। তাই সে ভূত সেজে চৌধুরী পরিবারকে ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে দিতে চেয়েছিল, যাতে সুড়ঙ্গের ভেতরে থাকা জমিদার আমলের বাকি গুপ্তধন আর এই আংটিটি সে একাই আত্মসাৎ করতে পারে।

রহমত চাচার ছেলেকে ধরে যখন পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হলো, তখন চৌধুরী পরিবার অয়নের সাহসিকতার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। সকালের আলো ফুটতেই অয়ন কৌতূহলবশত সেই গোপন সুড়ঙ্গটি নিজে পরীক্ষা করতে ভেতরে ঢুকল। সুড়ঙ্গের শেষ মাথায় একটি প্রাচীন ধুলোবালি মাখা আয়না ঝোলানো ছিল। অয়ন আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই তার শিরদাঁড়া দিয়ে একটি ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেল। আয়নায় অয়ন নিজের প্রতিবিম্বের ঠিক পাশেই স্পষ্ট দেখতে পেল—শত বছর আগের জমিদার আমলের পোশাক পরা এক রক্তশূন্য অবয়ব দাঁড়িয়ে ক্রূর হাসি হাসছে, আর তার কঙ্কালসার আঙুলে জ্বলজ্বল করছে আসল 'রক্তমুখী আংটিটি'! অয়ন পলক ফেলতেই অবয়বটি হাওয়া হয়ে গেল। অয়ন বুঝতে পারল, চোরটি তো নকল ভূত সেজেছিল, কিন্তু চৌধুরী মঞ্জিলের অন্ধকার কোণে আসলেই এক অতৃপ্ত আত্মা আজও তার আংটি পাহারা দিয়ে চলেছে।

Comments

    Please login to post comment. Login