"বৃষ্টি শীতের রাতে বারান্দায় কি করছো?ঠান্ডা লেগে যাবে তো।ঘরে চলো!"
কাউসারের চিন্তিত কন্ঠে মলিন হাসে বৃষ্টি।অন্য কোনদিন হলে সে আহ্লাদী হতো। কিন্তু আজ তার নিজেকে অনুভূতিহীন মনে হচ্ছে।স্বামীর এতো এতো সুকৃতির প্রমাণ পেয়ে আজ সে নিঃস্ব। বৃষ্টি তো চাইনি কোনো প্রমাণ তবুও কেন এগুলো তার সামনে আসলো!এই ভাবনায় ব্যতিব্যস্ত সে।বৃষ্টির ভাবনায় আবারও ছেদ ঘটিয়ে কাউসার বারান্দায় এলো।চোখের সামনে তুড়ি বাজালো।
"আপনি ঘরে যান কাউসার সাহেব! আপনার ঠান্ডার সমস্যা আছে ভুলে যাবেন না!"
"তা আমার বউটা কি আমার সাথে কোনো কারণে অভিমান করেছে?"
"অভিমান করার মতো কিছু করেছেন?"
বৃষ্টির ধরা গলায় বলা কথাটা শুনে কাউসার বিস্মিত হয়।সে এমন কিছু করেনি যাতে তার বৃষ্টি অভিমান করতে পারে! তাছাড়া বৃষ্টি তো কারণ বিহীন অভিমান করার মেয়ে নয়।গত চারবছর যাবৎ সে যে মেয়েটাকে দেখে আসছে আর আজকের মেয়েটার মাঝে অনেক পরিবর্তন।কাউসার আর কিছু বলার পূর্বেই বৃষ্টি বারান্দা থেকে চলে যেতে নিলো।
"কোথায় যাচ্ছো বৃষ্টি?"
"এশার আজান দিয়েছে।নামাজ পড়বো! আপনি নামাজ পড়তে মসজিদে যান!"
আর কোনো কথাই হয়না তাদের মাঝে। রাতে খাবার খেয়ে ঘরে আসতেই বৃষ্টি দেখতে পায় কাউসার ফোনে কিছু একটা করছে আর হাসছে।বৃষ্টির হৃদয়ে চিনচিনে ব্যথা হয়। কিন্তু কিছুই জিজ্ঞেস করে না। চুপচাপ শুয়ে পড়ে।তার বুকের ব্যথাটা আরো বাড়তে থাকে রাত বারোটার পর। প্রতিবার এই দিনটায় কাউসার তাকে নতুন নতুন ভাবে চমকে দিতো,উপহার দিতো। কিন্তু আজ তার মনে নেই বৃষ্টির জন্মদিন।
বৃষ্টির মনে পড়ে যায় সকালের ঘটনা।কাউসার তখন অফিসে চলে গেছে। কিন্তু ভুলবশত ফোনটা রেখে গেছে।একটু পর পর ম্যাসেজের টুং টাং শব্দ ভেসে আসায় বৃষ্টি ধোয়া কাপড়গুলো বারান্দায় দিয়ে হাত মুছে ফোনটা হাতে নেয়।চমকে যায় সে।লেখা ছিল
"স্যার,আপনার বাবুটা আপনাকে অনেক মিস করছে।আর কান্না করতেই আছে।আপনি এসে একটু সকালের খাবারটা খাইয়ে যান তো! আপনার সাথে তো বাবুটার বেশ ভাব। আপনার সাথে যতটুকু হাসে ততটুকু কান্না করে আমাদের কাছে থাকলে। আপনার কাছে নিবেন কবে ওকে?"
তার আগের অসংখ্য ছবি। হসপিটালে কাউসার বাচ্চাকে আদর করছে।কানে আজান দিচ্ছে।ফিটার খাওয়াচ্ছে।আরো কতরকম।
বৃষ্টির মনে কাউসারকে নিয়ে অগাধ বিশ্বাস। কিন্তু এগুলো কি!বৃষ্টির হঠাৎ মনে পড়ে যায় বছর এক আগে হসপিটাল থেকে পাওয়া রিপোর্টের কথা।মনে পড়ে যায় সে কখনো মা হতে পারবে না।তাই হয়তো কাউসার অন্য কাউকে আপন করে নিয়েছে।হতেই তো পারে।
এভাবেই নানা ভাবনার মাঝে কেটে যায় সারাটা রাত।বৃষ্টির কেউ বেঁচে নেই। মা-বাবার একমাত্র সন্তান ছিল সে।বছর দুয়েক আগে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন তারা।আর কাউসারের বাবা তো আরো আগেই মারা গেছেন। অবশ্য কাউসারের মা বেঁচে আছে কিন্তু সে তাদের সাথে নয় বরং ছোট ছেলে তাহিরের সাথে থাকে।
সকাল গড়িয়ে বিকেল হয়েছে বেশ অনেকক্ষণ।কাউসার একটা বারও ফোন দেয়নি।সন্ধ্যা হওয়ার মিনিট বিশেক আগে কাউসার ফোন দিয়ে বৃষ্টিকে ভালো মন্দ রান্না করতে বলে।আজ বাসায় বিশেষ অতিথি আসবে।বৃষ্টি ভেজা চোখে প্রত্যেকটা খাবার রান্না করে।
রাত আটটার দিকে কলিংবেল বাজতেই দরজা খুলে দেয় বৃষ্টি। কিন্তু বাইরে কেউ নেই। হঠাৎ বাচ্চার কান্নায় বৃষ্টি বিচলিত হয়। মেঝেতে ফেলে রাখা ঝুড়িটা থেকে তুলে নেয় ফুটফুটে বাচ্চা। একদম সেই ছবির বাচ্চাটা।তবে কে ফেলে রেখে গেল এখানে বাচ্চাটাকে।
বৃষ্টি বাচ্চাটাকে বাসার ভেতর নিয়ে আসে।পরিষ্কার করিয়ে দেয় বাবুটাকে। দিনকয়েক বয়স হবে বাবুটার।বৃষ্টি কেমন একটা টান টান অনুভব করছে বাচ্চাটার প্রতি।কি যেন তাকে খুব করে টানছে।বৃষ্টি বাবুটাকে চুমা দিতেই বাবুটা খিলখিলিয়ে হেসে দেয়।বৃষ্টিও হাসছে। তখনই বৃষ্টির কানে ছবি তোলার শব্দ আসে।
বৃষ্টি পেছনে ফিরে দেখে কাউসার আর পরিবারের বাকি সদস্যদের।বৃষ্টির শাশুড়ির মমতাজ বেগম এগিয়ে এসে বাবুসহ বৃষ্টিকে আগলে নেন।গম্ভীর কন্ঠে বলেন,
"বৃষ্টি আমাকেই এতোই পর ভাবলি যে বললি না তোর সমস্যার কথা! তুই না বলতি আমি তোর মা আর মা তো বন্ধুর মতো।তবে?"
"মা আমাকে ক্ষমা করে দিবেন।আমি জানাতে চেয়েছিলাম কিন্তু কাউসারই জানাতে নিষেধ করেছিলো।আর এই বাবুটা?"
"আমাদের বাবু!"
কাউসারের মুখ থেকে আমাদের বাবু শুনে বৃষ্টি আশ্চর্যচকিত হয়ে সেদিকেই তাকিয়ে থাকে। কাউসার মুচকি হেসে বলে,
"শুভ জন্মদিনে প্রেয়সীকে আমার থেকে ছোট্ট উপহার আমাদের বাবুটা!"
"আমাদের বাবু মানে?"
বৃষ্টির প্রশ্নে ফিক করে হেসে দেয় ওর দেবর তাহির।তারপর বৃষ্টির থেকে বাবুটাকে নিয়ে বলে,
"ভাবী ভাই তোমাকে সারপ্রাইজ দিতে অনেক আগেই একটা বাবু এডোপ্ট করার সিদ্ধান্ত নেয়।আর এই যে দেখছো বাবুটা।কয়েকদিন আগেই পৃথিবীর আলো দেখার পরপরই সম্পূর্ণ অনাথ হয়ে গেছে।তাইতো ভাই এই বাবুটা তোমাদের মানে আমাদের সকলের তামজিদ করে এনেছে!"
বৃষ্টি অনুতপ্ত হয়।সে তো কত কিছুই ভেবে বসেছিল। বৃষ্টি আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করে কারণ আল্লাহ তায়ালা তাকে কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্বেই সত্যতা জানিয়ে দিয়েছে।সত্যিই একটা মুদ্রার দুপিঠ রয়েছে। বৃষ্টি ম্যাসেজে দেখেছিল মুদ্রার একপিঠ।অনাথ আশ্রম থেকেই এক নারী কর্মী ম্যাসেজ দিয়েছিল কাউসারকে।আজ যদি মুদ্রার একপিঠ দেখেই বৃষ্টি কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতো, তবে তার সুন্দর সাজানো সংসারটা শেষ হয়ে যেতো।
সমাপ্ত