Posts

গল্প

বিরহ ডোরে কেন বাঁধ?

July 25, 2026

Malwatt Oscar

20
View

পরন্ত বিকেল। 

মৃদু মন্দ আবহাওয়া। 

নদীর পাড় দিয়ে বহমান এ চিত্তশীতলী বাতাসে নিজের প্রিয় মানুষটার হাতে হাত ধরে হাঁটার আনন্দ বর্ণনাতীত। 

আমি পাহলভী। বয়স ৩৫। না দৈর্ঘ্যে বড়, না গুণে বড়। 

শ্যামবর্ণের সাড়ে পাঁচ ফুটের মানুষ। চুলে খানিক পাক ধরেছে, থেকে থেকে কিছু চুল সাদাটে হয়েছে। 

কালো বলে মানুষের কথা কম  শুনিনি, আত্মীয়দেরও নিন্দা সয়েছি। জীবনে বলার মতো যা করেছি, তা কেবলই পড়ালেখা। 

বুঝেছিলাম, সবার জীবন সুন্দর হয় না। এখন নাগেরহাট সরকারি কলেজে কেমিস্ট্রির অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর। 

চাকরিজীবনেও কম বিরম্বনার শিকার হইনি। 

তা আর নাই-বা বললাম।

তুমুল খোঁজাখুঁজির পর, দস্তুর মত পাত্রী দেখার শেষে একজন রাজি হলো বিয়েতে—মিলা, ২২। 

বিয়েতে চেষ্টা করেছিলাম ধুমধাম করেই করতে। হাজার হলেও আমার জীবনেও তো বিয়ের ফুল ফুটেছিল অবশেষে। 

কিন্তু বাসর রাতে মিলা ধীরে ধীরে বলল, — আমি পরিবারের চাপে বিয়ে করেছি। আমি অন্য একজনকে ভালোবাসি। 

আপনি চাইলে আমাকে তালাক দিয়ে দিতে পারেন। দয়া করে আমার ওপর কোনো অধিকার ফলাবেন না। 

কথাগুলো বলার সময় মেয়েটা একবারও আমার দিকে তাকায়নি। আমি অনেকক্ষণ চুপ করে ছিলাম। 

মনে হচ্ছিল, বুকের ভেতর কেউ খুব ধীরে ধীরে কিছু একটা ভেঙে দিচ্ছে,। 

শেষে কাঁপা কাঁপা গলায়  শুধু বলেছিলাম, — ঠিক আছে। সে রাতে ঘরটাতে কেবল দু'জন মানুষ ছিল। 

স্বামী-স্ত্রী ছিল না। 

পরের দিন থেকে আমরা একই ছাদের নিচে থেকেও আলাদা জীবন কাটাতে শুরু করলাম, ধরনীর বুকে পাশাপাশি দুজন, কেউ বুঝি কারোর নয়। 

আমি কলেজে যেতাম। ফিরে এসে বই নিয়ে বসতাম। দরকার হলে নিজের চা নিজেই বানিয়ে নিতাম। মিলা সংসারের সব কাজ করত।

সময়মতো খাবার টেবিলে রেখে যেত। আমি খেয়ে প্লেট ধুয়ে রাখতাম। আমাদের কথাবার্তা সীমাবদ্ধ ছিল প্রয়োজনের মধ্যে। "চাবিটা কোথায়?" "আজ ফিরতে দেরি হবে।" "বাজার থেকে কিছু আনতে হবে?" এর বেশি নয়। একদিন মা ফোন করলেন। — বউমা কেমন আছে? তোদের কোনো সুখবর কবে শুনব? আমি একটু হেসে বলেছিলাম, — সময় লাগবে, মা। ফোন রেখে দেখি দরজার পাশে মিলা দাঁড়িয়ে। সে কিছু বলল না। 

শুধু নিঃশব্দে নিজের ঘরে চলে গেল। সেদিন প্রথমবার মনে হলো, আমার কথায় যতটা কষ্ট হয়েছে, তার চেয়েও বেশি কষ্ট পেয়েছে সে। মাস পেরিয়ে বছর হলো। 

একসময় শুনলাম, যাকে ভালোবেসে সে আমার জীবন থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখেছিল, সেই ছেলেটি বিদেশে গিয়ে অন্য কাউকে বিয়ে করেছে। খবরটা আমি প্রতিবেশীর মুখে শুনেছিলাম। মিলা কোনো দিন আমাকে কিছু বলেনি। সেদিন রাতে শুধু দেখেছিলাম, নামাজ শেষে সে অনেকক্ষণ জায়নামাজে বসে ছিল। 

কিছু কান্নার শব্দ দরজা পেরিয়ে আসে না। তবু বোঝা যায়। তারপরও আমাদের সম্পর্ক বদলাল না। কারণ দয়া থেকে সংসার হয় না। আবার অপরাধবোধ থেকেও ভালোবাসা জন্মায় না। আরও তিন বছর কেটে গেল। এক শীতের রাতে কলেজ থেকে ফিরে প্রচণ্ড জ্বরে পড়ে গেলাম। 

ঘোরের মধ্যে বুঝতে পারছিলাম, কেউ বারবার কপালে ভেজা কাপড় বদলে দিচ্ছে। কখনো পানি খাওয়াচ্ছে। কখনো ওষুধ। ভোরের দিকে চোখ খুলে দেখি, মিলা বিছানার পাশে বসে আছে। সারারাত জেগেছে। 

চোখের নিচে কালচে দাগ। আমার চোখ খুলতেই সে ধীরে বলল, — ওষুধটা খেয়ে নিন। আমি ওষুধ খেলাম। সে গ্লাসটা নিয়ে চলে গেল। সেদিনও আমাদের মধ্যে আর কোনো কথা হয়নি। তারপর থেকে ছোট ছোট কিছু পরিবর্তন হতে লাগল। আমি ফিরতে দেরি করলে সে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকত। আমার প্রিয় তরকারিটা রান্না হলে আলাদা করে তুলে রাখত। কিছু ভুলে গেলে মনে করিয়ে দিত। কলেজ থেকে আসার সময়ে কখনো ফুল এনে দেই, খনো বা ছোট্ট কিছু উপহার, নিতান্তই সহজ সরল। 

তবুও আমরা কেউ কাউকে এখনো ভালোবাসি বলিনি। আসলে প্রয়োজনও হয়নি। একদিন বিকেলে সে হঠাৎ বলল, — আপনার চায়ে চিনি কম দেব? আমি উত্তর দিয়েছিলাম, — তুমি যেভাবে ভালো মনে করো। সেদিন সে প্রথমবার আমার দিকে তাকিয়ে একটু হেসেছিল। হয়তো খুব ছোট্ট একটা মুহূর্ত। কিন্তু সাত বছরের নীরবতার পরে সেই হাসিটা অনেক বড় ছিল। আজ আমাদের বিয়ের বারো বছর। কলেজ থেকে ফেরার পথে সে বলল, —চলুন না, নদীর পাড় থেকে একটু হেটে আসি? আমরা পাশাপাশি হাঁটছি। হঠাৎ টের পেলাম, সে ধীরে ধীরে আমার হাতটা ধরেছে। আমি তার দিকে তাকালাম। চোখে বয়সের ছাপ পড়েছে। চুলে পাক ধরেছে তারও। 

সে অনেকক্ষণ চুপ থেকে বলল, — অনেক দেরি হয়ে গেল... তাই না? আমি নদীর দিকে তাকিয়ে বললাম, — হয়তো। 

তারপর আমরা আর কিছু বলিনি। 

জীবনে সব ভালোবাসার শুরু হয় না প্রথম দেখায়। 

কিছু ভালোবাসা জন্ম নেয় দীর্ঘ নীরবতার পরে। 

আর কিছু বিরহে। 

Comments

    Please login to post comment. Login