Posts

গল্প

শেষ শরতের শিউলি ফুল

July 25, 2026

Malwatt Oscar

21
View

বৃষ্টি হলেই আমার ঘুম ভেঙে যায়।

আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। জানালার কাঁচে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো একটানা টুপটাপ শব্দ তুলে ঝরে পড়ছে। বুকশেলফের ওপর রাখা পুরোনো ডায়রিটা নামাতে গিয়ে একটা শুকনো শিউলি ফুল মেঝেতে পড়ে গেল।

ফুলটার রং অনেক আগেই ফিকে হয়ে গেছে। তবু আশ্চর্য, নাকের কাছে আনতেই মনে হলো—শরতের সেই ভোরটা যেন এখনও কোথাও বেঁচে আছে।

আমার নাম আইরিন।

আর এই শুকনো শিউলি ফুলটার নাম—ইফাদ।

আমাদের পরিচয় হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের বইমেলায়।

আমি তখন ইংরেজি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। হাতে শেক্সপিয়ারের সনেটের একটা সংস্করণ, কিন্তু টাকা কম পড়েছিল। বইটা রেখে চলে আসছিলাম।

পেছন থেকে একটা কণ্ঠ বলেছিল,

—"বইটা নিয়ে যান।"

পেছনে ফিরে দেখি, লম্বা এক ছেলে। চোখে কালো ফ্রেমের চশমা। মুখে এমন একরকম হাসি, যেন পৃথিবীতে কোনো তাড়া নেই।

আমি রাজি হইনি।

সে হেসে বলেছিল,

—"একদিন কফি খাওয়াবেন। হিসাব সমান হয়ে যাবে।"

সেদিনই প্রথম জানলাম, কিছু ঋণ টাকা দিয়ে শোধ হয় না।

এরপর ধীরে ধীরে সে আমার প্রতিদিনের অভ্যাস হয়ে গেল।

সকালের এক কাপ চা।

ক্লাস শেষে ক্যাম্পাসের রাস্তা।

বৃষ্টির দিনে ভেজা বিকেল।

শীতের কুয়াশায় মোটরবাইকের পেছনে বসে শহর ঘোরা।

আমার জীবনের প্রতিটা ঋতুতে কোথাও না কোথাও ইফাদ ছিল।

সে কখনো বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিত না।

শুধু বলত,

—"তুমি তোমার স্বপ্ন পূরণ করো। আমি পাশে আছি।"

সবকিছু বদলে গেল যেদিন বাবাকে বললাম, আমি ইফাদকে ভালোবাসি, ওকে নিয়ে বাঁচতে চাই।

বাবা অনেকক্ষণ চুপ করে ছিলেন।

তারপর খুব শান্ত গলায় বললেন,

—"ভালোবাসা দিয়ে সংসার শুরু করা যায়, চালানো যায় না।"

সেদিন প্রথম বুঝলাম, বাবা আমাকে ভালোবাসেন, কিন্তু আমার মতো করে নয়।

এই কথোপকথনের পর বাবা কয়েক সপ্তাহের মাঝেই আমার বিয়ে ঠিক করলেন। চাচ্ছিলেন না বিষয়টা আত্মীয়স্বজনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ুক। হাজার হলেও সবাই চায় সমাজে মাথা উচু করে বাঁচতে।

আমার বিয়ে হয়ে গেল।

আমি শেষবারের মতো ইফাদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো বটগাছটার নিচে।

বৃষ্টি হচ্ছিল।

ইফাদ শুধু একটা কথাই বলেছিল,

—"তুমি যদি যাও, আমি আটকে রাখব না। কিন্তু যদি কোনোদিন পৃথিবীটা খুব ভারি লাগে, শুধু একবার ডাক দিও।"

তারপর সে পকেট থেকে একটা শুকনো শিউলি ফুল বের করে আমার হাতে দিয়েছিল।

আমি সেটা আজও ফেলে দিতে পারিনি।

বিয়ের পর আমি কানাডায় চলে এলাম।

নতুন দেশ।

নতুন মানুষ।

নতুন বাড়ি।

শুধু নতুন জীবনটা আর হলো না।

স্বামী রাহুল খারাপ মানুষ ছিল না।

কিন্তু আমরা কখনো একে অপরের মানুষ হতে পারিনি।

এক ছাদের নিচে থেকেও মানুষ কতটা একা হতে পারে, সেটা আমি ওর পাশে শুয়েই শিখেছিলাম।

তারপর এলো মহামারী।

রাহুল চাকরি হারাল।

হাসি হারাল।

ধৈর্য হারাল।

শেষ পর্যন্ত আমাদের সম্পর্কটাও হারিয়ে গেল।

এক রাতে সে বলল,

—"আমরা দুজনেই ভুল করেছি।"

আমি কোনো উত্তর দিইনি।

সেই রাতে বহু বছর পর ফোন করেছিলাম ইফাদকে।

ওপাশে পরিচিত কণ্ঠটা শুনেই আমার সব শক্তি ভেঙে গেল।

আমি কিছু বলতে পারিনি।

শুধু কেঁদেছিলাম।

অনেকক্ষণ চুপ থেকে সে বলেছিল,

—"তুমি ঠিকানাটা পাঠাও।"

সে সত্যিই এসেছিল।

সিনেমার নায়কের মতো নয়।

ক্লান্ত একজন মানুষের মতো।

চোখের নিচে কালি।

চুলে অল্প পাক।

কিন্তু চোখের ভেতরের সেই নিশ্চিন্ত আশ্বাসটা একটুও বদলায়নি।

সে আমাকে উদ্ধার করতে আসেনি।

সে শুধু আমার পাশে দাঁড়িয়েছিল।

বাকিটা আমি নিজেই করেছি।

ডিভোর্সের কাগজে নিজের হাতে সই করেছি।

নিজের জীবনটাও নিজের হাতে আবার শুরু করেছি।

দেশে ফিরে একদিন বাবা আমার হাত ধরে বললেন,

—"ক্ষমা করতে পারবি?"

আমি বাবাকে জড়িয়ে ধরেছিলাম।

জীবনের একটা সময়ে বুঝেছি—

ক্ষমা মানে ভুলে যাওয়া নয়।

ক্ষমা মানে, সেই কষ্টটাকে আর নিজের ভবিষ্যতের মালিক হতে না দেওয়া। সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস খুঁজে নেওয়া। 

আজ আমাদের বিয়ের এক বছর।

বারান্দায় একটা ছোট্ট শিউলি গাছ আছে।

প্রতিটা শরতে ভোরবেলা ইফাদ ফুল কুড়ায়।

সে হাসতে হাসতে বলে,

—"দেখো, এবারও একটা শুকনো ফুল রেখে দিও।"

আমি জানি, একদিন এই ফুলটাও শুকিয়ে যাবে।

যেমন শুকিয়ে যায় সব সময়।

কিন্তু কিছু গন্ধ কখনো হারিয়ে যায় না।

কিছু অপেক্ষাও না।

আর কিছু মানুষও না...

নদীর মতোই জীবনও শেষ পর্যন্ত নিজের পথ খুঁজে নেয়।

[Author's Note]

[আসসালামুয়ালাইকুম, আমি আহমাদিনেজাদ। আপনারা আমার গল্প নিয়মিত পাঠ করছেন। এর জন্য আমি আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞ।

আমি লেখা-লেখির এ রাস্তায় নতুন, তাই আপনাদের মূল্যবান কমেন্ট আমাকে সাহায্য করে নিজের ভুল গুলো ধরতে, নিজেকে আগের থেকে আরো উন্নত ভাবে আপনাদের সামনে পেশ করতে। তাই আপনাদের কাছে আমার একান্ত অনুরোধ, গল্প পড়া শেষ অন্তত কিছু না কিছু মন্তব্য অবশ্যই করবেন, এটা আমাকে মোটিভেট করবে। আর যেহেতু আমি সেকেন্ড টাইম মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছি, তাই আপনাদের এঙ্গেজমেন্ট আমাকে সঠিক পথে থাক্কতে উৎসাহিত করবে, ইনশাআল্লাহ।]

Comments

    Please login to post comment. Login

  • Mikhail 1 week ago

    আপনাকে আপনার গল্প গুলোর জন্য ধন্যবাদ। দোয়া করি আপনি একজন সফল ডাক্তার হন, মানুষের সেবা করুন এবং বাংলার সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করুন-আমিন।