রাত ৩টা ১২। কারেন্ট নেই।
আরিয়ান ঘুম ভেঙে উঠে বসল। বুকের ভিতর ধুকপুক করছে।
উপর থেকে শব্দ আসছে। খট... খট... খট...
কারো পায়ে হাঁটার শব্দ। ধীরে ধীরে। ছাদের উপর দিয়ে কেউ হাঁটছে।
আরিয়ান মায়ার দিকে তাকাল। মায়া গভীর ঘুমে।
ও ফিসফিস করে ডাকল,
— "মায়া?"
মায়া নড়ল না।
আরিয়ান টর্চ নিয়ে আস্তে আস্তে দরজা খুলল। উপরের ঘর তালা দেওয়া। ৫ বছর ধরে কেউ ঢোকে না।
কিন্তু শব্দটা স্পষ্ট। কেউ জানালার পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে।
আরিয়ান সাহস করে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠল। প্রতি ধাপে ক্যাঁচ ক্যাঁচ।
উপরের ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তালা ঠিক আছে। ভিতর থেকে আর কোনো শব্দ নেই।
ও টর্চের আলো দরজার ফাঁক দিয়ে ভিতরে দিল। অন্ধকার। শুধু পুরোনো চেয়ার আর ভাঙা খাট।
হঠাৎ জানালার কাঁচে টোকা। টক টক।
আরিয়ান চমকে পেছনে তাকাল। কেউ নেই।
কিন্তু মেঝেতে একটা ভেজা পায়ের ছাপ। জানালা থেকে দরজা পর্যন্ত এসে মিলিয়ে গেছে।
আরিয়ান দৌড়ে নিচে নেমে এসেছিল সেদিন। সারা রাত আর ঘুমায়নি।
*আজ। তিন দিন পর।*
বৃষ্টি। যেন আকাশ ভেঙে পড়ছে।
রাত ২টা ১৭। আবার কারেন্ট নেই। শুধু মাঝে মাঝে বিদ্যুতের আলোয় পুরোনো দোতলা বাড়িটা একবারের জন্য জেগে উঠছে।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছিল আরিয়ান। হাত কাঁপছে। তিন দিন আগের সেই রাতের কথা মনে পড়ছে।
হঠাৎ বাড়ির পেছন থেকে আবার সেই শব্দ। খট করে।
আরিয়ান চমকে উঠে ফিসফিস করে বলল,
— "কে?"
উত্তর নেই। শুধু বৃষ্টি আর বাঁশপাতার শব্দ।
ভিতর থেকে মায়ার গলা ভেসে এল। ঘুম ভেঙে গেছে।
— "আরিয়ান? কি হয়েছে? এত রাতে বাইরে দাঁড়িয়ে আছ কেন?"
আরিয়ান জোর করে হাসল।
— "কিছু না। ঘুম আসছে না। তুমি ঘুমাও।"
মায়া ওড়না জড়িয়ে বের হয়ে এল। চোখে ঘুম, কিন্তু মুখে দুশ্চিন্তা।
— "মিথ্যা বলো না। তোমার কপাল ঘামছে। কি দেখেছ?"
আরিয়ান মায়ার কাঁধে হাত রাখল।
— "বলাম তো কিছু না। শুধু বৃষ্টি দেখছিলাম।"
মায়া ওর বুকে মাথা রাখল। গলাটা কাঁপছে।
— "আমার ভয় লাগছে আরিয়ান। তিন দিন আগে রাতেও আমি শব্দ পেয়েছি। মনে হচ্ছিল কেউ আমার ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে নিঃশ্বাস ফেলছে।"
আরিয়ানের বুকের ভিতর ধক করে উঠল। ও নিজেও শুনেছে।
— "ধুর পাগলি। এই বাড়িতে আমরা ছাড়া আর কেউ নেই। তুমি স্বপ্ন দেখেছ।"
মায়া ফিসফিস করে বলল,
— "স্বপ্ন না। আমি চোখ খুলে দেখেছি। দরজার নিচ দিয়ে ছায়া নড়ছিল।"
আরিয়ান কথা ঘোরানোর জন্য বলল,
— "চলো ভিতরে যাই। ঠান্ডা লাগবে।"
ওরা ভিতরে ঢুকল। হ্যারিকেনের আলো কাঁপছে। কারেন্ট ৩ দিন ধরে নেই।
মায়া চা বানাল। কাঁপা হাতে কাপটা আরিয়ানের দিকে এগিয়ে দিল।
— "আর কতদিন এভাবে থাকব আমরা? পুলিশ, রাশেদের লোক... সবাই আমাদের খুঁজছে।"
আরিয়ান চায়ে চুমুক দিল। তেতো।
— "আর কয়েকটা দিন। তারপর দুরে কোথাও চলে যাব।"
মায়া হাসল।
— "সত্যি? তুমি প্রমিস করো, ওখানে গিয়ে আমরা বিয়ে করব।"
আরিয়ান মায়ার হাত ধরল।
— "প্রমিস। আর কেউ আমাদের আলাদা করতে পারবে না।"
ঠিক তখনই দোতলার উপরের ঘর থেকে শব্দ এল। ধুপ করে কিছু একটা পড়ার শব্দ।
দুজনেই চুপ।
মায়া ফিসফিস করে বলল, — "শুনলে?"
আরিয়ান উঠে দাঁড়াল। টর্চ হাতে নিল।
— "তুমি এখানে থাকো। আমি দেখে আসি।"
মায়া আরিয়ানের শার্ট খামচে ধরল।
— "না। একা যেও না। তিন দিন আগে যেমন শব্দ হয়েছিল..."
— "আমি ২ মিনিটে আসছি। দরজা বন্ধ করে দাও।"
আরিয়ান সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠল। উপরের ঘরের তালা ভাঙা।
দরজা ঠেলতেই ক্যাঁআজ শব্দ।
ঘর খালি। কিন্তু মেঝেতে নতুন ভেজা পায়ের ছাপ। তিন দিন আগেরটার মতোই।
আরিয়ান দৌড়ে নিচে নেমে এল।
— "মায়া! চলো এখান থেকে বের হই!"
ঠিক তখনই দরজায় ঠক ঠক।
— "আরিয়ান। দরজা খোল। আমি রবিন।"
চলবে
---