Posts

প্রবন্ধ

স্টারের কাচ্চি হয় একটি ভালোবাসা

July 29, 2026

Mahmud R

Original Author My original post

3
View

- বাংলা ভাষায় সবচেয়ে সুন্দর শব্দ কোনটি ?

- উমম্মম্ম … মাধবীলতা ? 

মাধবীলতা কি ফুল কে জানে। শব্দটা প্রথম শুনি নিলয় দাশের বিখ্যাত এক গানে, ‘ … এখনো ফোটে ফুল মাধবীলতা !’ সন্ধ্যার কমে আসা আলোতে, মাঝেমাঝে আমি ছাড়া আর কেউ যে শুনে না গলায় গুনগুন করি; প্রায় আমার মাথায় ঘুরে ঐ এক লাইন, ‘ … এখনো ফোটে ফুল মাধবীলতা !’

আমি কখনো জানতে চাইনি মাধবীলতা কি ফুল। কি তার রঙ, পাপড়িটা ক্যামন ! আমার কল্পনায় সে এক হালকা, মায়াবী বেগুনী ধরনের কোন ফুল। আমার কল্পনায় সবুজ পাতার ফাকে যখন ফুটে থাকে, তার চারপাশে ঝিকিমিকি করে সন্ধ্যার আলোজ্বলা জ্বোনাকীরা। জ্বোনাকীরা, সারাজীবন আমার কাছে কি যে এক বিস্ময়।

বাস্তবে মাধবীলতা দেখলে আমার কল্পনা নষ্ট হবার ভয়ে, আমি তাই স্টারের কাচ্চি দেখি। ঢাকায় যখন প্রথম এসেছিলাম, আমার কাছে এই কাচ্চি মাধবীলতার চেয়ে কম কিছু ছিল না। বনানীর দুইতলায় মামারা যখন কাচ্চি হাতে আমার দিকে হেটে আসতেন, তখন স্বয়ং জেমস যেন পাশের চেয়ারে বসে গান শোনাতো –

“ ক্যামেলিয়া হাতে এই সন্ধ্যায়

ভালবেসে যতো খুশি বলতে পারো, এই ফুল আমার !

ফুল শুধু ছড়াবে সৌরভ, লজ্জায় বলবে না কিছুই

ফুল শুধু ছড়াবে সৌরভ, লজ্জায় বলবে না কিছুই

ফুল থাকবে নিরব … “

স্টারের কাচ্চির সাথে, ক্যান জানি জেমসের গলা যায় না। চিনিগুড়া চালের মোলায়েম, মিহি আদরটা একটা স্নিগ্ধ কিছু খুজে। তারজন্যে, নিলয় দাশের গানই সই। মাত্র চাক ভাংগা এই কাচ্চি আবার, কখনো ফুলের মত নিরবও থাকে না। মউমউ গন্ধে চারপাশে একটা হুলুস্থুলুস কান্ড ঘটায়ে বসে। মামা সামনে কাচ্চির প্লেট রাখলে, চিৎকার দিয়ে বলতে ইচ্ছে করে, ‘ আমি তারায় তারায় রটিয়ে দিবো – এই কাচ্চি আমার !’

স্টারের কাচ্চির আসল রহস্য সম্ভবত, অল্প মশলায়; ভাপে রাঁধা চিনিগুড়া চালে। মাংস কমবেশী অনেক জায়গাতেই নরম হয়। খুলে খুলে আসে। কিন্তু এই কাচ্চিতে হাত লাগিয়ে যখন গরম ধোয়াকে উপড়ে উঠে বাষ্পে মিলাতে দেখবেন, প্রমথ চৌধুরীর রচনার শিল্পগুনের ভাগ্য, ঈশ্বর সেখানেই স্থির করে দেন। সাথে দেয়া আলুটা ভেঙ্গে, এই মাখো মাখো কাচ্চির লোকমা মুখে পুড়লে, আমার শরীর জুড়ে যেন বৃষ্টি নামতো অবেলায়। নাকে এসে লাগতো, প্রেমিকার ঘামে ভেজা শরীরের, সুতির শাড়ির মায়া মাখা সুবাস। উদাসী বিকেলের দখিনা হাওয়ায়, আমার চোখ কেন জানি একটা অজানা আদরে বুজে আসতো। অদেখা সেই প্রেমিকা যেন পিছন থেকে জড়িয়ে কানে কানে আওড়াতো, ‘ এইই … শুনো না … !’

ঝুম বৃষ্টির বিকেলে, তার বুকের নরম উষ্ণতা আমার পিঠ ছুলে পুরো গা রি-রি করে উঠতো ...

এই কাচ্চি আমি ডিম ছাড়াই খাই। ক্যান জানি, একটু হলুদে না ভাজা ডিমে আমার পোষায় না। একটা টিকিয়া দেয়। মালিক হলে আমি দিতাম জ্বালী কাবাব। কাচ্চি এমনিতেই খাওয়া যায়, আমি সাথে নেই তাদের চায়নিজ ভেজিটেবলস। এই ভেজিটেবলসটা পরোটা দিয়েও মজা। খেয়েছেন ?

স্টারের কাচ্চিকে পুরাতন প্রেমের মত ভোলা যেত না অন্য একটা কারনে। অনেকক্ষণ হালকা দমে তারা চুলায় যখন কাচ্চিকে চাপিয়ে রাখতো, চিনিগুড়া চালের মিষ্টি সুবাসটা ভাপে খাসির মাংসের পড়তে পড়তে দুষ্টু ছেলের দলের মত হইরই করে ঢুকে পড়তো। কবিতা গেল মিছিলে, মিছিল নিয়েছে চিলে, অসহায় জন্মভূমি’র মত – মাংসটা নরমে ‘জুইসি’ হত আর কি। চুমু খেতে চাইবার ইচ্ছার কথা, মুখ ফুটে বলতে না পারা প্রেমিকা যেমনটা প্রেমিকের আঙ্গুল নিয়ে খেলে, ঠিক অমন।

এই কাচ্চি খাওয়ার পর, সাবান দিয়ে হাত ধোয়া পাপ। আমি যদি দেশের খাদ্যমন্ত্রী হইতাম, তাইলে আইন করতাম যেন ৩ মাসের জেল হয় – এইজন্যেই মনে হয় আমার আর মন্ত্রী হওয়া হল না ! হুডখোলা, সাদা কালোর মিথ্যে জঞ্জালে ভরা শহরটায়, বারবার নাকের কাছে আংগুলে লেগে থাকা কাচ্চির ঘ্রান শুকতে শুকতে যখন আপন আলোয় ফেরা লাগতো, মনে হত রিকশায়ালা মামাই নিলয় দাশ ! একটা আস্ত নগরীর চ্যাচামেচিকে অগ্রাহ্য করে তিনি খালি গলায় গান ধরতেন –

“ যখনই নিবিড় করে, পেতে চাই তোমাকে

তখনি দু'চোখ বুজি, আমি -

নয়নে-স্বপনে, দেখি শুধু তোমায়

বিরহ বরষায়, মেঘের’ই ছায়ায় … “

এই গান হেডফোনে না, আঙ্গুলে লেগে থাকা কাচ্চির মউমউ গন্ধে নাক পেতে শোনা লাগে।

তারপর শোনা গেল লাসকাটা ঘরে, স্টারের কাচ্চির স্বাদ নাকি আর আগের মত নাই। শহরে নাকি কি-সব আরো কাচ্চির দোকান খুলেছে, অখাদ্য বাসমতীর – লোকে নাকি জোনাকির মত ভিড় করে এসে, সোনালি ফুলের স্নিগ্ধ ঝাঁকে নাক ডুবিয়ে তাই আর এর স্বাদ শুকে না। সত্য-মিথ্যা কি জানি না, আমি শুধু মনে প্রানে চাই, হুমায়ূন আজাদের কবিতার লাইন মিথ্যে হোক – সবকিছু যেন না যায় নষ্টদের অধিকারে …

এত বসন্ত পরেও, আমি যেমনটা চাই কোন রমনী আমার হোক, আমি তার একান্ত কেউ হই ! আমার বাহুতে নাক ঘষে সে মিউমিউ করুক। আমি তেমনি চাই স্টারের কাচ্চি তার সেই পুরোনো স্বাদ ফিরে পাক। জীবনটা এখনো, গানে গানে; এই কাচ্চির-ই কারণে, জোড়া যেন লাগে। আমি চাই স্টারের মালিকরা তাদের সাইনবোর্ড খুলে সেখানে সাদা সফেদ কাপড়ে, লাল রঙে বড় করে যেন লিখে –

“ এখানে ফোটে ফুল মাধবীলতা ! " 

Comments

    Please login to post comment. Login