#অন্দরবাসীনি
#পর্ব_১
কালবৈশাখীর তুমুল ঝড়ে ফাঁকা রাস্তায় চঞ্চল পায়ে আপ্রাণ ছুটছে মেহনূর! যেদিকে দুচোখ যায় অন্ধের মতো ছুটে চলেছে মেয়েটি। মাথার ওপর তখন চারপাশের পরিচিত পৃথিবীটা ধীরে ধীরে অন্ধকারে ছেয়ে যাচ্ছে। আকাশ ভেঙে নামছে তীব্র বজ্রসহ বর্ষণ। ঝোড়ো হাওয়ার হিংস্র তান্ডবে রাস্তার ধারের বড় বড় গাছগুলো মড়মড় করে ভেঙে পড়ছে। পুরো এলাকা এখন একদম জনমানবহীন এবং এক ভুতুড়ে নিস্তব্ধতায় ডুবে গেছে। এই দুর্যোগের চেয়েও এক হাজার গুণ বেশি ভয়ঙ্কর কিছু ক্ষুধার্ত, হিংস্র মানুষরূপী হায়েনা তার ঠিক পিছনেই তাড়া করে আসছে। মেহনূরের পরনের তুষার-শুভ্র সাদা গাউনটি বৃষ্টির অবিরাম ধারায় এখন পুরোপুরি ভিজে গেছে। ভিজে ভারী হয়ে যাওয়া কাপড়টি তার শরীরের সাথে একদম লেপ্টে আছে, যা তার শরীরের প্রতিটি ভাঁজকে নির্মমভাবে স্পষ্ট করে তুলেছে। তার কোমর ছাপানো ঘন কালো লম্বা চুলগুলো বাতাসের ঝাপটায় অবাধ্য হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে, ভিজে লেপ্টে গেছে কপাল আর ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া গালে। কান্না আর বৃষ্টির পানি মিশে একাকার হয়ে গেছে তার মুখাবয়বে। একবার বুক ধড়ফড়ানি নিয়ে সাহস করে পিছু ফিরে তাকাতেই মেহনূরের কলিজাটা ভয়ে একদম শুকিয়ে গেল। চারজন মদ্যপ, বিকৃতমনা মাতাল লোক দূরত্বের ব্যবধান কমিয়ে আরও কাছাকাছি চলে এসেছে। তাদের মুখ থেকে বের হওয়া কুৎসিত, পৈশাচিক হাসির শব্দ আর ভারী বুটের পায়ের আওয়াজ এই প্রলয়ঙ্করী ঝড়ের গর্জনকেও ছাপিয়ে সরাসরি মেহনূরের কানে এসে বিঁধছে। তারা যেন শিকারি পশুদের মতো তাদের শিকারকে কোণঠাসা করার আনন্দ উপভোগ করছে।
এমনটা যে ঘটবে, তা যদি মেহনূর আগে থেকে বিন্দুমাত্র টের পেত তবে এই কালবৈশাখীর ভয়ঙ্কর ঝড়ের মধ্যে কখনোই একা একা অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে কলেজে আসতো না । তার গ্রুপের বাকি ফ্রেন্ডরা সবাই অনেক আগেই যার যার কাজ শেষ করে নিরাপদে হোস্টেলে চলে গেছে। কিন্তু মেহনূরের শরীরটা সকাল থেকেই ভালো ছিল না। তীব্র জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে তার। তাই সবার শেষে, শরীরটাকে কোনোমতে টেনে হিঁচড়ে অত্যন্ত ধীরগতিতে তার একমাত্র বান্ধবী সাবিহার সাথে হোস্টেলের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল । কিছুদূর আসার পর একসময় দুই বান্ধবীর রাস্তা আলাদা হয়ে যায়। সাবিহা বাড়ি কাছে হওয়ায় বাড়ি থেকেই পড়াশোনা করে। ঠিক তখনই আকাশ ভেঙে হঠাৎ করে শুরু হয় এই তুমুল বৃষ্টিপাত। নিয়তির কী নির্মম পরিহাস, অন্যদিন সবসময় মেহনূরের সাথে তার মামাতো বোন সায়না থাকে। কিন্তু আজ ইচ্ছে করেই সায়না আসেনি। সে প্রায়সময় ক্লাস গ্যাপ দেয়। মেহনূরদের হোস্টেলটা ও কলেজ থেকে বেশ দূরে। সে প্রচণ্ড ভয়ে ভয়ে, কাঁপতে কাঁপতে নির্জন রাস্তার বুক চিরে বৃষ্টির মধ্যে দ্রুত পায়ে হেঁটে চলছিল । হঠাৎ মাঝপথে ওই চারজন নরপশুর কবলে পড়ে। প্রথম প্রথম মেহনূর একেবারেই বুঝতে পারেনি যে তার সাথে আসলে কী ঘটতে যাচ্ছে। সে ভেবেছিল হয়তো সাধারণ কোনো পথচারী। কিন্তু ভুল ভাঙতে বেশি সময় লাগেনি। যখন সে খেয়াল করল লোকগুলো চরম মদ্যপ অবস্থায় টালমাটাল হয়ে তার দিকে তীব্র লালসা আর কুৎসিত নজরে তাকাচ্ছে এবং একের পর এক মুখে আনা অসম্ভব এমন অশ্লীল কথাবার্তা ছুড়ে দিচ্ছে, তখনই মেহনূরের পায়ের নখ থেকে মাথা পর্যন্ত ভয়ের এক শীতল স্রোত বয়ে গেল। নিজের সম্মান আর জীবন বাঁচাতে আর এক মুহূর্তও দেরি না করে, সে ওখানেই প্রাণ হাতে নিয়ে এক ভৌ দৌড় দিল। হোস্টেলের কাছাকাছি আসতেই মেহনূরের শরীরে আর একবিন্দু দৌড়ানোর শক্তি অবশিষ্ট রইলোনা। তীব্র ক্লান্তিতে তার পা দুটো সীসার মতো ভারী হয়ে আসছে, প্রতিটা পদক্ষেপে যেন ভেঙে পড়তে চাইছে শরীর। তার ওপর দুপুরের পর থেকে বাড়তে থাকা জ্বরের প্রকোপ এখন চরমে মাথার ভেতরটা অনবরত ভোঁ ভোঁ করছে, চারপাশের সব কিছু তীব্র গতিতে ঘুরছে। ভয়ের তীব্রতায় আর শরীরের দুর্বলতায় তার মনে হচ্ছে পায়ের নিচের শক্ত মাটিটুকুও যেন আচমকা সরে যাচ্ছে।শরীরটা আর এই ধকল বইতে পারল না। হঠাৎ সামনে একটা ব্ল্যাক প্রাইভেট কারের তীব্র হেডলাইট চোখে পড়ল । বৃষ্টির পানির কারণে ঝাপসা হয়ে যাওয়া চোখে মেহনূর শেষবারের মতো ওই আলোর উৎসের দিকে তাকাল। আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না সম্পূর্ণ জ্ঞান হারিয়ে সেন্সলেস হয়ে গাড়িটির ঠিক সামনেই পিচঢালা রাস্তায় লুটিয়ে পড়ল।
সন্ধ্যা ক্রমশ গাঢ় হয়ে চারপাশটা আরও অন্ধকার আর রহস্যময় হয়ে উঠছে। ঝাপসা চেতনার অতল গহীন থেকে মেহনূর হঠাৎ মুখের ওপর এক পশলা শীতল পানির ঝাপটা অনুভব করল। পানির হিমশীতল স্পর্শে তার বন্ধ চোখের পাতা দুটো কেঁপে উঠল। পিটপিট করে চোখ মেলতেই ভয়ে তার শরীরের রক্ত যেন এক মুহূর্তে হিম হয়ে জমে গেল। কোনো এক বিলাসবহুল দামী গাড়ির নরম সিটে আধশোয়া অবস্থায় আছে সে। গাড়ির ভেতরের মৃদু আলোয় চারপাশটা আবছা দেখা যাচ্ছে। তার ঠিক পাশেই অত্যন্ত কাছাকাছি বসে একজন অপরিচিত পুরুষ গভীর, পলকহীন দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে। লোকটার সেই তীক্ষ্ণ আর গভীর চাহনি মেহনূরের ভেতর পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিল। কিছুক্ষণ আগের ট্রমা, মাতাল লোকগুলোর তাড়া করার আতঙ্ক আর বর্তমানের এই অচেনা পরিস্থিতি সব মিলিয়ে মেহনূর নিজের মানসিক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল। আত্মরক্ষার চরম তাড়নায় তীব্র ভয়ে ডান হাতটা শূন্যে তুলে সে লোকটার গালে সপাটে এক চড় বসিয়ে দিল। এত বড় একটা ঘটনার পরও যুবকটির মধ্যে রাগ বা ক্ষোভের কোনো লক্ষণ দেখা গেল না, এমনকি তার শরীরে সামান্যতম কোনো হেলদোলও হলো না। মেহনূরের ওপর থেকে দৃষ্টি না সরিয়ে সে তখনও ঠিক আগের মতোই স্তব্ধ হয়ে এক গভীর, অপার্থিব ঘোরের মধ্যে বুঁদ হয়ে হারিয়ে ফেলছে।
হঠাৎ মেহনূরের খেয়াল হলো নিজের পরনের কাপড়ের দিকে। লজ্জায় আর আড়ষ্টতায় তার পুরো শরীর যেন এক মুহূর্তে কুঁকড়ে গেল। সে কাঁপা কাঁপা হাতে নিজের ভেজা সাদা ওড়নাটি টেনে নিয়ে কোনোমতে পুরো শরীর ঢেকে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করল। ভয়ার্ত চোখে একবার চারপাশ দেখে নিয়ে, সে আর এক মুহূর্তও সেখানে থাকা নিরাপদ মনে করল না। শরীর থরথর করে কাঁপছে, তবুও সর্বশক্তি দিয়ে গাড়ির লক খুলে দরজাটা গলিয়ে পালানোর চেষ্টা করল । কিন্তু তার পা গাড়ির বাইরে পড়ার আগেই, হঠাৎ পেছন থেকে লোহার মতো শক্তপোক্ত একটা হাত মেহনূরের নরম কবজিটা খপ করে ধরে ফেলল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই লোকটা তাকে নিজের দিকে এক প্রচণ্ড হেঁচকা টান দিল। মেহনূর নিজের শরীরের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারল না। সে ছিটকে এসে সরাসরি ওই অপরিচিত যুবকটির একেবারে গা ঘেঁষে সিটের ওপর ধপাস করে পড়ে গেল। ঠিক তখনই যুবকটি মেহনূরের আরও কাছে ঝুঁকে এল। তাদের মধ্যকার দূরত্ব এখন একদম শূন্যের কোঠায়। যুবকটির নাক-মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসা তপ্ত নিশ্বাস মেহনূরের ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া মুখে এসে আছড়ে পড়ছে। ভয়ের চোটে মেহনূরের চোখের পাতা দুটো আবার বন্ধ হয়ে আসতে চাইল।
যুবকটি মেহনূরের কানের কাছে মাদকতাভরা গম্ভীর কণ্ঠে ফিসফিস করে বলে উঠল,
“তোমার এই মায়াবী মুখ যেন এক টুকরো সোনারঙা রোদ্দুর, যা এক লহমায় আমার পুরো অস্তিত্বকে পাগল করে দিয়েছে। সৌন্দর্যের এমন অপার্থিব, স্বর্গীয় পবিত্রতা আমি আমার জীবনে আগে কখনও দেখিনি। মনে হচ্ছে, এই পৃথিবীর সমস্ত আলো, সমস্ত রূপ বুঝি শুধু তোমার জন্যই সৃষ্টি হয়েছে। তোমার ওই পাপড়ির মতো ঠোঁট যেন জান্নাতের সুরভিত পারিজাত ফুল, যার তীব্র সুবাসে দূর থেকেও আমার নিঃশ্বাস আটকে আসছে।”
কথাগুলো বলতে বলতে যুবকটি মেহনূরের আরও একটু কাছে এগিয়ে এল। তার চোখের মনিতে তখন ভালোবাসার এক আদিম ও তীব্র আকর্ষণ। সে মেহনূরের কম্পিত হাতের ওপর নিজের উষ্ণ হাতটা রেখে আকুল স্বরে বলল,
“শোন মেয়ে! আমি তোমাতে বিলীন হয়ে যেতে চাই। বিলীন করে দিতে চাই আমার এই পুরো সত্ত্বাকে। আমার এই নিঝুম, ঘোর অন্ধকার জীবনে তুমি কি আজীবন কারাদণ্ড হয়ে আসবে? Will you marry me ?”
একদিকে শরীরের তীব্র জ্বরের উত্তাপ, অন্যদিকে অজানা আতঙ্কে তার পুরো অস্তিত্ব কাঁপছে। তার ওপর এমন এক পরিস্থিতিতে এক সম্পূর্ণ পরপুরুষের এই নিষিদ্ধ, অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ মেহনূরের ভেতরটাকে ঘৃণায় রি রি করে তুলল। লোকটার মুখ থেকে বেরিয়ে আসা ভালোবাসার কোনো কথাই আসলে তার কান পর্যন্ত পৌঁছায়নি। ভয় আর আত্মরক্ষার তীব্র তাড়নায় হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে সে লোকটির সেই শক্তপোক্ত হাতে নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে সজোরে কামড় বসিয়ে দিল। দাঁত বসে যাওয়ার তীব্র যন্ত্রণায় যুবকটির হাতের বাঁধন মুহূর্তের মধ্যে শিথিল হয়ে গেল। সেই সুযোগে মেহনূর এক মুহূর্তও দেরি না করে গাড়ির দরজাটা হ্যাঁচকা টানে খুলে ফেলল। পিচঢালা অন্ধকার রাস্তায় পা রাখতেই সে পাগলের মতো দৌড়াতে শুরু করল এবং কিছুদূর গিয়েই হোস্টেলের খোলা গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল। মেহনূরের দাঁতের তীব্র কামড়ে যুবকটির হাত থেকে রক্তের লাল ধারা ফিনকি দিয়ে ছুটে এল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এত তীব্র যন্ত্রণাতেও সে কোনো চিৎকার করল না, এমনকি তার মুখ থেকে একটা উফ শব্দও বের হলো না। সে ক্ষতবিক্ষত হাতটার দিকে তাকাতে মুহূর্তেই তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক অদ্ভুত পৈশাচিক হাসি। নিজের রক্তাক্ত হাতের দিকে তাকিয়ে, ক্ষতস্থানে আলতো করে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে সে গম্ভীরস্বরে বলল,
“উফ! কী তীব্র আর মায়াবী এই কামড়! তোমার দেওয়া এই ক্ষতটা তো সাধারণ কোনো ক্ষত নয় মেয়ে, এটা তো আমার প্রতি তোমার ভালোবাসার প্রথম স্বাক্ষর। তুমি যতই দূরে পালাও না কেন, আমার এই রক্তের প্রতিটা ফোঁটা এখন শুধু তোমার নাম জপছে। তুমি আমার এই অন্ধকার পৃথিবীর একমাত্র আলো, আর সেই আলোকে খাঁচায় বন্দি করার চাবিকাঠি এখন আমার হাতে। খুব শীঘ্রই আবার আমাদের দেখা হচ্ছে হার্টবিট! তখন এই অবাধ্যতার মধুর শাস্তি তোমাকে পেতেই হবে।”
এই ভয়ঙ্কর ঘটনার পর মেহনূরের মনের ওপর যে গভীর ট্রমা বসে গিয়েছিল সে আর হোস্টেলে থাকেনি। তীব্র প্যানিক অ্যাটাক আর আতঙ্কের কারণে সে শেষমেশ হোস্টেল ছেড়ে শহরের অন্য প্রান্তে তার মামারবাড়িতে চলে যায়। এমনকি নিজের মানসিক শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সে তার পুরনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বিদায় জানায়। ক্রেডিট ট্রান্সফার করিয়ে সে মামারবাড়ির কাছাকাছি একটি সাধারন কলেজে ভর্তি হয়ে যায়। নতুন পরিবেশে এসেও তার মনের ভেতরের জমাট বাঁধা ভয়টা সহজে কাটেনি। সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে বাস্তব জীবন সব জায়গা থেকেই সে নিজেকে একরকম গুটিয়ে নিয়েছে। খুব প্রয়োজন ছাড়া সে চার দেয়ালের বাইরে একদম পা বাড়াই না। এভাবেই দীর্ঘ প্রায় এক মাস পুরোপুরি ঘরবন্দি অবস্থায় কাটানোর পর, মনের ভেতরের তীব্র ফোবিয়াটাকে কোনোমতে জোর করে চেপে রেখে সে আবার নতুন করে কলেজ ক্যাম্পাসে যাওয়া শুরু করে।
হোস্টেলে থাকার সময় মেহনূরের নিজের বলতে কোনো একাডেমিক বই ছিল না। সে তার মামাতো বোন সায়নার বই দেখেই পড়াশোনা চালিয়ে নিত। কারণ, তার মামি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন,
"একজনের জন্য বই কিনলে তো দুজনেই ভাগাভাগি করে পড়তে পারে। আলাদা বই কিনে অপাত্রে টাকা খরচা করার কী দরকার!"
মামা আহির খান তবুও ভাগ্নির কষ্টের কথা চিন্তা করে লুকিয়ে বই কিনে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মামির সাথে অশান্তির কথা ভেবে মেহনূর নিজেই তখন শক্তভাবে মানা করে দিয়েছিল। এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। মেহনূর নতুন কলেজে অ্যাডমিশন নিয়েছে। এখানে নিজের বই ছাড়া কোনো গতি নেই। এবার তার মামা আহির খান আর আগের ভুলের পুনরাবৃত্তি করতে চাইলেন না। মামির চোখ ফাঁকি দিয়ে তিনি সোজা মেহনূরের হাতে বেশ কিছু চকচকে টাকার নোট গুঁজে দিলেন এবং স্নেহমাখানো কণ্ঠে বললেন,
"আজকের মধ্যেই সব বই কিনে আনবি।"
মেহনূর টাকাগুলো হাতে নিয়ে কিছুটা ইতস্তত করে বলল,
"কিন্তু মামা! এতগুলো টাকা! মামি যদি কোনোভাবে জানতে পারে তবে খুব রাগ করবেন। বাড়িতে আবার অশান্তি শুরু হবে।"
আহির খান ভাগ্নির মাথায় হাত রেখে ভরসা দিয়ে বললেন, "চুপ, কিচ্ছু জানবে না সে। আমি সব সামলে নেব। তুই শুধু নিজের পড়ালেখায় মন দে।"
মেহনূর অগত্যা আর কথা না বাড়িয়ে টাকাগুলো ব্যাগে পুরে নিল। তাদের এলাকার বড় সুপার মার্কেটের ঠিক অপোজিটেই রয়েছে শহরের সবচেয়ে বিখ্যাত এবং সুপরিসর একটি লাইব্রেরি। বহুতল বিশিষ্ট এই বুক শপে এমন কোনো বই নেই যা পাওয়া যায় না। বিশ্বের তাবৎ জ্ঞান আর সাহিত্যের এক বিশাল স্বর্গরাজ্য যেন এটি।
মেহনূর তার প্রয়োজনীয় সব একাডেমিক বই একে একে বেছে নিল। কিন্তু কাউন্টারে যাওয়ার আগে হঠাৎ তার মনে হলো, অবসর সময় কাটানোর জন্য দুটো উপন্যাসের বই নিলে মন্দ হয় না। সেই উদ্দেশ্যে ফিকশন সেকশনের দিকে এগোতেই আচমকা তার নজর পড়ল সাজিয়ে রাখা কিছু চমৎকার ইসলামিক বইয়ের ওপর। সে কৌতূহলী হয়ে প্রতিটি বইয়ের প্রচ্ছদ আর নামের ওপর দৃষ্টি বুলালো। মেহনূর তার জীবনে কোনোদিন কোনো ইসলামিক বই ছুঁয়েও দেখেনি। ইসলাম সম্পর্কে একদম প্রাথমিক বা বেসিক জ্ঞানটুকুও তার মধ্যে নেই বললেই চলে। ছোটবেলা থেকেই সে বড় হয়েছে তার মামির কাছে। তার মামি শায়লা খান অত্যন্ত আধুনিক ও উগ্র সোসাইটি মেইনটেইন করা একজন মহিলা। মামাতো ভাই রাদিফ বিদেশে। সায়না ছোট থেকে আধুনিকতার শিক্ষা নিয়ে বেড়ে উঠছে মায়ের আদরে। মেহনূরের সাথে তার ভাব ও হয়নি কোনোসময়। সায়না বড় হওয়ার সাথে সাথে প্রচন্ড উশৃঙ্খল ও অবাধ্য হয়ে উঠে। আহির খান সবসময় মেয়েকে শাসান আর মেহনূরের মতো শান্ত ভদ্র হতে বলেন। সায়নার ধারণা মেহনূর তার বাবাকে তার থেকে কেড়ে নিয়েছে। সেই থেকে মেহনূর সায়নার জাতশত্রু। আহির খান সবসময় নিজের বিজনেস নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। অভিভাবকহীনতার এই একাকিত্বে একা একা বড় হওয়ায় মেহনূর স্বভাবগতভাবেই ভীষণ ভীতু আর অন্তর্মুখী এক মেয়ে হয়ে উঠেছে। তাকে কেউ কখনো ইসলাম শেখায়নি। এমনকি নামাজ কীভাবে নিয়ম মেনে পড়তে হয়, সেটাও সে জানে না। পবিত্র কুরআন রিডিং পড়তেও সে পারে না। কিন্তু আজ বইগুলোর দিকে তাকিয়ে হঠাৎ মেহনূরের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। সেই ঝড়-বৃষ্টির রাতের মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার স্মৃতিটা তার মনে ভেসে উঠল। তার মনে হলো মরতে তো হবেই একদিন! আজ যদি সে মারা যায়, তবে আল্লাহর কাছে গিয়ে সে কী জবাব দিবে? এই তীব্র অপরাধবোধ আর অনুশোচনা থেকে সে এক লহমায় সিদ্ধান্ত বদলে ফেলল। উপন্যাসের চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে সে বেশ কয়েকটি জীবনমুখী ইসলামিক বই নিজের জন্য কিনে নিল। আর তার সাথে পরম শ্রদ্ধায় লুফে নিল বাংলা তাফসীরসহ একটি পবিত্র কুরআনের কপি। কুরআন যখন সে সরাসরি আরবিতে পড়তেই পারে না, তখন অন্তত এর বাংলা অর্থ আর অনুবাদগুলো তো মন দিয়ে পড়তে পারবে! বই কেনা শেষে সব বই নিয়ে মেহনূর আবার একটি রিকশায় চেপে বসল। রিকশাটি তার মামারবাড়ির উদ্দেশ্যে ধীরগতিতে চলতে শুরু করল। মেহনূর বুকের ভেতর পরম যত্নে আগলে রাখা কুরআনের ব্যাগটার ওপর হাত রাখল। সে মেঘমুক্ত বিকেলের আকাশের দিকে তাকিয়ে এক বুক হালকা নিশ্বাস ফেলে মনে মনে ভাবল, "কুরআন পড়াটা এবার যেভাবে হোক শিখতেই হবে। রাবেয়া খালার কাছে গিয়ে কাল থেকেই পড়া শুরু করব। আর এই ব্যাপারটা আজই মামাকে বলতে হবে।”
চলবে?