#অন্দরবাসিনী
#পর্ব ২
হোস্টেলের ২০৪ নাম্বার রুমে ফুল ভলিউমে গান বাজছে। সায়না আর তার বন্ধুরা মিলে গোল হয়ে বসে গানের তালে তালে গলা মেলাচ্ছে। গানের লিরিক্সগুলো এমন যা পরোক্ষভাবে সৃষ্টিকে স্রষ্টার সমকক্ষ করে তোলে পরিষ্কার শিরক মিশ্রিত কথাবার্তা। রুমের ঠিক মাঝখানে গানের সেই উন্মাতাল তালে তালে নাচছে সুস্মিতা ও ফারিয়া। তাদের পরনে শর্ট কুর্তি। নাচের নিখুঁত হিল্লোলে তারা পরিবেশটা আরও জমিয়ে তুলেছে। দুজনেই গানের প্রতিটি লিরিক্সের সাথে নিজেদের শরীরকে এমনভাবে দোলাচ্ছে যেন বাইরের দুনিয়ার আর কোনো কিছুর দিকেই তাদের খেয়াল নেই। তাদের এই ওয়েস্টার্ন ড্যান্স স্টেপ আর আনন্দের চিৎকার পুরো রুমের ভেতরের উত্তেজনাকে একদম তুঙ্গে নিয়ে গেছে। কিন্তু সেই গানের ভেতরে যে কতটা গভীর শিরক লুকিয়ে আছে, তা নিয়ে কারো কোনো ভ্রুক্ষেপ নাই, হইতো জানেইনা। তারা পরম আনন্দে সেই সুরের সাথে তাল মিলিয়ে চিৎকার করে গাইছে আর নাচছে।
সুস্মিতা আর ফারিয়ার সেই দুর্দান্ত নাচ দেখে তাদের বন্ধুমহল দুই হাত দিয়ে জোরে জোরে তালি বাজাতে লাগল। সায়নার চোখ দুটো তখন উত্তেজনায় চকচক করছে। নাচের একটা স্টেপ শেষ করে ফারিয়া হাপাতে হাপাতে ধপ করে বান্ধবীদের পাশে বসে পড়ল। কপালে জমে থাকা ঘামটা হাত দিয়ে মুছে সে সায়নার দিকে তাকিয়ে বলল,
"কী রে সায়না! এভাবে হা করে কী দেখছিস? তুইও চলে আয় না আমাদের সাথে! জাস্ট ট্রাই করে দেখ, মাইন্ড একদম রিফ্রেশ হয়ে যাবে।"
সুমি হাটুতে মাথা রেখে সায়নার দিকে তাকিয়ে বলল,
" আজকালকার দিনে একটু-আধটু ড্যান্স না জানলে কোনো পার্টি বা গেট-টুগেদারে মুখ দেখানো যায়? এটা তো এখন জাস্ট একটা ফ্যাশন বা আর্ট না, ইটস আ লাইফস্টাইল!"
ফারিয়া সুমির কথায় সায় দিয়ে বলল,
"একদম ঠিক বলেছিস সুমি। আমাদের সার্কেলের অলমোস্ট সব ফ্রেন্ডরাই এখন ফ্রি টাইমে কোনো না কোনো নামী ড্যান্স একাডেমিতে ক্লাস করছে। তুই বিলিভ করবি না সায়না, ড্যান্স ক্লাস জয়েন করার পর থেকে আমার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ আর কনফিডেন্স লেভেল কতটা বুস্ট আপ হয়েছে! নিজেকে অন্যরকম কুল মনে হয়। বাবার ভয়ে বসে থাকলে তো চলবে না। জীবনটাকে ফুল স্বাধীনতা দে।"
বান্ধবীদের এমন আধুনিক চিন্তাভাবনা আর চারপাশের এই জমকালো পরিবেশ সায়নার মনে এক অদ্ভুত দোলা দিল। তার মনে হলো, সত্যিই তো! সে কেন এই ট্রেন্ড থেকে পিছিয়ে থাকবে? নিজেকে সবার সামনে আরও প্রেজেন্টেবল আর স্মার্ট হিসেবে তুলে ধরতে ড্যান্স শেখাটা তো এখন ভীষণ দরকার।সুস্মিতা সায়নার চোখের ভেতরের সেই দ্বিধা আর আগ্রহটা টের পেয়ে আরেকটু উসকে দিয়ে বলল,
"বেশি ভাবিস না সায়না। ধানমণ্ডির দিকে একটা দারুণ ড্যান্স ক্লাব আছে, যেখানে হিপহপ আর সালসা শেখানো হয়। একদম ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড! তুই জয়েন করলে আমরা তিন বান্ধবী একসাথে রক করতে পারব।"
বান্ধবীদের এমন ক্রমাগত উৎসাহ আর ড্যান্স ক্লাসের সেই গ্ল্যামারাস লাইফের হাতছানি সায়নার ভেতরের সব দ্বিধা এক মুহূর্তে দূর করে দিল। সে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল যে সেও এবার ড্যান্স ক্লাসে ভর্তি হবেই। সায়না ফোনটা হাতে নিয়ে বেলকনিতে চলে গেল। মায়ের নাম্বারে ডায়াল করতেই ওপাশ থেকে রিসিভ করলো সাথে সাথেই। মায়ের কণ্ঠস্বর শুনতেই আহ্লাদী সুরে বলল,
" হ্যালো! কেমন আছো মা?"
" ভালো আছি। তুই কেমন আছিস?
" ভালো মা। আমি ড্যান্স ক্লাস জয়েন করতে চাচ্ছি মা। আমার সার্কেলের অলমোস্ট সব ফ্রেন্ডরাই ফ্রি টাইমে ড্যান্স শিখছে। প্লিজ মা, তুমি বাবাকে একটু কনভিন্স করো না!"
"আরে এই না হলো আমার মেয়ে। তুই ভর্তি হয়ে যা। অনেক বড় হ মা৷ তোর বাবাকে ম্যানেজ করার দায়িত্ব আমার। ওসব নিয়ে তোকে একদম প্যানিক করতে হবে না, আমি এখনই তোকে টাকা পাঠিয়ে দিচ্ছি।"
সায়না খুশিতে তার ফ্রেন্ড সুস্মিতাকে জড়িয়ে ধরল,
"ওহ গড, থ্যাংক ইউ সো মাচ মাম্মি! ইউ আর দ্য বেস্ট মাদার ইন দ্য ওয়ার্ল্ড!"
"আচ্ছা আচ্ছা, হয়েছে, এখন রাখ তো। দেখি তোর বাবা কী করছে।"
সায়না কল কাটতেই শায়লা খান মুচকি হেসে দীর্ঘশ্বাস
ফেললেন। মেয়ের জন্য তার খুব গর্ব হয়। মেয়েটাকে আধুনিক ধাঁচে সে বড় করতে পেরেছে এরচেয়ে বড় কিছু আর কি হতে পারে।
এরপর কেটে গেছে আরও একটি বছর। ঘড়ির কাঁটা তখন কাঁটায় কাঁটায় সন্ধ্যা সাতটার ঘর ছুঁয়েছে। গোধূলির শেষ রক্তিম আভা তখন দিগন্তরেখা থেকে মুছে গিয়ে চরাচরে অন্ধকারের এক নিবিড় মখমলি চাদর বিছিয়ে দিয়েছে। ‘মীর্জা ভিলা’র রাজকীয় তোরণের সামনে এসে থামল একটি শুভ্র ক্যাব। ইঞ্জিনের মৃদু গুঞ্জনটুকু স্তিমিত হতেই ধীর ও গম্ভীর পদক্ষেপে গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলেন আহির খান। ঠিক পরমুহূর্তেই গাড়ির বিপরীত দিকের দরজা খুলে দর্পভরে বেরিয়ে এলেন তার স্ত্রী শায়লা খান এবং আদুরে একমাত্র মেয়ে সানাই খান। তোরণের কৃত্রিম উজ্জ্বল আলোয় তাদের পরনের অত্যাধুনিক পোশাক আর বহুমূল্য অলঙ্কারের কারুকাজ থেকে ঠিকরে বেরোচ্ছিল এক উগ্র জৌলুস। ঠিক পরেই গাড়ি থেকে অত্যন্ত সন্তর্পণে নেমে এল আপাদমস্তক কালো আবায়ায় মোড়ানো মেহনূর। জিলবাবের আড়ালে তার চোখগুলো ও অদৃশ্য।
মেহনূরের জন্মলগ্নেই এক ট্র্যাজেডির শুরু। যেদিন সে পৃথিবীতে প্রথম চোখ মেলল, ঠিক সেই ক্ষণেই তার মা আফিফার জীবনপ্রদীপ নিভে গিয়েছিল। প্রিয়তমা স্ত্রীর মৃত্যুর শোক রওশান আলীর হৃদয়ে বেশিদিন স্থায়ী হয়নি বরং মেহনূরের শৈশবের শুরুতেই তিনি দ্বিতীয় সংসার পাতেন। বিয়ের কয়েক বছরের মাথায় মেহনূরকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় মামার বাড়ির আশ্রয়ে।
আহির খান তার সবচেয়ে আদুরে ছোট বোনের এই অকাল প্রস্থানকে কখনোই নিয়তি বলে মানতে পারেননি। তার অন্তরে এক সুপ্ত দহন তিনি বিশ্বাস করেন, আফিফার মৃত্যুর পেছনে রওশানের নিষ্ঠুর অবহেলা লুকিয়ে ছিল। কোনোভাবে তিনি জেনেছিলেন, মেহনূরের মা বেঁচে থাকাকালীনই রওশান তার বর্তমান স্ত্রীর সাথে পরকীয়ার মোহে মত্ত ছিলেন। সেই থেকে মামার বুকে অকৃত্রিম পিতৃস্নেহ আর মামি শায়লা খানের অবহেলার বিষবাণ এই দুইয়ের দোলাচলেই মেহনূরের শৈশব ও কৈশোর অতিবাহিত হয়েছে।
‘মীর্জা ভিলা’! সাতমহলা এই রাজকীয় বাড়িটির প্রতিটি ইটে আজ যেন উৎসবের স্পন্দন লেগেছে। কয়েক হাজার সোনালি মরিচবাতির আলোকছটা শ্বেতপাথরের শুভ্র দেয়ালে আছড়ে পড়ে এক মায়াবী অলীক পরিবেশ তৈরি করেছে। সদর গেটের বিশালাকার তোরণটি তাজা গোলাপ আর বেলী ফুলের ঘন বুননে ঢাকা। সেখান দিয়ে ভেতরে পা রাখতেই এক ভুরভুরে সুবাস নাসিকায় এসে ধাক্কা দেয়, যা আগন্তুককে এক লহমায় অভিভূত করে।
প্রাসাদের বিশাল আঙিনা জুড়ে বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে মখমলের লাল গালিচা। ওপরের বিশালাকার ঝাড়বাতিগুলো থেকে চুঁইয়ে পড়া স্ফটিক স্বচ্ছ আলো গালিচার ওপর আছড়ে পড়ে তার গাঢ় লাল রঙে টকটকে এক আভিজাত্য ছড়িয়ে দিচ্ছে চারদিকে। আজ এই মীর্জা বাড়ির বড় মেয়ে, ফারহানা মীর্জার মেহেদী অনুষ্ঠান। একমাত্র বোনের জীবনের এই বিশেষ দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে ভাই তালহা যেন কোনো ত্রুটি রাখেনি। তার একক প্রচেষ্টায় এবং অদম্য উৎসাহে এই চোখধাঁধানো আয়োজন। উৎসবের এই প্রখর রোশনাই আর খুশির জোয়ারে বাড়ির প্রতিটি মানুষ আজ মাতোয়ারা।
এই বিশাল 'মীর্জা ভিলা'র একচ্ছত্র অধিপতি হলেন বংশের বড়কর্তা আদিল মীর্জা। একসময়ের প্রতাপশালী এই সিটি মেয়রের ব্যক্তিত্বের সেই অমোঘ ভার আজও পুরো বাড়ির প্রতিটি কোণায় অনুভূত হয়। আদিল মীর্জার উত্তরাধিকার বহন করে চলেছে তার তিন সন্তান। বড় ছেলে রোহিত মীর্জা, মেজো ছেলে রায়হান মীর্জা আর সবার শেষে পরিবারের একমাত্র আদুরে কন্যা শায়লা খান, যার দর্প আর জেদ আজও এই অট্টালিকায় বজায় আছে। বড় ছেলে রোহিতের দুই সন্তান তালহা মীর্জা এবং ফারহানা মীর্জা। অন্যদিকে মেজো ছেলে রায়হানের দুই ছেলে তৌসিফ ও আরমান। তবে এই মহ মহ উল্লাসের মাঝে সবচেয়ে প্রাণবন্ত হলো রায়হানের একমাত্র চঞ্চলা কন্যা আফিয়া মীর্জা, যার পদশব্দে অট্টালিকার অলিন্দগুলো সর্বদা মুখরিত থাকে। কিন্তু এই আনন্দ আর আভিজাত্যের মাঝখানেও এক দীর্ঘশ্বাসের মতো লুকিয়ে আছে একটি বিষাদমাখা অধ্যায় যেখানে আদিল মীর্জার আজীবনের সহধর্মিণী মরিয়ম বেগম দীর্ঘকাল ধরে অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী।
মেহনূর গুটিগুটি পায়ে তার মামা ও মামিকে অনুসরণ করে অন্দরমহলে প্রবেশ করল। বিশাল ড্রয়িংরুমের মাঝখানে তখন আড্ডার আসর জমেছে। শায়লার বড় ভাই রোহিত মীর্জা আর ছোট ভাই রায়হান মীর্জা আত্মীয়-স্বজনদের সাথে উচ্চকিত আলোচনায় মত্ত। আহির খানকে অন্দরে পা রাখতে দেখেই তারা সপ্রতিভ ভঙ্গিতে এগিয়ে এসে কুশল বিনিময় করলেন। রোহিত মীর্জা হো হো করে এক অকৃত্রিম হাসিতে এগিয়ে গিয়ে আহিরকে বুকে জড়িয়ে নিলেন। শায়লার দুই ভাবি সাহিদা আর আয়শা, তাদের একমাত্র ননদ শায়লাকে দেখা মাত্রই যেন আহ্লাদে গদগদ হয়ে উঠলেন। শায়লার আধুনিক পোশাক আর দামী গয়নার প্রশংসা করতে করতে তারা মেতে উঠলেন নিবিড় খোশগল্পে। একপাশে অবহেলিত লতার মতো নতমুখে দাঁড়িয়ে আছে মেহনূর। সে ধীর পায়ে এগিয়ে এসে সালাম দিল,
"আসসালামু আলাইকুম মামি ।"
মেহনূরের সেই শান্ত ও মায়াবী কন্ঠ শুনে সাহিদা আর আয়শা খানিকটা অবাক হয়ে তার দিকে ফিরে তাকালেন। আপাদমস্তক আবায়ায় ঢাকা মেয়েটি যেন এই বিপুল উৎসবের জৌলুসে বড়ই বেমানান। সাহিদা ও আয়শা সালামের উত্তর দেওয়ার তোয়াক্কা না করে তারা একে অপরের দিকে তাকালো। আয়শা ভ্রু কুঁচকে বলে উঠলেন,
"তুমি মেহনূর না? তোমার এই অবস্থা কেন? জঙ্গীর মতো বেশভূষা। গরম লাগেনা তোমার? "
শায়লা থমথমে মুখে বলল, " তার কথা বাদ দাও ছোটভাবি। তাকে আমি যতটা স্বাধীনতা দিছি আমার মেয়েটাকে ও দিইনি। সে নিজের ইচ্ছামতো চলে।আমার কথার মূল্য আছে নাকি তার কাছে। গতবছর থেকেই হুট করেই এসব বেশভূষা ধারণ করেছে। "
সাহিদা সানাইকে কোথাও না দেখে বলল,
" আচ্ছা বাদ দাও না বোন। সানাই কই? আমাদের মিষ্টি মেয়েটা কোথায় গেল?"
খানিক দূরে মামাতো বোনদের আড্ডা থেকে সানাইয়ের খিলখিল হাসি ভেসে আসছে। সানাইয়ের আধুনিকতা ও সৌন্দর্য দেখে উত্তেজনায় আয়শা সাহিদার হাতটা চেপে ধরে বলেই ফেললেন,
"আমাদের সানাই আর তালহা তো একেবারেই রাজযোটক হবে ভাবি! কী বলো?"
শায়লা পাশে দাঁড়িয়ে তৃপ্তির হাসি হাসলেন। মেয়ের প্রশংসায় বুকটা যেন গর্বে ফুলে উঠল তার। দম্ভের সাথে বললেন,
"আমার মেয়ে লাখে একটা। এমন লক্ষ্মী আর গুণবতী মেয়ে তোমরা আর একটিও খুঁজে পাবে না।"
মুহূর্তের জন্য বড় ভাবি সাহিদার হাসিমাখা মুখটা এক চিলতে অস্বস্তিতে থতমত খেয়ে গেল। তিনি পরক্ষণেই মুখে এক চিলতে কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে পরিস্থিতি সামলে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন,
"তালহা যা ছেলে! বিয়ে তো অনেক দূরের কথা, এসব কথা ওর কানে গেলে ও একাই পুরো বাড়ি মাথায় তুলবে। কাউকে আস্ত রাখবে না। আমার ছেলেটাকে তো তোমরা চিনোই, মেজাজ চড়লে ও কি পরিমাণ রাগী হয়ে ওঠে। তার ওপর ও একটা অচেনা-অজানা মেয়েকে পাগলের মতো ভালোবাসে ।"
শায়লা অবশ্য দমবার পাত্রী নন। তিনি ঠোঁটের কোণে এক বাঁকা হাসি ফুটিয়ে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সুরে জবাব দিলেন,
"ঠিক আছে ভাবি, এসব নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। যা দেখার তা আমার মেয়েই দেখে নেবে। সানাইয়ের রূপ আর চোখের জাদুর কাছে ওসব পাগলামি ধোপে টিকবে না। চলো এবার রুমে যাই, শরীরটা বেশ ম্যাজম্যাজ করছে, একটু ফ্রেশ হওয়া দরকার।
কথার মাঝেই শায়লা মেহনূরের দিকে তাকিয়ে বললেন, "মেহনূরের জন্য বরাদ্দকৃত রুমটাও ওকে দেখিয়ে দাও।"
ছোট বউ আয়শা মেহনূরকে ইশারা করলেন আসার জন্য। মেহনূর কোনো কথা না বলে মাথা নিচু করে নীরবে তাকে অনুসরণ করল। তার জন্য থাকার ব্যবস্থা হয়েছে দ্বিতীয় তলার একেবারে শেষ প্রান্তের কক্ষটিতে। সদর মহলের জৌলুস আর আগত মেহমানদের উচ্চকিত শোরগোল করিডোর পার হয়ে সেখানে খুব একটা পৌঁছায় না। আয়শা কক্ষের দরজাটা খুলে মেহনূরকে ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়ে বললেন,
"শোনো মেয়ে, শায়লা আপা বলল তুমি নাকি একটু বেশিই হুজুগে টাইপের হয়ে গেছো ইদানীং । তোমার এসব সেকেলে বেশভূষা দেখলে মানুষজন তোমাকে অশিক্ষিত আর ব্যাকডেটেড বলবে। তাতে আপার মান-সম্মানও টানাটানি হবে। তাই সম্মান বাঁচানোর খাতিরেই আপা তোমার জন্য এই নিরিবিলি ঘরের ব্যবস্থা করতে বলেছে। এই রুমটা একটু ছোট হতে পারে, কিন্তু তোমার মতো একজনের এতে দিব্যি চলে যাবে।"
মেহনূর পাথরের মূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছোট মামির কথাগুলো শুনলো। কোনো প্রতিবাদ না করে সে কেবল একবার যান্ত্রিকভাবে মাথা নাড়াল। আয়শা এবার মেহনূরের আপাদমস্তক ঢাকা কালো আবায়ার দিকে অত্যন্ত বিরক্তিকর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,
"আর শোনো, এই অজপাড়াগাঁয়ের বেশভূষা অন্তত এই বাড়িতে চলবে না। বড় বড় দামী মেহমানদের ভিড়ে এসব দেখলে মানুষ হাসাহাসি করবে, আড়ালে কটূক্তি করবে। বলছি কী, এই কয়েকটা দিন অন্তত এই ভূতুরে সাজটা বাদ দাও। বাড়িতে গিয়ে না হয় আবার এসব ছাইপাশ যা ইচ্ছা পরিও।"
এতক্ষণ পাথরের মতো নিশ্চুপ থাকলেও এবার মেহনূর আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে অস্ফুট স্বরে কাঁপা গলায় বলে উঠল,
"মামি! পর্দা আল্লাহর ফরজ বিধান।"
কথাটা শেষ করেই সে একটা শুকনো ঢোক গিলল। নিজের অজান্তেই যেন বড় কোনো অপরাধ করে ফেলেছে। অপরাধীর মতো চিবুক নামিয়ে নতমুখে দাঁড়িয়ে রইল। তার এই সোজাসাপ্টা উত্তর শুনে আয়শা যেন আকাশ থেকে পড়লেন। মুহূর্তেই তার মুখভঙ্গি পাল্টে গেল। আয়শা ভ্রু কুঁচকে বললেন,
"ভারী চেটাং চেটাং কথা বলো তো দেখছি! আগে তো কোনোদিন হিজাব করতে দেখিনি তোমাকে। দুদিনের মেয়ে হয়ে আমাদের চেয়ে বেশি ধর্ম বুঝো? তোমার মঙ্গলের জন্যই ভালো কথা বলেছিলাম। যখন মানুষের বুলির স্বীকার হবে তখন বুঝবে। পর্দা করার বয়স তো সামনে ঢের পড়ে আছে। বুড়ো বয়সে যখন মরা-টরার দিন ঘনিয়ে আসবে, তখন করলেই হবে। এখন তো তোমার ফুর্তি করার বয়স, জীবনকে চেনার বয়স। একটু মজা-মাস্তি করো, লোকসমাজে মিশতে শেখো। এমন ব্যাকডেটেড হয়ে থাকলে তো অন্ধকারে পড়ে থাকতে হবে, ঠিক আছে?"
মেহনূর আর কোনো কথা বাড়াল না। সেই পরিচিত বাধ্য মেয়ের মতো চিবুকটা বুকের কাছে নামিয়ে নিল সে। তার এই নতজানু নীরবতায় আয়শা যেন এক ধরণের জয়ী হওয়ার তৃপ্তি পেলেন। মেহনূরকে তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে তৈরি হওয়ার নির্দেশ দিয়ে তিনি গটগট করে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেলেন।
মেহনূর একাই রয়ে গেল সেই নিস্তব্ধ ঘরে। দীর্ঘ পথযাত্রার ক্লান্তি আর মনের ওপর বয়ে যাওয়া অবহেলার ঝড় ঝেড়ে ফেলতে সে গোসল করে ফ্রেশ হয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল। আলমারিতে রাখা মামির দেওয়া সেই শুভ্র গাউনটা সে গায়ে জড়িয়েছে। এশার নামাজের ওয়াক্ত হতেই সে জায়নামাজে দাঁড়িয়ে পড়ল। রবের দরবারে মাথা নত করে দীর্ঘক্ষণ মোনাজাত সেরে সে আবারও আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
মেহনূরের জীবনের সমীকরণটা বড়ই বিচিত্র। তার মামি শায়লা খান ভীষণ কড়া আর আধুনিকতার মোহে আচ্ছন্ন নারী। তিনি মেহনূরকে কখনোই নিজের মেয়ের আসনে বসাতে পারেননি। শায়লার কাছে মেহনূর মানেই এক আপদমস্তক বোঝা। প্রতিটি পদক্ষেপে তিনি তাকে অবহেলা করেন, বিষাক্ত সব কটু কথায় তার নরম বুকটা বিদ্ধ করেন। অথচ এই মনভাঙা হাহাকার মরুভূমির মাঝেও মেহনূরের জন্য এক ফোঁটা মরুদ্যান হয়ে আছেন তার মামা আহির খান। তিনি মেহনূরের কাছে এক বিশাল ছায়াদানকারী বটবৃক্ষ। যে মমতায় তিনি মেহনূরকে আগলে রাখেন, তাতে মেহনূর মাঝে মাঝে ভুলে যায় যে সে এ বাড়ির কেউ নয়। পৃথিবীর সব তুচ্ছতাচ্ছিল্য আর অবহেলার বিরুদ্ধে মামাই তার একমাত্র আশ্রয়। মামির বিষবাণ যখন তাকে নীল করে দেয়, তখন মামার অকৃত্রিম পিতৃস্নেহটুকুই তার বেঁচে থাকার একমাত্র অক্সিজেন হয়ে দাঁড়ায়।
মেহনূর অত্যন্ত সন্তর্পণে চোখের কোণে জমে থাকা নোনা জলটুকু মুছে নিল। একরাশ ক্লান্তি আর মনের ভেতর জমে থাকা হাহাকার নিয়ে সে তোয়ালে হাতে বেলকনিতে গিয়ে বসল। বাইরের নিকষ কালো অন্ধকার আর শীতল হাওয়া যেন তার তপ্ত হৃদয়ে কিছুটা প্রলেপ দিল। সেখানে রাখা একটি পুরনো বেতের চেয়ারে বসে সে তার ভেজা লম্বা চুলগুলো মুছতে শুরু করল। তার কোমর ছাপিয়ে নেমে আসা চুলরাশি চেয়ার ছাড়িয়ে প্রায় মেঝের শ্বেতপাথর আছড়ে পড়ছে। রাতের এই নিস্তব্ধতা আর বেলকনির নির্জনতা মেহনূরকে ক্ষণিকের জন্য যেন এই নিষ্ঠুর জগত থেকে এক মায়াবী দূরত্বে নিয়ে গেল। আপন মনে গুনগুন করে কুরআন তিলাওয়াত করতে লাগলো আকাশের দিকে তাকিয়ে। ঠিক তখনই, অলক্ষ্যে তার দৃষ্টি আটকে গেল পাশের লাগোয়া বেলকনিটার ওপর। মুহূর্তের জন্য মেহনূরের হৃদস্পন্দন যেন স্তব্ধ হয়ে গেল, শরীরের রক্ত হিম হয়ে এল আতঙ্কে। সেখানে এক সুঠামদেহী যুবক কানে হেডফোন গুঁজে গভীর মনোযোগে ল্যাপটপের স্ক্রিনে কোনো এক জটিল কাজে মগ্ন। ঝাড়বাতির আবছা আলো তার মুখে আছড়ে পড়ছে।
"সেই ভয়ংকর লোকটা! এখানে কেন?"
মেহনূরের ভেতরটা হু হু করে কেঁপে উঠল। তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়াতে গিয়ে ভারসাম্য হারিয়ে মেহনূর ধপাস করে চেয়ারসহ মেঝেতে আছড়ে পড়ল। তীব্র ব্যথায় মুহূর্তের জন্য শরীর অবশ হয়ে এলেও সে এক পলক সময় নষ্ট করার সাহস পেল না। পাছে সেই ভয়ংকর মানুষটার নজরে পড়ে যায়, সেই আদিম ত্রাসে দ্রুত বেলকনির এক কোণে থাকা বড় বড় ফুলগাছগুলোর ঘন ঝোপের আড়ালে নিচু হয়ে কুঁকড়ে বসে রইল। তার বুকটা তখন প্রবল ভয়ে ওঠানামা করছে। থরথর করে কাঁপতে থাকা অবশ হাতে সাদা ওড়নাটা সে কোনোমতে মাথায় ও মুখে পেঁচিয়ে নিজেকে আড়াল করার আপ্রাণ চেষ্টা করল। কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে থাকার পর, একরাশ শঙ্কা আর কৌতূহল নিয়ে মেহনূর আড়াল থেকে খুব সাবধানে উঁকি দিল।এরপর এক দৌড়ে সে নিজের ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ল। খট করে দরজাটা বন্ধ করে দিয়েই সে দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে মেঝেতে বসে পড়ল। ঘরের নিস্তব্ধতায় সে নিজের দ্রুত হৃদস্পন্দনের 'ঢিবঢিব' শব্দ নিজেই পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছে। দুহাতে মুখ ঢেকে মনে মনে আতঙ্কিত স্বরে আওড়াতে লাগল,
"ইয়া রব্বি! এ কোন মুসীবতে পড়লাম আমি? সেই লোকটা এই বাড়িতে কী করছে? তবে কি সে আমাকে এখনও ফলো করছে!"
চরম আতঙ্কে মেহনূরের পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছে। হঠাৎ এক কর্কশ 'খটখট' শব্দ ভেসে আসল। মেহনূরের মনে হলো তার হৃৎপিণ্ডটা যেন এক লাফে কণ্ঠনালীর কাছে চলে এসেছে। একটা শুকনো ঢোক গিলে কাঁপা হাতে দরজার খিলটা খুলে দিল।
চলবে....