#অন্দরবাসিনী
পর্ব ৩
চরম আতঙ্কে মেহনূরের পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছে। হঠাৎ এক কর্কশ 'খটখট' শব্দ ভেসে আসল। মেহনূরের মনে হলো তার হৃৎপিণ্ডটা যেন এক লাফে কণ্ঠনালীর কাছে চলে এসেছে। একটা শুকনো ঢোক গিলে অত্যন্ত কাঁপা হাতে দরজার খিলটা খুলে দিল।
সামনে একজন গৃহপরিচারিকাকে ট্রে হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মেহনূরের দেহে যেন প্রাণ ফিরে এলো। সার্ভেন্টটি খাবারের ট্রে নিয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকল এবং নিপুণ হাতে সেটি টেবিলের ওপর রেখে বলল,
"ম্যাম! শায়লা ম্যাম বলে দিয়েছেন ডিনারটা সেরে আপনি যেন দ্রুত নিচে মেহেদি অনুষ্ঠানে চলে যান। আর বিশেষভাবে বলেছেন একটু সেজেগুজে আসতে, এই যে এই শাড়িটা তিনি আপনার জন্য পাঠিয়েছেন। চিন্তা করবেন না, সেখানে কোনো পরপুরুষ নেই সবাই বাড়ির মহিলা আর আপনার মামাতো ভাইয়েরা।"
মেহনূর মাথা নেড়ে শাড়িটা হাতে নিল। সার্ভেন্টটি ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই সে ঝড়ের বেগে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে শক্ত করে খিল তুলে দিল। দামী রেশমি শাড়িটা পরম অবহেলায় রেখে দিল ডিভানের উপর । টেবিলে সাজানো রাজকীয় খাবারের দিকে তাকিয়ে মেহনূরের ভেতরটা হঠাৎ হু হু করে উঠল। সুগন্ধি বাসমতী চালের বিরিয়ানি আর মখমলি মাংসের টুকরোগুলোর ঘ্রাণ নাকে আসতেই সে ধীর পায়ে এসে চেয়ারে বসল। 'বিসমিল্লাহ' বলে অত্যন্ত আলতো করে এক লোকমা খাবার মুখে তুলল সে। খাবারের স্বাদটা সত্যিই অতুলনীয়, যেন কোনো রাজকীয় পাকশালার রান্না। কিন্তু খেতে খেতে মেহনূরের অবাধ্য চোখ দুটো বারবার বেলকনিটার দিকে চলে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ আগের ঘটনা মনে পড়তেই প্রতিটি লোকমা যেন তার গলার নিচে আটকে যাচ্ছে। ডিনার শেষ করে সে আর নিচে মেহেদী অনুষ্ঠানে যাওয়ার সাহস পেল না। একরাশ আতঙ্ক নিয়ে কম্বল মুড়ি দিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল । মাথার ভেতর আকাশ-পাতাল সব দুশ্চিন্তা ভিড় করতে লাগল,
"লোকটা কি তবে সেই চড়ের প্রতিশোধ নিতেই আমার পিছু নিয়েছে? কিন্তু লোকটার তো আমাকে চেনার কথা না! তবে সে পিছু নিল কীভাবে?"
এই সব এলোমেলো ভাবনা আর অজানা আশঙ্কার মাঝেই সে ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে গেল।
মধ্যরাতের ঘড়ির কাঁটা যতই এগোচ্ছে, মীর্জা ভিলার ভেতরের হলরুমের জাকজমক ততোই বাড়ছে। সাউন্ড সিস্টেমের আধুনিক রিমিক্স গানে পুরো মেঝেই যেন কাঁপছে। হলরুমের মাঝখানে তৈরি করা হয়েছে ড্যান্স ফ্লোর। সেখানে বাড়ির তরুণ-তরুণীরা একসাথে কোমর দুলিয়ে আধুনিক ড্যান্সের সাথে ওয়েস্টার্ন ব্যালি নাচের এক দারুণ ফিউশন পারফর্ম করছে। কিছুক্ষন পর ড্যান্স ফ্লোরের আলো এক নিমেষে বদলে নীল আর বেগুনি রঙ ধারণ করল। মঞ্চে হেলেদুলে প্রবেশ করল সায়না। তার পরনে জমকালো লেহেঙ্গা মাথায় ছোট কেফিয়া। সে যখন গানের তালের সাথে অত্যন্ত সাবলীল ভঙ্গিতে নৃত্য শুরু করল তখন উপস্থিত সবার চোখ যেন তার ওপর আটকে গেল। তার প্রতিটি মুভমেন্টে ছিল নিখুঁত পেশাদারিত্ব এবং এক অদ্ভুত মোহনীয়তা। পুরো হলরুম হাততালি আর শীষ বাজাতে লাগল। ড্যান্স ফ্লোরের ঠিক সামনের সুসজ্জিত সোফায় বসে আছে কনে ফারহানা। তার এক হাত ধরে অনবরত লাফাচ্ছে তার পিচ্চি চঞ্চল কাজিন আফিয়া। ফারহানা লাজুক বধূদের মতো ঘোমটা টেনে ভারী গয়না আর লাল বেনারসির সাজে বসে আছে।
হলরুমের ডান পাশের দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে একঝাঁক তরুণ। এদের মধ্যে ফারহানার কাজিন তৌসিফ এবং আরমানের বন্ধুদের অনেকেই উপস্থিত। ড্যান্স ফ্লোরের তীব্র আলো আর মিউজিকের এই হুল্লোড় থেকে কিছুটা দূরে, ভেতরের রুমে তখনও আড্ডা জমিয়ে রেখেছেন ফারহানার বাবা রোহিত এবং তাঁর চাচারা, আত্মীয় স্বজনরা। ঘড়িতে মধ্যরাত পার হলেও আত্মীয়-স্বজন আর প্রতিবেশীদের মাঝে উৎসবের আমেজ বিন্দুমাত্র কমেনি সবাই যার যার মতো আনন্দে মেতে আছেন।
তৌসিফের পাশে দাঁড়িয়ে তার দুই বন্ধু আবির ও সিয়াম। তাদের দুজনের চোখই আটকে আছে ড্যান্স ফ্লোরে সায়নার মোহনীয় নাচের দিকে। সায়নার চমৎকার ওয়েস্টার্ন ড্যান্স স্টেপ আর নিখুঁত শারীরিক ছন্দ দেখে সিয়াম নিজের উত্তেজনা সামলাতে পারল না। সে কনুই দিয়ে তৌসিফকে একটা খোঁচা দিল। বাঁকা বলল,
"দোস্ত, মেয়েটা কে রে? একদম মাথা নষ্ট অবস্থা!"
তৌসিফ সায়নার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
"আমার ফুপির মেয়ে, বড় ভাইয়ার বাগদত্তা। যদিও এই বিয়েটা আদৌ হবে কিনা আমি জানি না। তালহা ভাইয়া মোটেও পছন্দ করে না মেয়েটাকে। কিন্তু বাড়ির বড়রা ছোটবেলা থেকেই তাদের এই বিয়ে ঠিক করে রেখেছেন।"
কথাটি বলে তৌসিফ নিজেও একদৃষ্টিতে সায়নার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। পাশ থেকে আবির তার হাতের কোল্ড ড্রিঙ্কসের গ্লাসে একটা চুমুক দিল। সায়নার ড্যান্স মুভমেন্টের দিকে চোখ রেখেই সে রসিয়ে বলল,
"পুরো বোম! একে হ্যান্ডেল করা চাট্টিখানি কথা না।"
বন্ধুর মুখে এমন আপত্তিকর মন্তব্য শুনে তৌসিফের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সে আবিরের দিকে রাগী চোখে তাকিয়ে শক্ত গলায় বলল,
"মেয়েদের সম্মান দিতে পারিস না তো কাউকে নিয়ে কিছুই বলবি না। সে আমার কাজিন, এটা মাথায় রাখিস।"
আবির তৌসিফের রেগে যাওয়া দেখেও একটুও দমল না। বরং পরোয়া না করে হাসতে হাসতে বলল,
"খোসাছাড়া কলায় তো মাছি বসবেই, হাহাহা! ও তো আর ঝিনুকে মোড়ানো মুক্তা না!"
সায়নাকে নিয়ে এমন নোংরা ও সস্তা মন্তব্য শুনে তৌসিফের মাথার রক্ত চড়ে গেল। সে চরম ক্ষোভে আবিরের দিকে তেড়ে এসে তাকে মারতে উদ্যত হলো। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সিয়াম চট করে দুজনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তৌসিফকে চেপে ধরল এবং আবিরকে সরিয়ে দিয়ে দুজনকে শান্ত করার চেষ্টা করল। তৌসিফ রাগে কাঁপতে কাঁপতে আবিরকে একটা শক্ত ধাক্কা দিল। তারপর দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
"এক্ষুণি এখান থেকে চলে যাবি! তোর এই মুখ যেন আমি আর কখনো না দেখি।"
আবির কিছুটা থমকে গেল। সে চলে যাওয়ার আগে এক হিংস্র শিকারির চোখে শেষবারের মতো সায়নার দিকে তাকাল। তারপর তৌসিফের চোখের দিকে চোখ রেখে বলল, "এই অপমানের প্রতিশোধ তো আমি নিবই। দেখে নিস!"
কথাটা বলেই আবির আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। ধপাধপ পা ফেলে মীর্জা ভিলার সদর দরজা পেরিয়ে অন্ধকারের মধ্যে চলে গেল। বন্ধুর এমন আচরণ আর অনাকাঙ্ক্ষিত এই ঝামেলার পর তৌসিফের মনটা বিষিয়ে উঠল। সে এক বুক ক্লান্তি আর দীর্ঘশ্বাস নিয়ে উৎসবের আলো থেকে নিজেকে সরিয়ে নিজের কক্ষের দিকে পা বাড়াল।
শেষরাতে হঠাৎ মেহনূরের ঘুম ভেঙে গেল। রাতের নিস্তব্ধতা চিরে তখনও অস্পষ্ট গান-বাজনার আওয়াজ ভেসে আসছে। রাতের ঘটনা মনে পড়তেই সে অস্থির হয়ে গেল। মনের অস্থিরতা কাটাতে বিছানা ছেড়ে ওজু করে নিল। তারপর জায়নামাজ বিছিয়ে রবের সাক্ষাতে দাঁড়িয়ে গেল তাহাজ্জুদের নামাজে। সেজদায় লুটিয়ে পড়ে পরম করুণাময় রহমানের কাছে হৃদয়ের সব আহাজারি ও ফরিয়াদ জানাল,
“ ইয়া রহমান! এতবেশি গুনাহ নিয়ে কিভাবে তোমার সামনে হাজির হবো? গুনাহের এই বিরানভূমিতে এক পথহারা মুসাফির আমি। ইয়া রব্বি আমাকে হেদায়েত দান করুন। আমাকে এক্ষুনি মাফ করে দিন। ইয়া মাওলা মাফ না করলে যে আমার কোনো উপায় থাকবেনা। “
দীর্ঘ মোনাজাত শেষ হতেই দূর থেকে ভেসে আসছে ফজরের সুমধুর আজান। ফজরের ফরজ নামাজ আদায় করে মেহনূর গুনগুন সুরে কিছুক্ষণ কুরআন তেলাওয়াত করল। বাড়ির মেহমান আর আত্মীয়স্বজনরা সারারাত নির্ঘুম হুল্লোড় শেষে এখন বেঘোরে ঘুমুচ্ছে। রাতের কোলাহলপূর্ণ বাড়িটি এখন একদম নিস্তব্ধ। কেবল হেসেল থেকে মাঝেমধ্যে ক্ষীণ টুংটাং শব্দ ভেসে আসছে। হয়তো বাবুর্চি বা বাড়ির কোনো পরিচারক ব্যস্ত হয়ে পড়েছে সকালের নাস্তার আয়োজনে। মেহনূর একটি বড় জিলবাব গায়ে দিয়ে নিজেকে ভালোভাবে আবৃত করে নিল। তারপর অত্যন্ত সন্তর্পণে পা টিপে টিপে সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠে এল। ছাদের ওপর পা রাখতেই ভোরের হিমেল হাওয়া তার চোখে-মুখে পরশ দিয়ে গেল। পুব আকাশে তখন কালচে অন্ধকার ফিকে হয়ে আসছে। ধীরে ধীরে সেখানে লালিমা আভা ফুটে উঠতে শুরু করেছে। মেহনূর ছাদের কার্নিশে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ হয়ে প্রকৃতির এই রূপবদল দেখছে। অন্ধকার চিরে যখন টকটকে লাল সূর্যটা উঁকি দিল, তখন চারপাশের গাছপালা আর দিগন্ত এক মায়াবী সোনালি আলোয় স্নান করে উঠল। পাখির কিচিরমিচির শব্দ আর ভোরের এই শান্ত পরিবেশ তার বিষণ্ণ মনে এক অদ্ভুত সজীবতা এনে দিল। মনে মনে ভাবল, রাতের অন্ধকার যেমন সূর্যের আলোয় ধুয়ে যায়, তার জীবনের মেঘও হয়তো এভাবেই কেটে যাবে। প্রকৃতির শান্ত ও স্নিগ্ধ মায়ায় বিভোর হয়ে মেহনূর অনেকটা সময় কাটিয়ে দিল। ভোরের কাঁচা রোদ যখন মিঠে আলো ছড়িয়ে দিচ্ছিল তখনই তার সম্বিৎ ফিরল। বাড়ির লোকজন জেগে ওঠার আগেই নিজের নিভৃত কক্ষে ফিরে যাওয়া প্রয়োজন এই ভেবে সে যেই না সিঁড়িঘরের দিকে পা বাড়াল, অমনি তার সারা শরীরের রক্ত যেন হিম হয়ে গেল। মুহূর্তের জন্য মেহনূরের হৃৎপিণ্ডটা স্তব্ধ হয়ে গেল। সেই লোকটা! ঠিক সিঁড়িঘরের দরজায় হেলান দিয়ে, দুহাত বুকের ওপর ভাঁজ করে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে সে। লোকটার গভীর ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে সরাসরি মেহনূরের ওপর। সেই চাহনিতে কোনো চপলতা নেই, বরং আছে এক অদ্ভুত নেশা আর নিবিড় অধিকারবোধ যেন সে কোনো পরম কাঙ্ক্ষিত শিকারকে অতি সূক্ষ্মভাবে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে আর অনেকদিনের তৃষ্ণা মিটাচ্ছে। লোকটার চোখের পলক পড়ছে না, সেই একরোখা দৃষ্টি যেন মেহনূরের অন্তরাত্মা পর্যন্ত বিদ্ধ করছে। ভয়ে আর এক অজানা লজ্জায় মেহনূরের সারা শরীর অবশ হয়ে আসছে। চঞ্চল হাতে জিলবাবের উপরের অংশটি নেকাবের উপর ছেড়ে দিল। এতে চোখ দুটোও ঢেকে গেল। এক পা নড়াচড়া করার শক্তিটুকুও সে হারিয়ে ফেলেছে। বাতাসের হাহাকার ছাপিয়ে সে নিজের হৃদস্পন্দনের শব্দ শুনতে পাচ্ছে। অবাধ্য মনটাকে জোর করে শান্ত করার চেষ্টা করল সে, মনে মনে নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে আওড়াতে লাগল,
"ভয় পাস না মেহনূর! শান্ত হ। লোকটা নিশ্চয়ই এই বাড়ির কোনো আত্মীয় হবে। আর আমি তো এখন আপাদমস্তক জিলবাবে ঢাকা, সে তো আমার মুখ-চোখ কিছুই দেখেনি। আমাকে চিনবে কী করে? আমি অযথাই আতঙ্কিত হচ্ছি।”
একবুক সাহস সঞ্চয় করে, জড়তা মাখা পায়ে সে লোকটার পাশ কাটিয়ে নিচে নামার জন্য পা বাড়াল। বুক ধকধক করছে তার, সিঁড়ির প্রথম ধাপে পা রাখতেই হঠাৎ একটা শক্তপোক্ত হাতের ছোঁয়া লাগল মেহনূরের কবজিতে। বিদ্যুৎবেগে লোকটা তার হাত চেপে ধরল। মেহনূর নিজের সর্বশক্তি দিয়ে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো। যন্ত্রণায় আর আতঙ্কে কাতর হয়ে সে ক্ষীণ স্বরে বলল,
"হাতটা ছাড়ুন, আমি খুব ব্যথা পাচ্ছি!"
তার আর্তনাদে মুহূর্তেই বাঁধন আলগা করে দিল। কিন্তু মেহনূর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার আগেই লোকটি তার আরও কাছে এসে দাঁড়াল। মেহনূরের পর্দাবৃত মুখে তাকিয়ে সে গম্ভীর কন্ঠে গর্জে উঠল,
"তালহা মীর্জার হাত থেকে পালানোর দুঃসাহস দেখাও মেয়ে! জানো তুমি কার সামনে দাঁড়িয়ে আছো?"
অপরিচত সেই লোকটাই তালহা! ভাবতেই মেহনূরের শরীর হিম হয়ে আসলো। কোনো পরপুরুষের এমন নিবিড় সান্নিধ্য মেহনূরের জন্য অসহ্য। তার ওপর তালহার ওই তীক্ষ্ণ চাউনি! মেহনূর বিচলিত হয়ে চারপাশে তাকাল, যদি কেউ দেখে ফেলে এই ভয়ে সে তোতলাতে তোতলাতে বলল,
"দে দেখুন! আপনি এভাবে...."
তালহা ওর কথা শেষ করতে দিল না। এক অদ্ভুত ঘোরলাগা দৃষ্টিতে মেহনূরের নিকাবাবৃত মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
"হ্যাঁ, দেখছি তো! খুব খুঁটিয়ে দেখছি। বেসামাল প্রেমে পড়েছি। কি করি বলো তো। অপেক্ষার প্রহর যে শেষ হচ্ছেনা।"
তালহা এগিয়ে আসার সাথে সাথে মেহনূর অনিচ্ছাসত্ত্বেও পিছিয়ে যেতে লাগল। এক পর্যায়ে পেছনের দেয়ালের সাথে তার পিঠ ঠেকে গেল। পালাবার কোনো পথ নেই। আতঙ্কে মেহনূরের চোখ ফেটে নোনা জল গড়িয়ে পড়ল নিকাবের ভেতরে। কম্পিত কণ্ঠে সে মিনতি করল,
"আপনি.....আপনি একটু দূরে গিয়ে কথা বলুন। আমি শুনছি তো আপনার কথা!"
মেহনূরের কান্না আর অসহায়ত্ব দেখে তালহার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। সে ধীরপায়ে কিছুটা দূরে গিয়ে দাঁড়াল। পকেটে হাত গুঁজে গম্ভীর কন্ঠে বলল,
"সেদিনের পাওনা উত্তরটা তো দিলে না, সুইটহার্ট! মীর্জা বাড়ির ছেলেকে চড় মারার স্পর্ধা দেখিয়েছিলে। ভেবেছিলে পার পেয়ে যাবে? এই দুঃসাহসের শাস্তি তো তোমাকে পেতেই হবে, আর সেটা আমি কড়ায়-গন্ডায় উসুল করব।"
মেহনূর মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে, তার হাত-পা থরথর করে কাঁপছে। সে কল্পনাও করতে পারেনি এই সেই তালহা মীর্জা! তার মামা-মামি যদি জানতে পারেন যে সে মীর্জা বংশের উত্তরসূরির গায়ে হাত তুলেছে, তবে তাকে ত্যাজ্য করতেও দ্বিধা করবেন না। সানাইয়ের কাছে শুনেছে এই লোকটির ক্ষমতা আকাশচুম্বী। শহরজুড়ে ত্রাস ছড়িয়ে বেড়ায়। কিন্তু দিনের আলোয় উনার চেয়ে ভালো মানুষ আর কেউ নাই। সব মেয়েরা উনার জন্য ফিদা। কিন্তু আমি তো খুব ভালো করেই জানি লোকটা চরিত্রহীন। সানাই এমন একটা মানুষের জন্য পাগল। হইতো জীবনের প্রতি মায়া নাই মেয়েটার। মামা-মামির কথাই বা কি বলব! তাদের বিয়েতে আসার উদ্দেশ্যই একটাই তালহার সাথে সানাইয়ের বিয়ে দেওয়া। তার আকাশ-পাতাল ভাবনার মাঝে তালহা তুড়ি বাজাতেই তার সম্বিৎ ফিরলো। সে ক্ষীণ গলায় বলল,
"আপনি সেদিন আমার নিকাবে হাত দিয়েছিলেন বলেই চড়টা খেয়েছিলেন। আর আজও আপনি আমার অনুমতি ছাড়া হাত স্পর্শ করলেন। এগুলো ইসলামে গর্হিত কাজ,যিনার সমান। আপনি আমার জন্য পরপুরুষ, এভাবে আমায় হেনস্তা করার অধিকার আপনার নেই। রাসুল (স) বলেছেন,
চোখের যিনা হলো পরনারীর দিকে তাকানো, কানের যিনা হলো শোনা, জিহ্বার যিনা হলো কথা বলা, হাতের যিনা হলো স্পর্শ করা এবং পায়ের যিনা হলো খারাপ উদ্দেশ্যে অগ্রসর হওয়া।' (সহীহ মুসলিম)
মেহনূরের মুখে রাসুল (সা.)-এর এই হাদীস শুনে তালহা ক্ষণিকের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। তার মতো দোর্দণ্ড প্রতাপশালী মানুষকে এভাবে মুখের ওপর কেউ কোনোদিন পাপ-পুণ্যের হিসেব বুঝিয়ে দেওয়ার দুঃসাহস দেখাইনি। বিষয়টি তার কাছে আরও ইন্টারেস্টিং লাগল। তালহা ঠোঁট কামড়িয়ে আবার এক পা এগিয়ে এসে তীক্ষ্ণ চোখে মেহনূরের দিকে আপাদমস্তক তাকিয়ে বলল,
"শাস্তির কথা তো পরকালের জন্য তোলা রইল। কিন্তু এই দুনিয়ায় তালহা মীর্জার অবাধ্য হওয়ার শাস্তি যে খুব ভয়াবহ হয়, সেটা কি তুমি জানো?"
মেহনূর ভীত গলায় স্পষ্ট স্বরে বলল,
"আল্লাহর ভাণ্ডার অসীম। তাঁর কাছে চাইলে তিনি মানুষকে অগণিত নিয়ামত দান করেন। কিন্তু সেই নিয়ামত পাওয়ার প্রধান শর্ত হলো তাঁর আনুগত্য। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা হেদায়েত দেন, আবার যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট হতে দেন। তবে জেনে রাখুন, যে মানুষটি আমার স্রষ্টা থেকে দূরে চলে গেছে, যে মানুষটি আল্লাহর আদেশ-নিষেধের তোয়াক্কা করে না, তেমন কাউকে আমি আমার জীবনসঙ্গী হিসেবে কল্পনাও করতে পারি না। জীবনসঙ্গী তো সে-ই হওয়া উচিত, যে আমাকে জান্নাতের পথে এগিয়ে নেবে, পাপে ডুবিয়ে দেবে না। আমার পর্দা আগলে রাখবে, আমার ঈমান বাঁচাবে, আমাকে তাওয়াক্কুল শেখাবে। "
মেহনূর হন্তদন্ত হয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেল। তালহা রেলিং ধরে ওপর থেকে তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। বাঁকা হাসি দিয়ে নিজের হাতের তালুটা মুষ্টিবদ্ধ করে বিড়বিড় করে বলল,
"পালিয়ে যাবে? এই তালহা মীর্জার রাজত্ব থেকে পালানো কি এতই সহজ ? তুমি জানো না, আমি যাকে একবার আমার বলে ভেবে নিই, সে আমারই থাকে। যাও যত দূর যেতে পারো। কিন্তু মনে রেখো, তোমার প্রতিটা পদক্ষেপ আমার হাতের মুঠোয় । তোমার ওই পবিত্রতা, ওই জেদ সবই একদিন আমার এই অন্ধকার নেশার কাছে ধরা দিতে বাধ্য। আমি তোমাকে জান্নাতের পথে নিয়ে যেতে পারব কি না জানি না, কিন্তু আমার নরকের সঙ্গী হিসেবে আমি তোমাকেই বেছে নিয়েছি। "
তীর্যক দৃষ্টিতে বাঁকা হেসে সে সিঁড়ি বেয়ে বাইরে চলে গেল। মেহনূর নিজের রুমে ঢুকে দরজায় খিল দিয়েই ধপাস করে ডিভানে এলিয়ে পড়ল। তার বুকটা তখন থরথর করে ওঠানামা করছে, যেন কোনো এক ভয়ংকর রাক্ষস থেকে সে মাত্রই নিজেকে রক্ষা করে এসেছে। কাঁপাকাঁপা হাতে টেবিল থেকে জগ নিয়ে গ্লাসে পানি ঢালল। "বিসমিল্লাহ" বলে এক নিশ্বাসে পুরো গ্লাস পানি গিলে ফেলে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। কিন্তু মনের অস্থিরতা একটুও কমছে না।
মেহনূর দ্রুত নিজের ব্যাগ গুছাতে শুরু করল। দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে নিজেকেই বলতে লাগল
"যাই হয়ে যাক, কেউ কিছু জানার আগেই এখান থেকে পালাতে হবে। মামা-মামি যদি ঘুণাক্ষরেও কিছু জানতে পারে, তবে কেলেঙ্কারির শেষ থাকবে না। তারা কত আশা নিয়ে বসে আছে সানাইয়ের সাথে তালহার বিয়ে দিবে। অথচ এই লোকটা! লোকটার না আছে বিন্দুমাত্র গায়রত, না জানে সে ইসলামের কোনো বিধি-নিষেধ। ইয়া রব্বি! এ কোন উন্মাদের পাল্লায় পড়লাম আমি!"
সে দ্রুত নিজের কালো আবায়া দিয়ে পর্দার আড়ালে নিজেকে আবৃত করে নিল। উৎসবের ক্লান্তি নিয়ে সবাই তখনো অঘোরে ঘুমাচ্ছে, মেহনূর পা টিপে টিপে বাড়ির সদর দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
চলবে!