Posts

উপন্যাস

অন্দরবাসিনী পর্ব ৪

August 1, 2026

Saima Jannat Mawa

4
View

#অন্দরবাসিনী
পর্ব ৪
 

উৎসবের ক্লান্তি নিয়ে সবাই তখনো অঘোরে ঘুমাচ্ছে, মেহনূর  পা টিপে টিপে বাড়ির সদর দরজার দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু গেটের কাছাকাছি পৌঁছাতেই তার রক্ত হিম হয়ে গেল। সামনেই তালহা গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসে আছে, আর জানালার পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন  শায়লা । তালহা চরম অনিচ্ছা সত্ত্বেও ভ্রু কুঁচকে তার ফুপুর কথা শুনছে। শায়লা খান বেশ উৎসাহ নিয়ে  নিজের মেয়ে সানাইকে নিয়ে গদগদ প্রশংসা করছেন ভাইপোর কাছে। মেহনূর ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে গেল। এক পা সামনে এগোনোর শক্তিও যেন নেই। সে দেয়াল ঘেঁষে সন্তর্পণে তাদের দৃষ্টি এড়িয়ে গেট দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু  তখনই বজ্রপাতের মতো কানে এল শায়লা খানের তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর,

"মেহনূর! কোথায় যাচ্ছিস এই সকাল সকাল? হাতে ব্যাগ কেন?”

মেহনূরের সারা শরীর থরথর করে কেঁপে উঠল।  যেন কোনো এক ভয়ংকর বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে আছে সে। গাড়ির ভেতর থেকে তালহা চকিত নয়নে সেদিকে তাকাল। সানগ্লাসের সেই কালচে আবরণের আড়ালে তার তীক্ষ্ণ চোখ দুটো যেন মেহনূরের নিকাব ভেদ করে সরাসরি হৃদস্পন্দন মেপে নিচ্ছে। তালহার ঠোঁটের কোণে এক রহস্যময় নির্লিপ্ততা, যেন সে এই পরিস্থিতির প্রতিটি সেকেন্ড উপভোগ করছে। শায়লা খান ভ্রু কুঁচকে এগিয়ে এলেন,

“কী হলো? ভোরবেলায়  ব্যাগ নিয়ে কোথায় যাচ্ছিস?”

মেহনূর শুকনো ঢোক গিলল। গলার ভেতরটা মরুভূমির মতো খাঁ খাঁ করছে। সে তোতলাতে তোতলাতে বলল,

“এ… এমনি। ভালো লাগছে না এখানে আমার। তাই চলে যাচ্ছি।”

শায়লা এবার বেশ অবাক হলেন, গলায় একটু কাঠিন্য এনে বললেন,

“ভালো লাগছে না মানে?”

মেহনূর বুঝতে পারল, এখন কোনো জোরালো অজুহাত না দিলে নিস্তার নেই। সে তার কাঁপা কণ্ঠস্বরকে যতটা সম্ভব সংযত করার চেষ্টা করে গম্ভীর মুখে বলল,

“আসলে মামি, কাল রাতে হঠাৎ মনে পড়ল ভার্সিটির একটা ইম্পর্টেন্ট অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেওয়ার শেষ তারিখ আজ। বাসায় ল্যাপটপে সব ফাইল সেভ করা, আর মেইল আইডি’র পাসওয়ার্ডও মনে পড়ছে না। ওটা আজ জমা দিতে না পারলে আমার সেমিস্টার ড্রপ হয়ে যেতে পারে। কাউকে ডিস্টার্ব করতে চাইনি বলে একাই বেরিয়ে যাচ্ছিলাম।”

শায়লা খান কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তাকে কথা বলার সুযোগ না দিয়েই গাড়ির ভেতর থেকে তালহার  গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল,

“ফুপি, ও যখন যেতেই চাইছে, তখন আমার গাড়িতেই না হয় পৌঁছে দিই? আমারও তো ওই পথেই কাজ।”

তালহার প্রস্তাব শুনে মেহনূরের কলিজা যেন মুহূর্তেই শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। এই গাড়িতে ওঠা মানে স্বেচ্ছায় বাঘের খাঁচায় পা রাখা। আতঙ্কে মেহনূর প্রায় চিৎকার করে বলে উঠল,

“না মামি! আমি একাই চলে যেতে পারব। আর আমি কোনো পরপুরুষের সাথে এভাবে একা যেতে পারব না, তুমি তো জানোই। একটু হেঁটে গেলেই তো বাড়ি। ”

মেহনূরের কথা শুনে শায়লা খানের মুখভঙ্গি মুহূর্তেই কঠোর হয়ে গেল। তিনি তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন,

“আমার ভাইপো কি তোর কাছে কোনো লম্পট বা খারাপ মানুষ মনে হয়? নিজের বড়দের নিয়ে এত নিচু ধারণা পোষণ করিস কী করে তুই?”

মেহনূর মাথা নিচু করে ধরা গলায় আবারও মিনতি করল, “মামি, পরপুরুষ তো পরপুরুষই হয়। শরীয়ত তো কারো আত্মীয়তা দেখে না।”

“চুপ কর বেয়াদব!” শায়লা গর্জে উঠলেন।

“আমার চেয়েও এখন বেশি বুঝিস তুই? যা বলছি চুপচাপ তাই করবি, নইলে আমার চেয়ে খারাপ আর কেউ হবে না। তোর এই লোক দেখানো পর্দা নিজের কাছে রাখ। মনে রাখিস, মনের পর্দাই আসল পর্দা।”

বলেই শায়লা কোনো উত্তরের অপেক্ষা না করে মেহনূরের হাত থেকে ঝটকায় ব্যাগটা কেড়ে নিলেন। তারপর একরকম জোর করেই তাকে টেনে এনে গাড়ির পেছনের সিটে বসিয়ে দড়াম করে দরজা বন্ধ করে দিলেন।
“ শোন যা কাজ আছে করে পুনরায় চলে আসবে।  দেশের পরিস্থিতি ভালো না। একাকী থাকলে কখন কি দূর্ঘটনা ঘটে,  তখন দোষটা তো আমার উপরেই চাপবে। নিজের মেয়ে নই বলে অবহেলা করেছি বলবে। এতো অপমান তো নিতে পারব না।আমার হয়েছে যত জ্বালা,  না পারছি ফেলতে না পারছি গিলতে।

মেহনূর নিশ্বাস আটকে চিবুকটা বুকের কাছে নামিয়ে গুটিসুটি মেরে বসে রইল। তার চোখ ফেটে তখন জল পড়ে নেকাব ভিজে গেছে । মেহনূরের চোখের পানি তালহার সহ্য হচ্ছে না। কেন সহ্য হচ্ছেনা নিজেও জানেনা। অনুভূতিটা তার কাছ একদমই নতুন।

মেহনূর চোখের পানি মুছে আবার চুপ হয়ে গেল৷ কারণ মামির বলা কথাগুলোর চেয়ে আরও ভয়ানক জিনিস তার সামনে বসে আছে।  সে বুঝতে পারছে, নিয়তি তাকে আবারও সেই মানুষটার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে যাকে সে সবচেয়ে বেশি ঘৃণা আর ভয় পায়। ড্রাইভিং সিটে তালহা রিয়ার-ভিউ মিররে মেহনূরকে দেখে  নিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলল। গাড়ি এসে থামল আহির খানের  বাড়ির সামনে।  মেহনূর এতক্ষণ ভয়ে চোখ বুজে ছিল, এবার কাঁপা কাঁপা চোখে মাথা তুলে তাকাল। গন্তব্যে এসে গেছে বুঝতে পেরে সে তড়িঘড়ি করে দরজার হাতলে হেঁচকা টান দিল, কিন্তু দরজাটা সেন্ট্রাল লক করা থাকায় খুললো না। আতঙ্কে মেহনূর মাথা নিচু করে পুনরায় সিটের এক কোণে গুটিসুটি মেরে বসে রইল। সামনের ড্রাইভিং সিটে বসা তালহা তখনো স্টিয়ারিং হুইলটা শক্ত করে ধরে সামনের দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ এক তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে  বলে উঠল,

"বোরকাওয়ালী! তুমি আমার হৃদয়ের স্পন্দন হয়ে গেছো সেই দিনের পর থেকে। পাগলের মতো কোথায় কোথায় যে তোমাকে খুঁজেছি! অথচ তুমি আমার কত কাছেই ছিলে। কথা দিলাম দুনিয়ার সব সুখ তোমার পায়ের কাছে এনে রাখব। তোমাকে কোনোদিন কষ্ট পেতে দিবনা। "

তালহার  কণ্ঠস্বরে ভেসে উঠল তীব্র আদিম তৃষ্ণা আর অধিকারবোধ। মেহনূর ভয়ে কাঁপছে ঠিকই, কিন্তু অবচেতন মনে তার ভেতরের দ্বীনি সত্তাটা জেগে উঠল। সে নিজের শুকনো ঠোঁট দুটো জিভ দিয়ে ভিজিয়ে নিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল,

"ভালোবাসেন?"

মেহনূরের মুখে এমন অপ্রত্যাশিত কথা শুনে তালহা তড়িৎগতিতে পেছন ফিরে তাকাল। সানগ্লাসটা খুলে সে ঘোরলাগা দৃষ্টি মেহনূরের ওপর নিবদ্ধ করে  গম্ভীর  গলায় বলল,

"হ্যাঁ, ভালোবাসি! "

মেহনূর সংকোচে  কুঁকড়ে গিয়ে প্রশ্ন ছুড়ল,

"এর দলিল কী?"

তালহা এবার এক হাত বাড়িয়ে সিটের ওপরটা চেপে ধরে ফিসফিসিয়ে বলল,

"দলিল? এই যে আমার প্রতিটি হৃদকম্পন, তোমার প্রতি আমার অপরিচিত এই মাতাল করা অনুভূতি। এটাই তোমার প্রতি আমার ভালোবাসার দলিল।"

মেহনূর হাল্কা ঢোক গিলে শুকনো গলাটা ভিজিয়ে কাঁপা স্বরে বলল,

 "কিন্তু এটা তো হারাম! আমি জেনে-বুঝে কেন  বিষপান করব?"

তালহার চোখে এবার এক উন্মাদ জেদ ফুটে উঠল। সে মেহনূরের আরও কাছে ঝুঁকে এসে বলল,

"হারাম-হালালের হিসাব আমি বুঝি না হার্টবিট। আমার শুধু তোমাকে চাই। চলো, আজই বিয়ে করে নিই। রাজি হয়ে যাও। এই ইন্তেজার আমি আর সহ্য করতে পারছি না। চলো হালাল হয়ে যায়।"

মেহনূর এবার মাথাটা আরও নিচু করে নিল। ক্ষীণ গলায় বলল ,

"কিন্তু আমাকে পেতে হলে কিছু শর্ত মানতে হবে।"

"বলো কী শর্ত? নিজের  জিন্দেগীটা তোমাকেই লিখে দিব। আমি চাই আজীবন তুমি আমার হয়ে থাকো। এই ধরো আমি মরে যাওয়ার পরও !"

মেহনূর এবার চোখ বন্ধ করে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে সবটুকু সাহস জড়ো করে বলল,

"আপনাকে এই জাহেলিয়াতি লাইফ থেকে বের হতে হবে। এই দূষিত আর নোংরা রাজনীতি চিরতরে ছাড়তে হবে। আল্লাহর দ্বীনের পথে ফিরে আসতে হবে আপনাকে। মদ পান করা যাবে না, সুন্নতি লেবাস ধারণ করতে হবে। সব হারাম আর বদ-অভ্যাস পরিত্যাগ করতে হবে। পারবেন কি নিজের রবের জন্য নিজেকে এভাবে আগাগোড়া পরিবর্তন করতে? হাতটা যদি ধরেন তবে দ্বীনে ফেরার অঙ্গীকার করুন।"

মেহনূর রুদ্ধশ্বাসে উত্তরের অপেক্ষা করছিল। তার ছোট শরীরটা আতঙ্কে থরথর করে কাঁপছে, যেন কোনো এক ভয়ংকর বিচারকের সামনে দাঁড়িয়ে রায় শোনার অপেক্ষায় আছে সে। তালহা কয়েক মুহূর্ত পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে রইল। মেহনূরের মুখে এমন শর্ত শুনে তার চোয়াল শক্ত হয়ে এল।

"অসম্ভব!"

মেহনূরের বুকটা দুরুদুরু কাঁপছে।  তালহার সেই কঠোর "অসম্ভব" শব্দটা শুনে তার মনে হলো পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। সে জানে না এই পাগলাটে লোকটা এখন কী করে বসবে। ভয়ে ভয়ে মাথাটা আরও নিচু করে, কাঁপা কাঁপা গলায় মেহনূর বলল,

"তা...তাহলে আমাকে দয়া করে ভুলে যান। আমাকে আমার মতো বাঁচতে দিন। আমি তো তেমন আহামরি সুন্দর কেউ নই যে আপনি এক দেখাতেই পাগল হয়ে যাবেন। আমাকে এভাবে আর ট্রমা দেবেন না, আল্লাহর ওয়াস্তে বলছি! আমি জীবনে একটু সুকূন  চাই। পৃথিবীতে সুন্দরী মেয়ের তো কোনো অভাব নেই, আর আপনার মতো ক্ষমতাধর মানুষের জন্য পাত্রীরও তো অভাব পড়বে না।"

মেহনূরের এইভাবে বারবার রিজেক্ট করা তালহার পুরুষালি অহংকারে তীরের মতো বিঁধল। অপমানে আর রাগে তার চোয়াল শক্ত হয়ে এল। সে এক ঝটকায় গাড়ির লক খুলে দিয়ে বলল, "আউট!"

মেহনূর হঠাৎ এমন আচরণে থতমত খেয়ে গেল। ভয়ে তার কথা আটকে এল, সে পাথরের মতো নির্জীব হয়ে বসে রইল। তালহা এবার গর্জন করে বলল, "গেট আউট !"

ভয়ে মেহনূর আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। হন্তদন্ত হয়ে দরজা খুলে  দৌড়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল। পেছনে ফিরে তাকানোর সাহসটুকুও তার নেই।
তালহা রাগে অন্ধ হয়ে স্টিয়ারিং হুইলে সজোরে এক ঘুসি মারল। দাঁতে দাঁত চিপে সে বিড়বিড় করল,

"আমার সুকূনের কী হবে? তালহা মীর্জা কারো কথায় চলে না, নিজের ইচ্ছায় চলে। আমাকে দিয়ে ওসব হুজুগে পরিবর্তন কস্মিনকালেও হবে না। কিন্তু বিয়ে আমি তোমাকেই করব হার্টবিট, অন্য কোনো অপশন নাই। খুব শীঘ্রই তোমার অহংকার ও জেদ আমার অন্ধকার রাজত্বে বন্দি করব।"

সে মুহূর্তেই গাড়ি ঘুরিয়ে তীব্র গতিতে বেরিয়ে গেল।

জনাব রফিক উদ্দীনের জ্যেষ্ঠপুত্র রিফাত উদ্দীন, আপনি কি রোহিত মীর্জার কন্যা ফারহানা মীর্জাকে ১ কোটি ১ টাকা দেনমোহরে স্ত্রী হিসেবে কবুল করে নিতে রাজি আছেন?”

রিফাত ধীরস্থিরভাবে ফারহানার দিকে তাকাল। লাল বেনারসির ঘোমটার আড়ালে ফারহানা তখন লজ্জায় আড়ষ্ট, মেহেন্দী রাঙা আঙুলগুলো দিয়ে শাড়ির আঁচলটা নিংড়াচ্ছে সে। রিফাতের বুকের ভেতরটা এক অজানা আবেশে কেঁপে উঠল। সে অত্যন্ত গম্ভীর  স্বরে তিনবার উচ্চারণ করল, “কবুল!”

চারপাশে  ‘আলহামদুলিল্লাহ’র গুঞ্জন আর আতরের সুবাস ছড়িয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ পর  পর্দার আড়াল থেকে ভেসে এল ফারহানার সেই কাঙ্ক্ষিত সলজ্জ সম্মতি।  তালহা  স্টেজ থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে বোনটির দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। ফারহানা ও রিফাতকে একে অপরের মুখোমুখি করা হলো।  রিফাত অতি সাবধানে, কাঁপাকাঁপা হাতে ফারহানার মুখের উপর রেশমি সূক্ষ্ম উড়নাটা আলতো করে সরিয়ে দিল। উড়না  সরতেই ভোরের শিশিরভেজা গোলাপের মতো ফারহানার মুখখানি ভেসে উঠল। রিফাত  তার সেই কাজলনয়না সলজ্জ চোখের দিকে গভীর তৃষ্ণা নিয়ে তাকাল, ফারহানা লাজুক হাসিতে চোখ নামিয়ে নিল। সেই ক্ষণিক দৃষ্টি বিনিময়ে যেন সহস্র বছরের না বলা কথাগুলো বিনিময় হয়ে গেল।

ফারহানার বিদায় বেলা ঘনিয়ে আসতেই মীর্জা ভিলার সদর ফটকে এক ভারী হাহাকার  নেমে এলো। ফারহানা একে একে তার প্রিয়জনদের কাছ থেকে বিদায় নিল। প্রথমে  তারা দাদাজান আদিল মীর্জার পা ছুঁয়ে সালাম করল। বৃদ্ধ আদিল মীর্জা কাঁপাকাঁপা হাতে নাতনির ও নাত জামাইয়ের মাথায় হাত রেখে অস্ফুট স্বরে দোয়া করলেন, তাঁর চোখ ফেটে জল গড়িয়ে পড়ছে। এরপর বাবা রোহিত মীর্জা আর চাচা রায়হান তাদের বুকে জড়িয়ে ধরলেন। রোহিত সাহেব মেয়ের কপালে চুমু খেয়ে ধরা গলায় বললেন,

"সাবধানে থাকিস মা, এই বাড়িটা আজ থেকে বড্ড ফাঁকা হয়ে যাবে।"

ফুপা-ফুপির দোয়া আর ভাই-বোনদের সাথে খুনসুটিমাখা বিদায় শেষে ফারহানা এসে দাঁড়াল তার বড় ভাই তালহার সামনে। তালহা এতক্ষণ একপাশে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে ছিল। ফারহানা ভয়ে ভয়ে তালহার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। এই ভাইটাকে সে যতটা ভয় পাই তারচেয়ে বেশি  ভালোবাসে। কিন্তু কোনেদিন  ভলোবাসাটা প্রকাশ করা হয়নি।

ফারহানা নিচু স্বরে বলল, "ভাইয়া, আসছি।"

তালহা এক মুহূর্তের জন্য ফারহানার  দিকে তাকাল।  তার আদরের ছোট বোনটি, যাকে সে ভালোবেসে 'রোজ' বলে ডাকে, সে আজ কত বড় হয়ে গেল! সে পকেট থেকে হাত বের করে ফারহানার মাথায় পরম আদরে হাত রেখে  ইস্পাতকঠিন গলায় বলল,

"রোজ! মনে রাখিস তুই মীর্জা বাড়ির মেয়ে। কোনোদিন নিজের চোখের জল ফেলবিনা। আর যদি কখনো কেউ তোর অসম্মান করার সাহস দেখায়, তবে মনে রাখিস তোর সাথে তোর এই ভাই তালহা মীর্জা আছে। আমার রোজের ওপর কেউ যদি সামান্য আঁচড়ও কাটে, তবে তালহা মীর্জা তার জান নিয়ে নিতে দ্বিধা করবে না।"

ফারহানা শিউরে উঠল। ভাইয়ের এই সাইকো প্রোটেক্টিভ রূপটা তার চেনা, কিন্তু বিদায়বেলায় এমন ভয়ংকর প্রতিশ্রুতি যেন তার শিরদাঁড়া দিয়ে হিমেল স্রোত বইয়ে দিল। এভাবেও কি কেউ নিজের বোনকে বিদায় দেয়?তালহা এবার ফারহানার হাতটা আলতো করে ধরে রিফাতের হাতে তুলে দিল। রিফাতের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে অত্যন্ত হুঁশিয়ারি স্বরে বলল,

"মনে রেখো রিফাত, তালহা মীর্জা আজ তার রোজকে তোমার হাতে তুলে দিচ্ছে। বড্ড যত্নে রাখবে আমার রোজকে। যেন কখনও ওর চোখের জল না পড়ে, কখনও যেন ও মনে কষ্ট না পায়।"

রিফাত তালহার দিকে তাকিয়ে এক ঢোক গিলল। গলার ভেতরটা মরুভূমির মতো শুকিয়ে গেছে তার। সে কাঁপা গলায় কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, "ইনশাআল্লাহ ভাইয়া। আমার বউকে আমি চিরকাল রানী করেই রাখব।"

তালহা আর কোনো কথা বাড়াল না। বোনের কপালে আলতো করে একটা চুমু দিয়ে সে ধীরপায়ে সরে দাঁড়াল।  সে চায় না তার কোনো দুর্বলতা কেউ দেখতে পাক। গাড়িতে ওঠার আগে ফারহানা শেষবার তার এই রগচটা পাগলাটে ভাইটার দিকে তাকাল। তালহা তখনো নির্লিপ্তভাবে দূরে দিগন্তের দিকে তাকিয়ে আছে।

চলবে!

Comments

    Please login to post comment. Login