Posts

উপন্যাস

অন্দরবাসিনী পর্ব ৫

August 3, 2026

Saima Jannat Mawa

6
View

অন্দরবাসিনী 
#পর্ব ৫
# Saima_Jannat_Mawa

সময়ের অমোঘ নিয়মে ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে আজ থার্টি-ফাস্ট নাইট। সারা বিশ্বের মতো এদেশের বুকেও নেমে এসেছে এক উন্মাতাল উন্মাদনা। তারুণ্যের রক্তে আজ এক অদ্ভুত নেশা এবং  সীমাহীন উচ্ছৃঙ্খলতা। নাইট-শ্যাডো হোটেল। নামীদামি আর আভিজাত্যে ঘেরা এই হোটেলটি আজ এক ভিন্ন জগতের রূপ নিয়েছে। চারিদিকে নিয়ন আলোর খেলা, দামী পারফিউম আর মদের উৎকট গন্ধে বাতাস ভারি হয়ে আছে। ঘড়ির কাঁটা তখন রাত ১২টার ঘর ছুঁইছুঁই। হোটেলের বিশাল বলরুমে ডিজে গানের কানফাটানো তালের সাথে যুবক-যুবতীরা নাচছে। তাদের শরীরী হিল্লোলে কোনো রাখঢাক নেই। যুবতীদের পরনে এমন সব সংক্ষিপ্ত আর আঁটসাঁট পোশাক, যা নির্লজ্জতাকে উসকে দিচ্ছে। শরীরের প্রতিটি ভাঁজ সেখানে কামনার হাতছানি দিচ্ছে। আলোর ঝিলিক আর উচ্চশব্দের সংগীতে নীতি-নৈতিকতা যেন আজ এক অন্ধকার গহ্বরে হারিয়ে গেছে। এই উন্মত্ত ভিড়ের মাঝে সাইনাকেও দেখা যাচ্ছে। সেও জীবনে প্রথমবারের মতোই তার বন্ধুদের সাথে এই উশৃঙ্খল পার্টিতে গা ভাসিয়েছে। তার চোখেমুখে এক ধরণের মেকি উল্লাস, হাতে ধরা ক্রিস্টাল গ্লাসের রঙিন পানীয়টি  নাচের তালে তালে থরথর করে কাঁপছে। ডিজে পার্টির উন্মাদনা যখন তুঙ্গে, তখন সামির মাইক হাতে নিয়ে ঘোষণা করল,

"হ্যালো ফ্রেন্ডস! হ্যাপি নিউ ইয়ার। সবার জন্য পার্সোনাল রুম বুক করা আছে। তোমরা তোমাদের পার্টনারদের নিয়ে দুই ঘণ্টা একান্তে সময় কাটাতে পারবে। তারপর আমরা সবাই বাড়ির পথ ধরব।"

সামিরের ঘোষণায় পুরো হলে ছেলেদের উল্লাস আর শিসধ্বনি ছড়িয়ে পড়ল। নেশার ঘোরে টলমল পায়ে সবাই নিজ নিজ সঙ্গিনীকে নিয়ে বরাদ্দকৃত কক্ষের দিকে এগিয়ে গেল। এদিকে সাইনা আজ জীবনের প্রথমবার কড়া নেশা করায় তার মাথা ভীষণভাবে চক্কর দিচ্ছে। সোজা হয়ে দাঁড়ানোর শক্তিটুকুও যেন হারিয়ে ফেলেছে সে। ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যেতে নিতেই আশিক তাকে শক্ত করে ধরে ফেলল।

"চলো জান, তুমি তো ঠিকমতো দাঁড়াতেই পারছো না,"

সাইনা আধোবোজা চোখে অস্ফুট স্বরে প্রশ্ন করল, "কোথা-য় যাব?"

"রুমে। হাতে বেশি সময় নেই। বছরের প্রথম দিনেই আজ তোমার ভালোবাসার পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল। মনে নাই।"
সাইনা ভ্রু কুঁচকে জড়ানো গলায় বলল, "কেন? পরীক্ষা দিছিনা! তুমি বলেছিলে এই আঁটোসাঁটো পোশাকটা পড়ে আসতে আমি বাধ্য  মেয়ের মতো পড়েছি। পার্টিতে আসতে বলেছো এসেছি।  নেশা করতে বলেছিলে,  জীবনে প্রথমবারের মতো তাও করেছি। তুমি জানো বাবা জানলে আমাকে ত্যাজ্য করবে! আর কি কোনো পরীক্ষা বাকি আছে? "

আশিকের গলায় এবার এক আদিম কামনার সুর,

"আরে ভালোবাসার পরীক্ষা! আজ তুমি তোমার সতিত্ব দিয়ে প্রমাণ করবে আমায় কতটা ভালোবাসো।"

আশিকের এই কুৎসিত প্রস্তাবে সাইনার নেশা যেন মুহূর্তেই কিছুটা কেটে গেল। সে তীব্র ঘৃণায় চিৎকার করে উঠল, "শাট আপ আশিক! তোমার থেকে আমি এটা আশা করিনি। তুমি কি আমাকে অন্য মেয়েদের মতো সস্তা ভাবছো? আর ইউ ক্রেজি!"

অপমানে আশিকের মুখটা হিংস্র হয়ে উঠল। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

"তার মানে আমার ধারণাই সত্যি! তুমি আমার সাথে অভিনয় করছো। ভালোবাসা থাকলে তুমি আজ না করতে না।"

"ছাড়ো আমাকে! আমি বাড়ি যাব," বলে সাইনা এক হেঁচকা টানে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল।
কিন্তু আশিক তাকে ছাড়ল না। অপমানে অন্ধ হয়ে সে জোরপূর্বক সাইনাকে টেনেহিঁচড়ে করিডোর দিয়ে রুমের দিকে নিয়ে যেতে লাগল। নেশার ঘোরে অবশ শরীর নিয়ে সাইনা কিছুতেই আশিকের পৈশাচিক শক্তির সাথে পেরে উঠছিল না। করিডোরের মাঝপথে পৌঁছাতেই হঠাৎ পুরো হোটেল জুড়ে সাইরেন বেজে উঠল। রেড অ্যালার্ট! মুহূর্তের মধ্যে চারপাশ পুলিশের বাঁশির শব্দ আর বুটের আওয়াজে প্রকম্পিত হয়ে উঠল। হোটেলের প্রতিটি প্রবেশপথ পুলিশ ঘিরে ফেলেছে। আতঙ্কে যে যেদিকে পারল পালানোর চেষ্টা করল। নিজের বিপদ বুঝে আশিক এক মুহূর্তও দেরি না করে অর্ধচেতন সাইনাকে করিডোরের ঠান্ডা ফ্লোরে ছুড়ে ফেলে অন্ধকারের সুযোগে গা ঢাকা দিল।কিছুক্ষণ পর পুলিশ করিডোর থেকে আধো-অচেতন অবস্থায় সাইনাকে উদ্ধার করে গ্রেপ্তার করল। হোটেলের প্রতিটি রুমে তল্লাশি চালিয়ে আরও অনেককে আপত্তিকর অবস্থায় আটক করা হলো।

পরদিন সকাল এগারোটা। তালহা তার  অফিসে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে রাজনৈতিক উচ্চপর্যায়ের একটি মিটিং পরিচালনা করছে। পিনপতন নিস্তব্ধতায় কেবল তার গম্ভীর কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে তার ফোনটি সশব্দে বেজে উঠল। স্ক্রিনে ফুপুর নাম দেখে সে এক পলক বিরক্তি নিয়ে তাকাল। তারপর কলটি কেটে ফোন সাইলেন্ট করে পুনরায় আলোচনায় মনোযোগ দিল। মিটিংয়ের শেষ পর্যায়ে তালহা উপস্থিত সবার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি হেনে  গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

“আশা করি বিষয়টি আপনারা পরিষ্কার বুঝতে পেরেছেন। এখন থেকে কাজটা নিখুঁতভাবে হওয়া চাই। মনে রাখবেন, তালহা মীর্জার নির্দেশ অমান্য করলে কিংবা কোনো ষড়যন্ত্রের গন্ধ পেলে আমার চেয়ে খারাপ আর কেউ হবে না। এখন আপনারা আসতে পারেন।”

উপস্থিত রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ মাথা নিচু করে নিঃশব্দে কামরা ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। ঠিক তখনই তালহার ফোনটি আবারও বেজে উঠল। এবার বিরক্তি চরমে পৌঁছাল তার। রিসিভ করেই বেশ কর্কশ গলায় বলল,

“ফুপু, সাইনার গুণগান ছাড়া আর কিছু বলার থাকলে বলো। আমার হাতে একদম সময় নেই।”

কিন্তু ওপাশ থেকে ফুপুর বদলে ফুপার আতঙ্কিত কণ্ঠস্বর ভেসে আসতেই তালহার পুরো শরীর পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল। চোখমুখের পেশি কুঁচকে এল তার। এক মুহূর্ত স্তব্ধ থেকে সে চিৎকার করে উঠল,

“হোয়াট? কী বলছ তুমি!”

শায়লা খান তার আদুরে মেয়ে সাইনার এমন কলঙ্কজনক খবর সহ্য করতে পারেননি। সকাল থেকে এই পর্যন্ত দুইবার জ্ঞান হারিয়েছেন তিনি। তিনি রুমে  শুয়ে আছেন  মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। পাশে বসে মেহনূর মামির পা দুটো বালিশের ওপর একটু উঁচুতে তুলে দিল , যাতে মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক হয়।
বিড়বিড় করে দোয়া পড়তে পড়তে সে মামির হাতের তালু আর পায়ের তলায় হালকা মালিশ করতে লাগল। শায়লা খান  অসংলগ্নভাবে "সাইনা.... আমার নিষ্পাপ  মেয়ে " বলে ডুকরে কাঁদছেন। মেহনূর পরম মমতায় তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।  সে নিজেও অজস্র ভয় ও অজানা আশংকায় শিউরে উঠছে। হঠাৎ ড্রয়িং রুম থেকে সপাটে এক চড়ের শব্দ ভেসে এলো।  আহির খান রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে চিৎকার করে উঠলেন,

"অসভ্য মেয়ে! তোকে আমার মেয়ে বলতেই আজ ঘৃণা হচ্ছে। এসব দেখার আগে আমি মরে গেলেই পারতাম!"

মেহনূর দৌড়ে দরজার অল্প খুলে ড্রয়িংরুমে দৃষ্টি দিল। আহির খান তখন রাগে কাঁপছেন।  ড্রয়িং রুমের ডিভানে পায়ের ওপর পা তুলে আয়েশ করে বসে আছে তালহা। সে দুহাত ডিভানের ওপর ছড়িয়ে দিয়ে বাবা-মেয়ের এই চরম নাটকীয় মুহূর্তটি নিঃশব্দে উপভোগ করছে।  আহির খান যখন মেয়ের গালে সপাটে দ্বিতীয় চড়টি বসাতে গেলেন, সাইনা বিদ্যুৎবেগে তার বাবার হাত চেপে ধরল। ঘৃণা আর অবজ্ঞায় তার চোখমুখ কুঁচকে আছে। সে চিৎকার দিয়ে বলল,

"আমি আমার মায়ের মেয়ে! তুমি কোনোদিন আমাকে ভালোবাসোনি, কোনোদিন বোঝার চেষ্টাও করোনি। খবরদার! এরপর হাত তুললে ভুলে আমার হাতও উঠে যেতে পারে। এখন আমার সামনে বড় 'বাবা' সাজার চেষ্টা করবে না। আমাকে শাসন করার কোনো অধিকার তোমার নেই! তোমার চোখের মণি মেহনূর আছে না? তাকে গিয়ে শাসন করো। যত্তসব!"

কথাগুলো বিষের মতো ঢেলে দিয়ে সে একবার তালহার দিকে তাকালো। অতঃপর  সে ঝড়ের বেগে নিজের রুমে চলে গেল। আহির খান যেন পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলেন। অপমানে আর তীব্র মানসিক যন্ত্রণায় তাঁর নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। তিনি দুই হাতে বুক চেপে ধরে ধপাস করে ডিভানে বসে পড়লেন। তাঁর শরীরটা থরথর করে কাঁপছে।  তালহা এবার ধীরপায়ে ডিভান ছেড়ে ফুপার পায়ের কাছে ফ্লোরে বসে পড়ল। তার ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত রহস্যময় আর বাঁকা হাসি। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ফুপার চোখের দিকে তাকিয়ে সে শীতল কণ্ঠে বলল,

“এই বেয়াদব সাইনাকে তোমরা আমার ঘাড়ে তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা করছিলে? যে মেয়ের ডজন ডজন বয়ফ্রেন্ড, যে উশৃঙ্খল আর মদ্যপ এমন মেয়ে তালহা মীর্জার অর্ধাঙ্গিনী হওয়ার ন্যূনতম যোগ্যতাও রাখে না।”

আহির খান তখনও নিশ্চুপ। তাঁর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে, ঠোঁট দুটো কাঁপছে কিন্তু কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। মেয়ের এই কুৎসিত রূপ দেখার পর তাঁর সব আশা আর স্বপ্ন যেন এক নিমিষেই ধুলোয় মিশে গেছে। তালহা যখন তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে উঠে চলে যেতে চাইল, তখন আহির খান ক্ষীণ স্বরে তাকে ডাক দিলেন। তালহা থামল এবং পিছু ফিরে আবার তাঁর সামনে এসে দাঁড়াল। আহির খান অত্যন্ত অসহায়ভাবে বললেন,

“শোনো তালহা, এই ঘটনাটি যেন একদম গোপন থাকে। আমার মেয়ের আর কোনো অসম্মান আমি সহ্য করতে পারব না। জানাজানি হলে আমি মুখ দেখাতে পারব না।”

তালহা এক চিলতে ফিকে হেসে উত্তর দিল, “আপনি এখনও এই অবাধ্য মেয়ের সম্মানের কথা চিন্তা করছেন ফুপা? আশ্চর্যের বিষয়!”

আহির খান অপমানে আর লজ্জায় মাথাটা নত করে ফেললেন। তাঁর চোখের কোণে জল চিকচিক করছে। তালহা আর এক মুহূর্তও সেখানে না দাঁড়িয়ে গটগট করে সদর দরজা পেরিয়ে বাইরে চলে গেল।

কিন্তু তালহা চলে যাওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আহির খানের অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে উঠল। তাঁর বাম হাতটা হঠাৎ অবশ হয়ে গেল এবং বুকের সেই তীব্র যন্ত্রণা চোয়ালের দিকে ছড়িয়ে পড়ল। তিনি হাপাচ্ছেন, কপালে বিন্দু বিন্দু ঠান্ডা ঘাম জমেছে।
মেহনূর পর্দার আড়াল থেকে সবটা দেখে আর স্থির থাকতে পারল না। সে  তড়িঘড়ি করে হিজাব-নিকাব পরে নিয়ে ড্রয়িং রুমে ছুটে এল। এসে দেখল তালহা ততক্ষণে আবার ফিরে এসেছে,  ফোনটা ফেলে গিয়েছিল। মেহনূর আতঙ্কিত কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল, "ভাইয়া! চাচার অবস্থা ভালো না, ওনাকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে!"
তালহা কোনো কথা না বলে ক্ষিপ্রতার সাথে আহির খানকে পাঁজাকোলা করে  তুলে নিল। মেহনূরও দিশেহারা হয়ে তাদের পিছু নিল।

চলবে!

Comments

    Please login to post comment. Login