Posts

গল্প

ধৈর্যের পরীক্ষা

August 5, 2026

Nijhum Akter

7
View

চুয়াডাঙ্গার এক বিস্তীর্ণ বিলে বাস করত এক জোড়া মাগুর মাছ। স্বামীর নাম মাগুর, আর স্ত্রীর নাম মাগরানী। ভোরের নরম আলো, শাপলার পাতা, কচুরিপানার ফাঁক আর স্বচ্ছ পানির ঢেউ—সব মিলিয়ে সেই বিলই ছিল তাদের ছোট্ট পৃথিবী। সুখ-দুঃখ, হাসি-আনন্দ ভাগ করে নিয়ে তারা দিন কাটাত।

একদিন খবর এল, গঙ্গার পাড়ে বিশাল এক মাহফিলের আয়োজন হয়েছে। মাগুরের মন ছুটে গেল সেখানে।

সে বলল,
— মাগরানী, আজ আমি মাহফিলে যাব।

মাগরানীও সঙ্গে যেতে চাইল। কিন্তু পথের ঝুঁকির কথা ভেবে মাগুর তাকে সঙ্গে নিতে রাজি হলো না। মাগরানী কিছুক্ষণ অভিমান করলেও শেষে নীরবে সরে দাঁড়াল।

পরদিন ভোরে মাগুর ফিরে এলো। তার চোখে যেন অন্যরকম প্রশান্তি।

মাগরানী আগ্রহভরে জিজ্ঞেস করল,
— কী শুনে এলে?

মাগুর মৃদু হেসে বলল,
— অনেক কিছু শুনেছি। সব মনে নেই। তবে একটি বাক্য আমার হৃদয়ে চিরদিনের মতো গেঁথে গেছে—

"ইন্নাল্লাহা মা'আস-সাবিরীন।"

— এর অর্থ?

নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।

সেদিন থেকে কথাটি শুধু একটি বাক্য রইল না; হয়ে উঠল মাগুরের জীবনের শক্তি।

যখনই কোনো বিপদ আসত, কোনো দুশ্চিন্তা ঘিরে ধরত, কিংবা কোনো ভয় সামনে এসে দাঁড়াত, সে শান্ত কণ্ঠে বলত—

"ইন্নাল্লাহা মা'আস-সাবিরীন।"

প্রথমে মাগরানী মুগ্ধ হয়ে শুনত। কিন্তু একই কথা বারবার শুনতে শুনতে তার মনে বিরক্তি জন্ম নিল।

এরই মধ্যে চৈত্র মাস এল। সূর্যের তাপে একে একে আশপাশের সব বিল শুকিয়ে যেতে লাগল। পানির পরিমাণ কমতে কমতে একসময় তাদের নিজের বিলও প্রায় শূন্য হয়ে গেল।

মাগরানী উদ্বিগ্ন হয়ে বলল,

— এখন আমরা কী করব?

মাগুর আগের মতোই শান্ত স্বরে বলল,

ইন্নাল্লাহা মা'আস-সাবিরীন।

তারা অনেক কষ্টে পাশের একটি জলাভূমিতে গিয়ে আশ্রয় নিল। কিন্তু সেখানেও নিরাপত্তা ছিল না।

একদিন দুপুরে আকাশ থেকে একটি ক্ষুধার্ত চিল তাদের দেখতে পেল। মুহূর্তের মধ্যে সে দুই পায়ে মাগুর ও মাগরানীকে তুলে নিয়ে আকাশে উড়ে গেল।

মাটির পৃথিবী ক্রমে ছোট হতে লাগল।

মাগরানীর বুক কেঁপে উঠল।

সে কাঁপা গলায় বলল,

— এবারও কি তোমার সেই একই কথা?

মাগুরের কণ্ঠে কোনো ভয় ছিল না।

সে শুধু বলল,

ইন্নাল্লাহা মা'আস-সাবিরীন।

মাগরানী হতাশ হয়ে বলল,

— মৃত্যুর মুখেও তোমার ধৈর্য ফুরায় না!

ঠিক তখনই দূর আকাশ থেকে আরেকটি চিল এসে প্রথম চিলটির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। শুরু হলো ভয়ংকর লড়াই। দুই চিলের ধস্তাধস্তিতে হঠাৎ মাগুর ও মাগরানী ছিটকে নিচের বিশাল সাগরে পড়ে গেল।

পানিতে পড়েই তারা বুঝল—তারা বেঁচে গেছে।

অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর মাগরানী ধীরে ধীরে স্বামীর দিকে তাকাল। তার চোখে আর বিরক্তি নেই; আছে বিস্ময়, কৃতজ্ঞতা আর উপলব্ধি।

সে মৃদু হেসে বলল,

— আজ বুঝলাম, ধৈর্য মানে শুধু অপেক্ষা নয়। ধৈর্য মানে আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর ভরসা রাখা। আমরা যখন সব আশা হারিয়ে ফেলেছিলাম, তখনই তিনি আমাদের জন্য এমন পথ খুলে দিলেন, যা আমরা কল্পনাও করতে পারিনি।

মাগুর আকাশের দিকে তাকিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল,

ইন্নাল্লাহা মা'আস-সাবিরীন।

সাগরের বিশাল জলে সূর্যের আলো ঝিলমিল করছিল। নতুন সেই জলরাশিতে শুরু হলো তাদের নতুন জীবন।

সেদিন থেকে মাগরানীও শিখে গেল—ঝড় যত বড়ই হোক, ধৈর্য হারানো যাবে না। কারণ কখন, কোথা থেকে আল্লাহর রহমত এসে পৌঁছাবে, তা কেউ জানে না।

সমাপ্ত।

Comments

    Please login to post comment. Login