প্রথম অধ্যায়: ভোরের আলো
রাতের শেষ প্রহর। আকাশে তখনও সূর্যের কোনো আভাস নেই। গ্রামের সরু কাঁচা পথ জুড়ে হালকা কুয়াশা নেমে এসেছে। দূরে মসজিদ থেকে ফজরের আজান ভেসে আসতেই ছোট্ট টিনের ঘরের দরজা আস্তে করে খুলে গেল।
মাথায় পুরোনো ওড়না, হাতে একটি অ্যালুমিনিয়ামের বালতি। নিঃশব্দে বাইরে বেরিয়ে এলেন হালিমা বেগম। উঠোনের এক কোণে রাখা কলসি ভরে তিনি রান্নার প্রস্তুতি নিতে লাগলেন। চুলার আগুন জ্বালাতে জ্বালাতে তাঁর চোখ বারবার চলে যাচ্ছিল ঘরের ভেতরের দিকে।
সেখানে একটি পুরোনো খাটে গভীর ঘুমে ডুবে আছে তাঁর একমাত্র ছেলে রিফাত।
ঘুমন্ত ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে হালিমা বেগমের ঠোঁটে অদ্ভুত এক হাসি ফুটে উঠল। সেই হাসির আড়ালে ছিল অসংখ্য দুঃখ, হাজারো অপূর্ণ স্বপ্ন।
ধীরে ধীরে তিনি ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে ফিসফিস করে বললেন,
"আর একটু ঘুমা বাবা। তোর ঘুম ভাঙার আগেই আমি কাজ থেকে ফিরে আসব।"
রিফাত কিছুই শুনল না। সারাদিনের পড়াশোনা আর রাতের টিউশন শেষে ক্লান্ত শরীর গভীর ঘুমে ডুবে ছিল।
হালিমা বেগম দরজায় তালা না লাগিয়েই বেরিয়ে গেলেন। এই গ্রামে চুরি করার মতো কিছুই তাদের ঘরে নেই।
একসময় এই সংসারে হাসি ছিল। রিফাতের বাবা আবদুল করিম দিনমজুর হলেও প্রতিদিন কাজ শেষে ছেলের জন্য কিছু না কিছু নিয়ে ফিরতেন। কখনো একটি কমলা, কখনো দুটো বিস্কুট।
কিন্তু পাঁচ বছর আগে এক নির্মাণস্থলে দুর্ঘটনায় তিনি মারা যান।
সেদিন থেকেই সংসারের সব দায়িত্ব এসে পড়ে হালিমা বেগমের কাঁধে।
মানুষের বাড়িতে থালা-বাসন ধোয়া, কাপড় কাচা, রান্নার কাজ—যে কাজই পান, সেটাই করেন। তবু কখনো ছেলেকে পড়াশোনা ছেড়ে কাজ করতে বলেননি।
তাঁর একটাই কথা ছিল,
"গরিব হওয়া লজ্জার না বাবা। অশিক্ষিত হয়ে বেঁচে থাকাটাই লজ্জার।"
রিফাত সেই কথাগুলো বুকের ভেতর পাথরের মতো গেঁথে রেখেছিল।
সে জানত, তার মায়ের হাতে যে কড়া পড়েছে, সেই কড়ার প্রতিটি দাগ তার ভবিষ্যতের জন্য।
একদিন সে মানুষ হবেই।
আর সেদিন তার মাকে আর কোনো দিন মানুষের বাড়িতে কাজ করতে হবে না।
কিন্তু জীবন যে মানুষকে কত কঠিন পরীক্ষার সামনে দাঁড় করায়, তা তখনও রিফাত জানত না।
সামনের দিনগুলো তার জন্য শুধু অভাব নয়, এমন এক সিদ্ধান্ত নিয়ে অপেক্ষা করছিল, যা তার পুরো জীবন বদলে দেবে।
5
View