রেললাইনের ওপারে
রাতের শেষ ট্রেনটি প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে চলে যেতেই চারদিকে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এল। কিছুক্ষণ আগেও যে স্টেশন মানুষের কোলাহলে মুখর ছিল, এখন সেখানে শুধু বাতাসের শব্দ আর রেললাইনের গা বেয়ে জমে থাকা শিশিরের ঝিলিক। দূরে একটি কুকুর গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে আছে। স্টেশনের পুরোনো বেঞ্চটিতে আধশোয়া এক বৃদ্ধ আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তার মাথার ওপরে আকাশ আছে, কিন্তু মাথা গোঁজার মতো কোনো ঘর নেই।
ঠিক তখনই প্ল্যাটফর্মের এক কোণে ছোট্ট ছেলেটি উঠে বসল। নাম তার রুবেল। বয়স দশ কি এগারো। পুরোনো একটি ছেঁড়া কম্বলই তার বিছানা। ভোর হওয়ার আগেই তাকে বের হতে হবে। ট্রেন থামলে যাত্রীরা যে বোতল, কাগজ আর খাবারের প্যাকেট ফেলে যায়, সেগুলোই তার দিনের উপার্জন।
রুবেলের কাছে ট্রেনের হুইসেল মানে নতুন সকাল, আর নতুন সকাল মানেই বেঁচে থাকার আরেকটি সুযোগ। ক্ষুধা তার নিত্যসঙ্গী, তবু সে স্বপ্ন দেখে। একদিন সেও স্কুলের পোশাক পরে বই হাতে হাঁটবে। রেললাইনের ওপারে যে স্কুলটি দেখা যায়, তার ঘণ্টাধ্বনি শুনে প্রতিদিন বুকের ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে।
প্ল্যাটফর্মের অন্য পাশে চায়ের দোকান সাজাচ্ছেন সালেহা বেগম। ভোরের কুয়াশা ভেদ করে কেটলির ধোঁয়া আকাশে মিশে যায়। প্রতিটি কাপ চা বিক্রি মানে সংসারের হাঁড়িতে একটু ভাত। স্বামী অসুস্থ, দুই সন্তান ছোট। ক্লান্তি তাকে হারাতে পারেনি, কারণ মায়ের হৃদয়ে পরাজয় বলে কোনো শব্দ নেই।
স্টেশনের কুলি রহিমের কাঁধে শুধু যাত্রীদের লাগেজ নয়, জমে আছে সংসারের শত দুঃখ। সারাদিন ভারী বোঝা টেনে বেড়ালেও রাতে বাড়ি ফিরতে হয় খালি পকেটে। তবু অসুস্থ মায়ের ওষুধ কেনার আশা সে ছাড়ে না।
দিনের পর দিন, বছরের পর বছর স্টেশন একই রকম থাকে। বদলে যায় শুধু ট্রেনের নম্বর, যাত্রীদের মুখ আর ঋতুর রং। কিন্তু প্ল্যাটফর্মের মানুষগুলোর জীবন যেন সময়ের বাইরে আটকে আছে। তারা প্রতিদিন মানুষকে গন্তব্যে পৌঁছে দেয়, অথচ নিজেরাই কোনো গন্তব্য খুঁজে পায় না।
একদিন বিকেলে এক ছোট্ট মেয়ে রুবেলকে জিজ্ঞেস করেছিল, — "তুমি কি কখনো ট্রেনে চড়েছ?"
রুবেল মৃদু হেসে রেললাইনের দিকে তাকিয়েছিল।
— "না। আমি শুধু মানুষকে যেতে দেখি। আমার জন্য কোনো ট্রেন থামে না।"
মেয়েটি আর কিছু বলতে পারেনি। তার হাতে থাকা বিস্কুটের প্যাকেটটি রুবেলের দিকে বাড়িয়ে দিয়েছিল। রুবেল বিস্কুটের চেয়েও বেশি যত্ন করে আগলে রেখেছিল সেই হাসিটুকু। কারণ অনেক দিন পর কেউ তাকে করুণা নয়, মানুষ হিসেবে দেখেছিল।
রাত আবার নেমে আসে। শেষ ট্রেনটি ধীরে ধীরে অন্ধকারে মিলিয়ে যায়। প্ল্যাটফর্মে পড়ে থাকে কয়েকটি ছেঁড়া টিকিট, কিছু শুকনো পাতা আর একদল মানুষের অসমাপ্ত স্বপ্ন।
রেলস্টেশন শুধু ট্রেনের আসা-যাওয়ার গল্প নয়। এটি এমন এক পৃথিবী, যেখানে প্রতিটি হুইসেলের সঙ্গে জন্ম নেয় নতুন আশা, আর প্রতিটি বিদায়ের সঙ্গে হারিয়ে যায় অগণিত অপূর্ণ স্বপ্ন। এখানে বেঁচে থাকা মানেই সংগ্রাম, আর সংগ্রাম মানেই আগামী দিনের জন্য নীরব এক প্রতিজ্ঞা।