গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিল একটি পরিত্যক্ত বাড়ি। সবাই তাকে ডাকত "অন্ধকার বাড়ি"। দিনের বেলাতেও বাড়িটির দিকে কেউ তাকাতে চাইত না। লোকমুখে প্রচলিত ছিল, রাত বারোটার পর বাড়ির ভেতর থেকে কারও কান্নার শব্দ শোনা যায়, আর মাঝে মাঝে একটি কালো ছায়া জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে।
অর্ণব ছিল সাহসী এবং কৌতূহলী এক তরুণ। ভূতের গল্পে সে বিশ্বাস করত না। একদিন বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে গিয়ে সে বলল, "সবই মানুষের বানানো গল্প। আমি আজ রাতেই ওই বাড়িতে যাব।"
বন্ধুরা অনেক নিষেধ করল, কিন্তু অর্ণব সিদ্ধান্ত বদলাল না।
রাত ঠিক বারোটায় একটি টর্চ, একটি ক্যামেরা এবং একটি নোটবুক নিয়ে সে অন্ধকার বাড়ির সামনে পৌঁছাল। চারদিকে নিস্তব্ধতা। বাতাসে পুরোনো কাঠের গন্ধ। দরজাটি আধখোলা ছিল।
ভেতরে ঢুকতেই দরজাটি নিজে থেকেই ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল।
অর্ণব থমকে দাঁড়াল। সে নিজেকে বোঝাল, "হয়তো বাতাসের কারণে হয়েছে।"
টর্চের আলোয় ধুলো জমা আসবাবপত্র দেখা যাচ্ছিল। দেয়ালে ঝুলছিল একটি বিশাল ঘড়ি, অথচ আশ্চর্যের বিষয়—ঘড়িটি বন্ধ থাকা সত্ত্বেও টিক... টিক... শব্দ হচ্ছিল।
সে শব্দ অনুসরণ করতে করতে একটি পুরোনো লাইব্রেরিতে পৌঁছাল। সেখানে একটি ডায়েরি পড়ে ছিল। ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা—
"যে এই ডায়েরি পড়বে, সে যেন শেষ দরজাটি না খোলে।"
অর্ণব মুচকি হেসে ডায়েরি ব্যাগে রাখল।
ঠিক তখনই উপরের তলা থেকে কারও হাঁটার শব্দ ভেসে এল।
ধুপ... ধুপ... ধুপ...
সে ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠল।
ওপরে গিয়ে দেখল, লম্বা করিডোরের শেষে একটি মাত্র দরজা। দরজার গায়ে অদ্ভুত সব চিহ্ন আঁকা। দরজার নিচ দিয়ে যেন ঠান্ডা কুয়াশা বেরিয়ে আসছে।
হঠাৎ তার পেছন থেকে খুব আস্তে একটি কণ্ঠস্বর ভেসে এল—
"দরজাটা খুলো না..."
অর্ণব ঘুরে দাঁড়াল। কেউ নেই।
তার বুকের ভেতর ধুকপুক শুরু হলো। কিন্তু কৌতূহল তাকে থামাতে পারল না।
সে দরজার হাতলে হাত রাখতেই পুরো বাড়িটি কেঁপে উঠল।
দরজাটি ধীরে ধীরে খুলে গেল।
ভেতরে কোনো আসবাব ছিল না। শুধু মাঝখানে একটি কাঠের বাক্স।
বাক্সের ওপর লেখা—
"সত্য জানার মূল্য দিতে হয়।"
অর্ণব বাক্সটি খুলল।
ভেতরে ছিল একটি পুরোনো রুপার চাবি এবং একটি চিঠি।
চিঠিতে লেখা—
"এই বাড়ির মালিক ছিলেন জমিদার রুদ্রপ্রসাদ। তাঁর একমাত্র মেয়ে নন্দিনী এক রাতে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়। সবাই ভেবেছিল সে মারা গেছে। কিন্তু সত্যি হলো, তাকে এই বাড়ির গোপন কক্ষে বন্দি রাখা হয়েছিল সম্পদের লোভে। কেউ তাকে উদ্ধার করতে পারেনি। তার আত্মা আজও মুক্তি পায়নি।"
চিঠি পড়া শেষ হতেই ঘরের তাপমাত্রা হঠাৎ কমে গেল।
অর্ণব অনুভব করল, কেউ যেন তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে।
ধীরে ধীরে ঘুরতেই সে দেখল সাদা পোশাক পরা এক তরুণী।
তার মুখ ফ্যাকাশে, চোখে অদ্ভুত বিষণ্নতা।
সে শান্ত কণ্ঠে বলল, "আমার সত্যিটা সবাইকে জানাও। তাহলেই আমি মুক্তি পাব।"
কথা শেষ হতেই সে মিলিয়ে গেল।
অর্ণব দ্রুত নিচে নেমে বেরিয়ে আসতে চাইল। কিন্তু বাড়ির দরজা খুলছিল না।
চারদিকে ফিসফিস শব্দ—
"সত্য... সত্য... সত্য..."
হঠাৎ তার মনে পড়ল রুপার চাবির কথা।
সে বাড়ির প্রধান দরজার পাশে একটি ছোট তালা দেখতে পেল, যা আগে তার চোখে পড়েনি।
চাবিটি লাগাতেই দরজা খুলে গেল।
সে প্রাণপণে বাইরে বেরিয়ে এল।
পরদিন সকালে অর্ণব গ্রামের প্রবীণদের সব ঘটনা জানাল। প্রথমে কেউ বিশ্বাস করেনি। কিন্তু বাড়ির ভেতরে গিয়ে তারা সত্যিই একটি গোপন কক্ষ আবিষ্কার করল।
সেখানে বহু বছরের পুরোনো মানুষের কঙ্কাল পাওয়া গেল।
তদন্তে জানা গেল, সেটিই ছিল নন্দিনীর দেহাবশেষ।
গ্রামের মানুষ যথাযথ ধর্মীয় রীতিতে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করল।
এরপর থেকে অন্ধকার বাড়ি থেকে আর কোনো কান্নার শব্দ শোনা গেল না।
সবাই ভাবল রহস্যের সমাপ্তি হয়েছে।
কিন্তু এক সপ্তাহ পরে অর্ণব ডায়েরিটি আবার খুলল।
শেষ পাতায় নতুন করে একটি বাক্য লেখা দেখা গেল—
"তুমি আমাকে মুক্তি দিয়েছ... কিন্তু বাড়িতে আমি একা ছিলাম না।"
অর্ণবের হাত কাঁপতে লাগল।
সে ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
তার ঘরের জানালার বাইরে অন্ধকারে দুটি জ্বলজ্বলে চোখ স্থির হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
আর ঠিক তখনই ঘরের ভেতরের ঘড়িটি, যেটি বহু বছর ধরে নষ্ট ছিল, হঠাৎ টিক... টিক... টিক... করে চলতে শুরু করল।
এরপর কী ঘটেছিল, তা আর কেউ কোনোদিন জানতে পারেনি।
6
View