দ্বিতীয় অধ্যায়: অভাবের দিনগুলো
ভোরের আলো ফুটতেই রিফাতের ঘুম ভাঙল। ঘরের এক কোণে রাখা অ্যালার্ম ঘড়িটা অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। সে উঠে চারদিকে তাকাল। ছোট্ট টিনের ঘরে এক অদ্ভুত নীরবতা।
মা তখনও ফেরেননি।
চুলার ওপর ঢাকনা দেওয়া একটি পাতিলে ভাত রাখা। পাশে আলুভর্তা আর একটি ছোট কাগজ।
কাঁপা হাতে লেখা—
“খেয়ে স্কুলে যাস। আমার জন্য অপেক্ষা করিস না। দুপুরে কাজ বেশি।”
রিফাত কাগজটা ভাঁজ করে বুকপকেটে রেখে দিল। মায়ের লেখা এমন ছোট ছোট চিরকুট সে কখনো ফেলে দিত না।
স্কুলে যাওয়ার পথে গ্রামের মোড়ে কয়েকজন সমবয়সী ছেলে দাঁড়িয়ে ছিল। নতুন ব্যাগ, নতুন জুতা আর হাসিতে ভরা মুখ।
তাদের একজন রিফাতের ছেঁড়া জুতার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল,
“এই জুতা পরে আবার মানুষ হওয়ার স্বপ্ন দেখে!”
আরেকজন যোগ করল,
“গরিবের ছেলেরা এত স্বপ্ন দেখলে শেষে কষ্টই বেশি পায়।”
রিফাত কোনো উত্তর দিল না। মাথা নিচু করে হাঁটতে লাগল। অপমানের জবাব সে কথায় নয়, নিজের ভবিষ্যৎ দিয়ে দিতে চেয়েছিল।
স্কুলে সেদিন পরীক্ষার ফল প্রকাশ হলো।
রিফাত আবারও প্রথম।
শ্রেণিকক্ষ করতালিতে ভরে উঠল। শিক্ষক তার মাথায় হাত রেখে বললেন,
“মনে রাখিস, টাকার অভাব মানুষকে ছোট করে না। স্বপ্নের অভাব মানুষকে ছোট করে।”
এই কথাগুলো রিফাতের হৃদয়ে গভীরভাবে গেঁথে গেল।
বিকেলে স্কুল ছুটি হলে সে সোজা বাড়ি ফিরল না। বাজারের একটি ছোট চায়ের দোকানে কয়েক ঘণ্টা কাজ করত। গ্লাস ধোয়া, টেবিল পরিষ্কার করা, চা পৌঁছে দেওয়া—এসব কাজের বিনিময়ে সামান্য কিছু টাকা পেত।
দোকানের মালিক মানুষটা ভালো ছিলেন। মাঝে মাঝে এক কাপ চা আর দুটি বিস্কুট এগিয়ে দিয়ে বলতেন,
“খেয়ে নে বাবা। খালি পেটে কাজ করলে শরীর টিকবে না।”
রিফাত মুচকি হেসে বিস্কুট দুটি কাগজে মুড়ে ব্যাগে রেখে দিত।
রাতে বাড়ি ফিরে সে বিস্কুট দুটো মায়ের হাতে দিয়ে বলত,
“মা, দোকান থেকে দিয়েছে। তুমি খাও।”
হালিমা বেগম জানতেন, ছেলে নিজে না খেয়ে তার জন্য নিয়ে আসে। তবু কিছু বলতেন না।
শুধু মনে মনে দোয়া করতেন—
“হে আল্লাহ, আমার ছেলের কষ্টগুলো আমার জীবনে লিখে দাও। ওর জীবনে আর কষ্ট রেখো না।”
সেই রাতেই হালিমা বেগম হিসাবের পুরোনো খাতাটা খুললেন।
ভর্তি ফি, বই কেনা, পরীক্ষার খরচ...
সব মিলিয়ে যে টাকার দরকার, তা দেখে তাঁর হাত কেঁপে উঠল।
ঘরের চারদিকে তাকিয়ে তিনি বুঝলেন, বিক্রি করার মতো আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।
শুধু কাঠের পুরোনো সিন্দুকের ভেতর যত্ন করে ভাঁজ করে রাখা আছে একটি শাড়ি...
যে শাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতি।
সেই শাড়ির দিকে তাকিয়ে হালিমা বেগমের চোখ ভিজে উঠল। তিনি ধীরে ধীরে সিন্দুকের ঢাকনা বন্ধ করে দিলেন।
কিন্তু তাঁর মনে তখন একটি কঠিন সিদ্ধান্ত জন্ম নিতে শুরু করেছে।
7
View