Posts

গল্প

মায়ের শেষ শাড়ি

August 6, 2026

Nijhum Akter

6
View

তৃতীয় অধ্যায়: শেষ সম্বল
সেদিন রাতটা অন্য সব রাতের মতো ছিল না।
টিনের চালের ওপর টুপটাপ বৃষ্টির শব্দ পড়ছিল। মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলকানিতে ছোট্ট ঘরটা আলোকিত হয়ে আবার অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছিল।
রিফাত বই খুলে পড়ছিল। কিন্তু বারবার তার চোখ চলে যাচ্ছিল মায়ের দিকে।
হালিমা বেগম আজ অস্বাভাবিক চুপচাপ।
রাতের খাবার বলতে ছিল সামান্য ভাত আর লবণ-মরিচ দিয়ে মাখানো আলু। তিনি বারবার বলছিলেন,
"আমার ক্ষুধা নেই বাবা। তুই খেয়ে নে।"
রিফাত জানত, মায়ের ক্ষুধা নেই—এ কথা সত্যি নয়।
সে নিজের থালা থেকে অর্ধেক ভাত মায়ের থালায় তুলে দিল।
হালিমা বেগম একটু হেসে বললেন,
"তুই না খেলে পড়াশোনা করবি কী করে?"
রিফাত মৃদু স্বরে উত্তর দিল,
"তুমি না খেলে আমি মানুষ হব কী করে?"
এক মুহূর্তের জন্য দু'জনেই নীরব হয়ে গেল।
বাইরে বৃষ্টি আরও জোরে নামতে লাগল।
রাত গভীর হলে রিফাত ঘুমিয়ে পড়ল।
কিন্তু হালিমা বেগমের চোখে ঘুম এলো না।
ধীরে ধীরে তিনি কাঠের পুরোনো সিন্দুকটা টেনে বের করলেন।
সিন্দুকের ভেতরে খুব যত্ন করে রাখা ছিল একটি লাল রঙের শাড়ি।
বহু বছরের পুরোনো হলেও কাপড়ে এখনো যত্নের ছাপ স্পষ্ট।
শাড়িটা বুকে জড়িয়ে তিনি অনেকক্ষণ বসে রইলেন।
হঠাৎ যেন অতীত ফিরে এল।
বিয়ের দিন...
লজ্জায় মাথা নিচু করে বসে আছেন তিনি।
তখনই আবদুল করিম হাসিমুখে বলেছিলেন,
"আমার সামর্থ্য কম। দামি কিছু দিতে পারলাম না। কিন্তু কথা দিচ্ছি, সারাজীবন তোকে কাঁদতে দেব না।"
সেদিনের সেই কথাগুলো আজও তাঁর কানে বাজে।
অথচ মানুষটা কথা রাখতে চেয়েও পারেননি।
ভাগ্য তাকে খুব তাড়াতাড়ি কেড়ে নিয়েছে।
হালিমা বেগম শাড়িটা বুকে চেপে ধরে ফিসফিস করে বললেন,
"দেখছো তো? তোমার ছেলেটা বড় হতে চাইছে। আমি আর কিছু রাখতে পারিনি। এই শাড়িটাও হয়তো কাল ছেড়ে দিতে হবে।"
কথা শেষ হওয়ার আগেই তাঁর চোখের জল শাড়ির ওপর গড়িয়ে পড়ল।
সকালের আলো ফুটতেই তিনি শাড়িটা একটি কাপড়ে মুড়ে নিলেন।
রিফাত তখনও ঘুমিয়ে।
ছেলের কপালে আলতো করে চুমু খেয়ে তিনি বেরিয়ে গেলেন।
আজ তিনি মানুষের বাড়িতে কাজ করতে যাচ্ছেন না।
আজ তিনি যাচ্ছেন নিজের জীবনের সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতিটা বিক্রি করতে।
আর সেই সময়, ঘুম ভেঙে রিফাতের মনে অকারণ এক অস্থিরতা জন্ম নিল।
সে তখনও জানত না, কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তার জীবন চিরদিনের জন্য বদলে যেতে চলেছে।

Comments

    Please login to post comment. Login