চতুর্থ অধ্যায়: সত্যের মুখোমুখি
সকালের সূর্য তখন পুরোপুরি উঠেনি। গ্রামের কাঁচা রাস্তায় শিশিরভেজা বাতাস বইছে। হালিমা বেগম আঁচলের ভাঁজে কাপড়ে মোড়ানো লাল শাড়িটা শক্ত করে চেপে ধরে বাজারের দিকে হাঁটছিলেন। প্রতিটি পদক্ষেপ যেন তাঁর বুকের ভেতর থেকে কিছু একটা ছিঁড়ে নিচ্ছিল।
এদিকে ঘুম ভাঙতেই রিফাত মাকে বাড়িতে না দেখে অবাক হয়ে গেল। এত সকালে মা কখনো না বলে বের হন না। তার মনে গত রাতের সেই অদ্ভুত নীরবতার কথা ফিরে এল। ঘরের এক কোণে রাখা পুরোনো সিন্দুকটার ঢাকনা আধখোলা দেখে সে এগিয়ে গেল।
সিন্দুকের ভেতরটা ফাঁকা।
লাল শাড়িটা নেই।
মুহূর্তের মধ্যেই সব বুঝে ফেলল রিফাত। তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। সে খালি পায়ে দৌড়ে বেরিয়ে পড়ল।
বাজারের এক পুরোনো কাপড়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন হালিমা বেগম। কাঁপা হাতে তিনি শাড়িটা দোকানদারের দিকে বাড়িয়ে দিলেন।
— "বাবা, যতটুকু পারো দিও। আমার ছেলের পরীক্ষার ফি জমা দিতে হবে।"
দোকানদার শাড়িটা উল্টেপাল্টে দেখে দাম বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই—
— "মা...!"
রিফাতের কাঁপা কণ্ঠে চারপাশ যেন থমকে গেল।
হালিমা বেগম ঘুরে দাঁড়ালেন। ছেলেকে দেখে তাঁর মুখের রঙ বদলে গেল।
রিফাত ছুটে এসে মায়ের হাত থেকে শাড়িটা নিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরল।
চোখ ভেজা কণ্ঠে সে বলল,
— "এই শাড়ি শুধু কাপড় নয়, এটা বাবার শেষ স্মৃতি। আমার পড়াশোনার জন্য তোমার ভালোবাসা বিক্রি হতে দেব না।"
হালিমা বেগম আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। তিনি ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়লেন।
সেই দৃশ্য দেখে আশেপাশের মানুষ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল। কেউ কথা বলল না। কিন্তু সবার চোখেই একই প্রশ্ন—একজন মা সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য আর কতটা ত্যাগ করতে পারে?
2
View