পঞ্চম অধ্যায়: অচেনা মানুষের হাত
বাজারে তখন ছোট্ট একটা ভিড় জমে গেছে। রিফাত আর হালিমা বেগম একে অপরকে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দুজনের চোখেই জল।
ঠিক সেই সময় ভিড়ের মধ্য থেকে এক ভদ্রলোক এগিয়ে এলেন। তাঁর বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। সাদা পাঞ্জাবি, চোখে কালো ফ্রেমের চশমা। তিনি কিছুক্ষণ নীরবে মা-ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
শান্ত কণ্ঠে বললেন,
— "মা, আপনার ছেলের নাম কী?"
হালিমা বেগম চোখ মুছে উত্তর দিলেন,
— "রিফাত।"
ভদ্রলোক রিফাতের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
— "তুমি কি পড়াশোনা করতে চাও?"
রিফাত দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
— "জি। অনেক বড় হতে চাই। তবে মায়ের চোখের জল বিক্রি করে নয়।"
কথাটা শুনে ভদ্রলোকের চোখ ভিজে উঠল। তিনি নিজের মানিব্যাগ থেকে কিছু টাকা বের করে হালিমা বেগমের দিকে বাড়িয়ে দিলেন।
হালিমা বেগম সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়লেন।
— "না বাবা, দান নেব না।"
ভদ্রলোক মৃদু হেসে বললেন,
— "এটা দান নয়। এটা একজন শিক্ষার্থীর প্রতি আমার বিশ্বাস। আজ আমি সাহায্য করছি, কাল আপনার ছেলে বড় হয়ে অন্য কারও পাশে দাঁড়াবে। তখন এই ঋণ শোধ হয়ে যাবে।"
রিফাত মায়ের দিকে তাকাল। হালিমা বেগমের চোখে দ্বিধা, লজ্জা আর আশার আলো একসঙ্গে ফুটে উঠেছে।
শেষ পর্যন্ত তিনি কাঁপা হাতে টাকাটা নিলেন। তাঁর ঠোঁট কাঁপছিল।
— "আল্লাহ আপনাকে ভালো রাখুন।"
ভদ্রলোক শুধু হাসলেন। তারপর চলে যাওয়ার আগে রিফাতের কাঁধে হাত রেখে বললেন,
— "একটা কথা মনে রেখো—অভাব কখনো লজ্জার নয়। লজ্জার হলো স্বপ্ন ছেড়ে দেওয়া।"
রিফাত মাথা নত করে প্রতিজ্ঞা করল, একদিন সে এমন মানুষ হবে, যে কারও স্বপ্ন ভেঙে যেতে দেবে না।
মা-ছেলে বাড়ির পথে হাঁটতে লাগল। তাদের হাতে ছিল না কোনো ধন-সম্পদ, কিন্তু হৃদয়ে জন্ম নিয়েছিল নতুন এক আশা—যে আশা হয়তো তাদের জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার পথটাকেও একদিন আলোকিত করবে।
3
View