প্রথম অধ্যায়: অচেনা ট্রেন
রাত তখন সাড়ে এগারোটা।
শহরের শেষ প্রান্তের ছোট্ট স্টেশনটায় আরিয়ান একা দাঁড়িয়ে ছিল। স্টেশনটির নাম নিশানপুর। দিনের বেলায় এখানে মানুষের ভিড় থাকে, চায়ের দোকানে কোলাহল হয়, ট্রেনের হুইসেল শোনা যায়। কিন্তু রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু যেন ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে যায়।
আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
স্টেশনের ঘড়িটা টিকটিক শব্দ করে এগিয়ে চলেছে। প্ল্যাটফর্মের কয়েকটি বাতি জ্বলছে, কয়েকটি আবার অনেক আগেই নষ্ট হয়ে গেছে। দূরে রেললাইনের ওপর কুয়াশা জমে আছে।
আরিয়ান বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিল।
তার বাড়ি স্টেশন থেকে খুব বেশি দূরে নয়। কিন্তু আজ তাকে স্টেশনে আসতে হয়েছিল তার মামার জন্য। মামা শহরের বাইরে থেকে আসার কথা ছিল রাত দশটার ট্রেনে। সেই ট্রেন অনেক আগেই চলে গেছে, কিন্তু মামার কোনো দেখা নেই।
মোবাইলে কল করার চেষ্টা করেও লাভ হয়নি।
“এই সময় ফোনটা বন্ধ কেন?” মনে মনে বলল আরিয়ান।
ঠিক তখনই—
দূর থেকে একটা শব্দ ভেসে এল।
ট্রেনের হুইসেল।
আরিয়ান চমকে উঠল।
সে দ্রুত রেললাইনের দিকে তাকাল।
কুয়াশার ভেতর একটা ক্ষীণ আলো দেখা যাচ্ছে।
আলোটা ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে।
আরিয়ানের বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো।
সে স্টেশনের সাইনবোর্ডের দিকে তাকাল। তারপর রেললাইনের দিকে।
এই লাইনে রাত সাড়ে এগারোটায় কোনো ট্রেন আসার কথা নয়।
স্টেশনের দেওয়ালে ঝোলানো সময়সূচিটাও সে বহুবার দেখেছে।
তাহলে ট্রেনটা আসছে কোথা থেকে?
কয়েক মুহূর্ত পর কালো ধোঁয়া ছেড়ে একটা পুরোনো ট্রেন প্ল্যাটফর্মে ঢুকল।
ট্রেনটা দেখে আরিয়ানের প্রথমেই মনে হলো—এটা যেন অন্য কোনো সময় থেকে চলে এসেছে।
বগিগুলোর রং বিবর্ণ। জানালাগুলো ধুলোয় ঢাকা। কোনো বগিতে আধুনিক LED আলো নেই। এমনকি ট্রেনের গায়ে থাকা নামটাও অর্ধেক মুছে গেছে।
আর সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার—
ট্রেনটা থামার পরও কোনো দরজা খুলল না।
আরিয়ান কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর স্টেশনের ছোট্ট ঘরের ভেতর থেকে স্টেশনমাস্টার বেরিয়ে এলেন।
বৃদ্ধ মানুষটি ট্রেনটার দিকে তাকিয়ে কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে থাকলেন।
তারপর খুব নিচু গলায় বললেন,
—তুমি এটা দেখতে পাচ্ছ?
আরিয়ান অবাক হয়ে বলল,
—জি। কেন?
বৃদ্ধের মুখের রং বদলে গেল।
—তাহলে আজ আবার ট্রেনটা এসেছে।
—কোন ট্রেন?
স্টেশনমাস্টার কোনো উত্তর দিলেন না।
তিনি ধীরে ধীরে ট্রেনটার দিকে এগিয়ে গেলেন। তারপর হঠাৎ থেমে আরিয়ানের দিকে ফিরে তাকালেন।
—তুমি এখান থেকে চলে যাও।
—কিন্তু কেন?
—এখনই।
বৃদ্ধের কণ্ঠে এমন একটা ভয় ছিল, যা আরিয়ান আগে কখনো শোনেনি।
সে আর কোনো প্রশ্ন করল না।
কিন্তু ঠিক তখনই ট্রেনের মাঝের একটি দরজা নিজে থেকেই খুলে গেল।
ভেতর থেকে হলুদ আলো প্ল্যাটফর্মে এসে পড়ল।
আর সেই আলোর নিচে দাঁড়িয়ে থাকা দরজার পাশে একটা কাগজ আটকে থাকতে দেখল আরিয়ান।
কৌতূহল সামলাতে না পেরে সে এগিয়ে গেল।
কাগজটা হাতে নিয়ে দেখল, সেখানে মাত্র একটি বাক্য লেখা—
“আরিয়ান, তুমি এত দেরি করলে কেন?”
তার হাত কেঁপে উঠল।
কারণ—
এই স্টেশনে তার নাম জানে এমন মানুষ খুব বেশি নেই।
আর সেই মুহূর্তে স্টেশনমাস্টার পিছন থেকে চিৎকার করে উঠলেন,
—কাগজটা ছুঁয়ো না!
কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।
আরিয়ান কাগজটা হাতে তুলে নিয়েছে।
আর ট্রেনের ভেতর থেকে তখন ধীরে ধীরে ভেসে আসছে কারও পায়ের শব্দ—
ঠক... ঠক... ঠক...
কেউ একজন তার দিকে এগিয়ে আসছে।
23
View