দ্বিতীয় অধ্যায়: রাত ১২টার স্টেশন
ঠক... ঠক... ঠক...
পায়ের শব্দটা আরও কাছে চলে এল।
আরিয়ান স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার হাতে তখনো সেই কাগজটা। কাগজের অক্ষরগুলো যেন চোখের সামনে কাঁপছিল।
স্টেশনমাস্টার দ্রুত এগিয়ে এসে তার হাত থেকে কাগজটা নিতে চাইলেন।
—এটা আমাকে দাও।
আরিয়ান হাত সরিয়ে নিল।
—আপনি জানেন, এখানে আমার নাম লেখা কেন?
বৃদ্ধ কিছু বললেন না।
—আপনি জানেন, তাই না?
স্টেশনমাস্টার এবার ধীরে ধীরে মাথা তুললেন।
—সব প্রশ্নের উত্তর এখন জানতে চেয়ো না।
—কিন্তু এটা আমার নাম! কে লিখেছে?
বৃদ্ধের চোখ চলে গেল ট্রেনের খোলা দরজার দিকে।
পায়ের শব্দটা তখন থেমে গেছে।
চারপাশে আবার নিস্তব্ধতা।
আরিয়ান সাহস করে ট্রেনের ভেতরে তাকাল।
প্রথমে কিছুই দেখা গেল না।
তারপর হঠাৎ—
একজন মানুষ দরজার কাছে এসে দাঁড়াল।
কালো কোট পরা একজন বৃদ্ধ।
তার মুখটা অন্ধকারে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না।
তিনি আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—তুমি অবশেষে এসেছ।
আরিয়ানের বুক ধক করে উঠল।
—আপনি আমাকে চেনেন?
লোকটি কোনো উত্তর দিলেন না। বরং পকেট থেকে একটি পুরোনো ঘড়ি বের করলেন।
ঘড়িটা দেখিয়ে বললেন,
—আর মাত্র পাঁচ মিনিট।
—কিসের পাঁচ মিনিট?
লোকটি এবার মৃদু হাসলেন।
—ট্রেন ছাড়ার।
আরিয়ান পিছনে তাকাল।
স্টেশনমাস্টার তখন ট্রেনের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর মুখে আগের চেয়েও বেশি আতঙ্ক।
আরিয়ান বলল,
—আমি এই ট্রেনে উঠব না।
লোকটি বললেন,
—তোমাকে উঠতেই হবে।
—কেন?
—কারণ তোমার বাবা যে কারণে বিশ বছর আগে এই ট্রেনে উঠেছিলেন, আজ তোমাকেও সেই কারণেই উঠতে হবে।
আরিয়ানের মুখ শুকিয়ে গেল।
—আমার বাবা?
লোকটি এবার আর কিছু বললেন না।
ট্রেনের ভেতরের আলো একবার নিভে গেল।
আবার জ্বলে উঠল।
কিন্তু লোকটি তখন আর সেখানে নেই।
আরিয়ান স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তার বাবা মারা গেছেন বহু বছর আগে। তাঁর সঙ্গে এই পুরোনো ট্রেনের সম্পর্ক থাকার কোনো কথাই সে কখনো শোনেনি।
পেছন থেকে স্টেশনমাস্টারের কণ্ঠ ভেসে এল—
—আরিয়ান...
সে ঘুরে তাকাল।
বৃদ্ধ ধীরে ধীরে বললেন,
—তোমার বাবার ব্যাপারে তোমাকে একটা কথা কখনো বলা হয়নি।
আরিয়ান চুপ করে রইল।
—বিশ বছর আগে, এই স্টেশন থেকেই তোমার বাবা শেষবারের মতো বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন।
—তারপর?
স্টেশনমাস্টার উত্তর দেওয়ার আগে দূরে স্টেশনের ঘড়িতে ঘণ্টা বাজল।
ঢং...
রাত ঠিক বারোটা।
সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো ট্রেনের দরজাগুলো একে একে বন্ধ হতে শুরু করল।
ঠাস!
স্টেশনমাস্টার চিৎকার করে বললেন—
—এখন সিদ্ধান্ত নাও, আরিয়ান। তুমি কি সত্যিটা জানতে চাও?
আরিয়ান ট্রেনের দিকে তাকাল।
তারপর নিজের হাতে থাকা সেই কাগজটার দিকে।
কাগজের নিচে এবার আরেকটি লাইন দেখা যাচ্ছে।
যেটা আগে সেখানে ছিল না।
“তোমার বাবার অপেক্ষা এখনো শেষ হয়নি।”
20
View