অভিনেতা হাসান মাসুদ মিডিয়ায় ফলাও করে ঘোষণা দিয়েছেন তিনি এখন ধার্মিক হয়ে গেছেন। এখন তিনি পুরোপুরি চেইঞ্জড, নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন। মক্কা-মদিনায় ৪১ দিন ছিলেন। হজ করেছেন। অ্যাজ এ মুসলিম তার এই ধর্মীয় কাজ নিয়ে আমাদের কোনো সংশয় বা সমালোচনা নেই। তবে তিনি নিজের কথায় নিজেই প্রমাণ করলেন জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান দীর্ঘ সময় বিশেষকরে যৌবনকাল তিনি অধার্মিক হিসেবে কাটিয়েছেন। এবং তিনি যে বলেছেন, এখন আর অভিনয় করেন না, ভালো হয়ে গেছেন। এই একটি কথার মাধ্যমে পৃথিবীর তাবৎ অভিনয় শিল্পীকে তিনি অমর্যাদা করেছেন -বুঝিয়ে দিয়েছেন অভিনেতারা সবাই সমাজের খারাপ মানুষ!
যিনি সত্যিকারের ধার্মিক হবেন, ঈশ্বরের আরাধনাকে ব্রত জ্ঞান করবেন -তিনি কখনোই জনসমক্ষে এসে সেটি জাহির করবেন না। ধর্ম পালন নীরব, নিভৃতি ও ঐকান্তিক বিষয়। রিয়া তথা অহংকার দেখানোটাই অধর্মের শামিল।
হাসান মাসুদের এই হঠাৎ পরিবর্তন দেখে তার একসময়ের সতীর্থ ও সহকর্মী অভিনেতা ফরহাদ লিমন নিজের সোশ্যাল হ্যান্ডেলে একটি লেখা লিখেছেন। লেখাটিতে একসময়ের এই জনপ্রিয় অভিনেতার বিরুদ্ধে সহকর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, শুটিংয়ে দীর্ঘ সময় অনুপস্থিত থাকা, জুনিয়র শিল্পীদের হেনস্তা করা, অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ, রাগের বশে সহকর্মীর দরজায় লাথি-ঘুষি মারা এবং নিজের ভুল ঢাকতে অন্যকে অপমান করার মতো একাধিক অভিযোগ ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। লেখকের দাবি, অতিরিক্ত গাঁজা সেবনের কারণেও তাঁর কাজ ও আচরণে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল এবং তাঁর এমন আচরণে বহু শিল্পী ও কলাকুশলী ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। একই সঙ্গে লেখক তাঁর অতীত আচরণের সমালোচনা করলেও বর্তমানে হজ পালন করে ধর্মীয় জীবনে পরিবর্তনের চেষ্টা করাকে ইতিবাচকভাবে দেখেছেন এবং মহান আল্লাহ যেন তাঁর হজ কবুল করেন -এই শুভকামনাও জানিয়েছেন।
কে কখন কীভাবে ধর্ম পালন করবে সেটি একান্তই তার ব্যাপার। কিন্তু আমার ধর্মপালনের মাধ্যমে যদি ভিন্নধর্মী কিংবা ভিন্ন মতাদর্শী মানুষ আমার দ্বারা অসম্মান বা অমর্যাদার শিকার হন -সেটি সর্বমানুষের সহাবস্থান ও সভ্যতার জন্যই বিরাট সমস্যা। তাহলে কী করতে হবে? ধর্মপালন হবে আমার একান্ত আচার ও সংস্কৃতির অংশ। যেখানে অন্যকে জানান দিয়ে তাদেরকে আলাদা মানুষ গণ্য করবার মধ্যে কোনো ভালো মানুষিতা নেই।
আমি বাড়ির বাইরে বের হলে দরজায় পা রেখেই আয়াতুল কুরসি পড়ি। আমার বড় কন্যাকে নিয়ে বের হলে ওই আয়াতটি দুইবার পড়ি। যাতে ওর ওপর ঐশ্বরিক আশীর্বাদ প্রযুক্ত হয়।
আমার এক বড় আপা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তিনি যখন বিদেশে পিএইচডি করছিলেন তখন আপার সাথে পরিচয়। তার পিএইচডি অভিসন্দর্ভে কিছু ডেটা সাপোর্টও দিয়েছিলাম। তিনি আমার লেখালেখির ভক্ত। আমাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, যেহেতু আমি র্যাডিক্যালিজম, বিগোট্রি ও ফ্যানাটিজমের বিরুদ্ধে লেখালেখি করি -তাই আমার হিডেন শত্রু ব্যাপক। এবং তাদের হাত থেকে রক্ষা পেতে আমি যেন বাড়ির বাইরে বের হওয়ার সময় আয়াতুল কুরসি পাঠ করি। ২০১৮ সালের এই পরামর্শ পাওয়ার পর আমি অদ্যাবধি সবসময় ওই পরামর্শটি মান্যতা দেই। আমি মনে করি এরমধ্য দিয়ে আমার ঐশ্বরিক যোগাযোগটা রক্ষিত হয়। আমি যে এই কাজটা করি -আমাকে কি আপনারা ধার্মিক বলবেন? দরকার নাই। আমার ব্যক্তিগত ধর্মাচার আমি জাহির করি না। আজ প্রসঙ্গক্রমে ব্যক্তিগত উপলব্ধির জায়গাটি উল্লেখ করলাম। কিন্তু আমি চাই সবাই আমাকে মানুষ বলে গণ্য করুক। একজন হার্ডকোর মুসলিম কিংবা কড়া হিন্দুও বিপদের সময় আমাকে সমানভাবে পাশে পাক।
কাজেই হাসান মাসুদ মন দিয়ে ধর্ম পালন করুন, অভিনয় ছেড়ে দিন -সেটা তার স্বাধীন ইচ্ছা। শুধু গণমাধ্যমে জানান দিয়ে কোনো একটি নির্দিষ্ট পেশাজীবী কিংবা ধর্মীয় গোষ্ঠীকে তিনি যদি তার তুল্যমূল্যে আন্ডারমাইন না করতেন তাহলেই হতো। মানুষ এককালে পাজি থাকবে -আরেককালে হাজি হয়ে উঠবে -এটাই তার ভবিতব্য, এটাই তার নিয়তি। কথায় বা আচরণে কাউকে যেনো আমরা এতটুকু খাটো না করি।
লেখক: সাংবাদিক
৯ আগস্ট ২০২৬