সকালে ঘুম থেকে উঠে নুূরুন্ নেছার মনে হলো বুকের চিন চিনে ব্যথা বেশ কমেছে।কাল দুপুরে ব্যথাটা ঝিরঝির করে দু হাতের কনুই পর্যন্ত ছড়িয়ে গলা অবধি উঠেছিলো।বড় মেয়ে ফোনে বলছিল,মা পাতারহাট গিয়ে ডাক্তার দেখান। আশা নিয়ে যাবে।নুরুন নেছা কানে নেননি।দেখি বেলা উঠলে মেয়েকে ফোন করতে হবে।রোজার দিন।ফজর নামাজ পড়ে হয়তো ঘুমাচ্ছে।
দরজা খোলার শব্দ। উত্তর ঘর থেকে আশা আসছে।রাতে অসুস্থ খালার পাশে ঘুমাতে চেয়েছে।নুরুন নেছা বাড়ন করেছে।ঘরে ওর ছয় মাসের ছোটো বাচ্চা।তাছাড়া মেয়েটা গতকাল থেকে অনেক সেবা যত্ন করেছে। আশা বলল,
“খালাম্মা এখন কেমন লাগছে।”
নুরুন নেছা আধাশোয়া থেকে বসে বললেন ,
“ব্যাথাটা কমছে।এখন একটু ভালো লাগছে।”
আশা আবার বলে,"কিছু খাবেন।চা করে দিমু।"
“চা পরে নিজে কইরা খাইমু।”
“তাইলে ইসুবগুলের ভুষি গুলে দেই।"
”আচ্ছা দে।"
আশা একটা কাঁচের গ্লাসে ভুষি গুলে দেয়।খেতে খেতে নুরুন নেছা বলতে থাকেন, ফ্রিজে ইলিশ মাছ আছে। আজ ইলিশ রানমু লতি দিয়া।বেশি ঝাল দেওন যাইবো না।বড় মেয়ে বেশি ঝাল দিছি শুনলে রাগ করব।
হ্যাঁ খালাম্মা,আপনার বেশি ঝাল খাওন ঠিক ওইবোনা।গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা বাড়বো।
আশা এবার বলে,খালাম্মা আমি তাইলে যাই?
“যা,আমি একটু ঘুমাই।যাওয়ার সময় সামনের দরজাডা টেনে যাইচ।”নুরুন নেছার শেষ কথা।
নুরুন নেছা বসা থেকে পা চৌকিতে তুলে শুয়ে পড়েন। শোবার সময় বোনদের মধ্যে সবার ছোট মেয়েটার দিকে তাকান।কোনো রকম মশারি টেনে গুটি শুটি করে শুয়ে আছে।প্রায় ই অসুস্থ থাকে।মাকে রান্না বান্না করে খাওয়াবে,সকালে উঠে একটু চা করবে। সেই সামর্থ নাই।এই বুড়ো বয়সে সকালে উঠে নিজের চা নিজে করে খেতে হয়।মেয়েকে ডাকলে মা উঠি উঠি করে এগারোটা বাজায়।বড় মেয়ে বলে মা ঢাকায় এসে মাস্ খানেক থেকে পায়ের চিকিৎসা করায়া যান।কিন্তু অসুস্থ ছোটো মেয়ের জন্য বাড়ী ছাড়তে পারেন না।
নুরুন নেছার ঘুম পাঁচ্ছে।বুকের বাঁ পাশে হালকা ব্যথা অনুভব করছেন।মেয়েকে একবার ডাকলেন- নাজু..।মেয়ে ঘুমের দুনিয়ায়।কোনো দিকে খেয়াল নেই।নুরুন নেছা ও টের পাঁচ্ছেন তার দুচোখ বুঝে আসছে।একটা ঘোরের মধ্যে চলে যাচ্ছেন। বুকের ব্যাথা তীব্র হচ্ছে।তবু ও ঘুমের ভেগাত ঘটাচ্ছে না। তার মৃত বড় ছেলে পিনুর কথা মনে পড়ছে। আফসোস হচ্ছে।মা বেঁচে অথচ ছেলে রোড এক্সিডেন্টে চলে গেল।রাস্তা পারাপার হচ্ছিল।একটা দ্রুত গতির ধানব বাস সব শেষ করে দিলো।নুরুন নেছা এই শোক বুকে পাথর বেঁধে বয়ে বেড়ান।কাউকে বুঝতে দেন না।এখন ঘুমের ঘোরে চেতন অবচেতন মনে তিনি ছেলেকে দেখতে পান।তার সামনে একটা অস্পষ্ট আলোর রেখা ভেসে আসছে। দবদবে সাদা মশারির ন্যায় স্বচ্ছ জালের মত কাপর ভেদ করে আলো আসছে।দুর থেকে হাত বাড়িয়ে ছেলে তাকে ডাকছে..
(চলবে)