বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির সেই কোণের টেবিলটা সবসময় মেঘলার প্রিয় ছিল। জানলা দিয়ে বিকেলের হালকা রোদ এসে পড়ত বইয়ের পাতায়। প্রতিদিন ঠিক বিকেল চারটেয় সেই টেবিলের উল্টো পাশে এসে বসত আবির। কোনোদিন তাদের মধ্যে খুব একটা কথা হয়নি, শুধু মাঝে মাঝে চোখাচোখি হলে একটা মৃদু হাসির বিনিময় হতো।
মেঘলা ছিল ভীষণ লাজুক, আর আবির ছিল কিছুটা গম্ভীর। মেঘলা লক্ষ্য করত, আবির যখনই পড়তে বসত, বইয়ের ফাঁক দিয়ে চুরি করে তাকে দেখত। দিনগুলো এভাবেই কাটছিল। মেঘলার মনে আবিরের জন্য একটা অজানা ভালো লাগা তৈরি হতে শুরু করেছিল, কিন্তু মুখে বলার সাহস ছিল না।
দেখতে দেখতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ দিন চলে এলো। মেঘলা সেদিন একটু তাড়াতাড়িই লাইব্রেরিতে এসেছিল। মনের ভেতর এক ধরণের শূন্যতা কাজ করছিল—আজকের পর হয়তো আবিরকে আর কখনোই দেখা হবে না। চারটে বেজে গেল, কিন্তু আবির এলো না। মেঘলা মন খারাপ করে তার ব্যাগ গুছিয়ে যখন টেবিল থেকে উঠতে যাবে, ঠিক তখনই লাইব্রেরিয়ান এসে তার হাতে একটি নীল রঙের খাম দিলেন।
লাইব্রেরিয়ান মুচকি হেসে বললেন, "একটা ছেলে এটা তোমার জন্য রেখে গেছে।"
মেঘলা কাঁপাকাঁপা হাতে খামটা খুলল। ভেতরে একটা সাদা কাগজে নিখুঁত হাতের লেখায় লেখা ছিল:
"গত এক বছর ধরে প্রতিদিন বিকেল চারটেয় লাইব্রেরিতে আসার একমাত্র কারণ কোনো বই পড়া ছিল না, বরং তোমাকে এক নজর দেখা ছিল। আজ আমাদের শেষ দিন, তাই আর নিজের অনুভূতিটা লুকিয়ে রাখতে পারলাম না। যদি তোমার মনের আকাশেও একই মেঘ জমে থাকে, তবে লাইব্রেরির বাইরে বকুল তলায় এসে দাঁড়াতে পারো। আমি অপেক্ষা করছি।
— আবির"
চিঠিটা পড়ে মেঘলার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। সে আর এক মুহূর্তও দেরি না করে দ্রুত পায়ে লাইব্রেরির বাইরে বকুল তলার দিকে ছুটে গেল। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা আবির যখন মেঘলাকে আসতে দেখল, তখন তার চোখেও ছিল এক অদ্ভুত স্বস্তি ও ভালোবাসার আলো।