রিমন মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী ছোট্ট শহর টেকনাফের নদীর ঘাটে দাঁড়িয়ে আছিল। সন্ধ্যা নেমে আসছে, নদী পারের বাতাসটা হুট করেই হিম হয়ে উঠল। প্রতিদিনের মতোই কাজ শেষে রিমনের বাড়ি ফেরার কথা, কিন্তু আজ তার পায়ের তলা যেন অন্য কোথাও যাওয়ার জন্য ছটফট করছে।
তার পুরানো পকেটে লাল সুতো দিয়ে বাঁধা একটা কাঠের চাবি ছিল। তিন বছর আগে বাজারের এক বৃদ্ধ ফেরিওয়ালা তাকে চাবিটা দিয়ে বলেছিল, "যখন মনে হবে নিজের পরিচিত শহরটা বড্ড একঘেয়ে লাগছে, নদীর ওপর নামা ঘন কুয়াশার দিকে তাকিয়ে চাবিটা হাতে নিও। তুমি এমন এক শহরে পৌঁছাবে, যা শুধু তোমার কল্পনায় ছিল।"
রিমন তখন বৃদ্ধের কথা হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু আজ হঠাৎ করেই শহরটার যান্ত্রিক গোলমাল তার সহ্য হচ্ছিল না। ঘাটে ঘন কুয়াশা জমতে শুরু করতেই সে পকেট থেকে কাঠের চাবিটা বের করল। নদীর জল ঘেঁষে এক অদ্ভুত সোনালি আলো জ্বলে উঠল, আর তার সামনে ভেসে উঠল বাঁশের তৈরি এক বিশাল অদ্ভুত ড্রেজার নোঙ্গর করা নৌকা—যার কোনো মাঝি নেই।
কৌতুহল সংবরণ করতে না পেরে রিমন নৌকায় উঠে বসল। মুহূর্তের মধ্যে নৌকাটি কুয়াশার নদী পেরিয়ে ভেসে চলল এক অপরিচিত ঘাটে। সেই শহরে আলো নেই, অথচ চারপাশ এক মায়াবী নীল আলোয় উজ্জ্বল। গাছগাছালির পাতাগুলো কাচের মতো স্বচ্ছ, আর বাতাসে ভাসছে অচেনা এক মিষ্টি সুবাস। শহরের নাম নাকি 'মেঘনগর'।
সেখানে প্রতিটি মানুষের কাছেই কাঠের তৈরি একটা করে অনন্য উপহার ছিল। শহরের বড় মেয়াদানি তাকে ডেকে বলল, "রিমন, এখানে শুধু তারাই আসতে পারে, যারা নিজের ক্লান্তির মাঝেও নতুন কোনো স্বপ্নের খোঁজে থাকে।"
পুরোটা রাত সেই আশ্চর্য শহরে কাটিয়ে যখন ভোর হলো, রিমন নিজেকে আবিষ্কার করল তার চেনা নদীর ঘাটের সেই বেঞ্চিতে। পকেটে হাত দিয়ে দেখল, লাল সুতোয় বাঁধা কাঠের চাবিটা আর নেই, তার বদলে রয়েছে একটি নীল রঙের কাচের মতো চকচকে পাতা।
রিমন বাড়ি ফেরার পথে বুঝতে পারল—যে অচেনা শহর তাকে শান্তি দিয়ে গেল, তা চিরকাল তার মনের ভেতর রয়ে যাবে। স্বপ্নের শহর অনেক দূরের কিছু নয়, মাঝে মাঝে শুধু দৃষ্টিভঙ্গিটাই বদলে নিতে হয়।