গল্প

অন্তিম যাত্রার গল্প

August 31, 2026

Rasel Rasel

14
View

অন্তিম যাত্রার গল্প

মোহাম্মদ রাসেল।


আকাশে পূর্ণ চাঁদ। বাড়িটার চারদিকে যেনো সাদা মেঘ গুলো চক্কর দিচ্ছে; পশ্চিম থেকে পূর্বে, আবার উত্তর দিক হয়ে পশ্চিমে। সেই সাথে কিছু তারা যেনো খসে পড়ছে দূর কোথাও, শুধু দেখা যাচ্ছে তারাটি মুসলেমের ছেলের মতো সাইকেলের টাইয়ার ঘুরাতে ঘুরাতে এক বো-দৌড় দিয়েছে সেই পুরান বাড়ির রাস্তা ধরে। যেই রাস্তার শেষ মাথায় ডান পাশে পারিবারিক গোরস্থান, বাম পাশে মক্তব ঘর। আবার কোনো তারা উত্তর দিকে ছুটে চলেছে জলিলের মেয়ে ফিরুজার মতো লাল ফিতায় বেনি করা চুল উড়িয়ে, হঠাৎ জঙ্গলের পথে ভয় নিয়ে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরার সময় যেমন করে টিপে টিপে পা ফেলে, ওর বুকের মধ্যে দপ দপ শব্দ হয়, ওর চোখ হীম হয়ে আসে যেমন, ঠিক তেমন শব্দ হচ্ছে শরাফদ্দির বুকের মধ্যে। আবার কোনো তারা দক্ষিণে যাচ্ছে শরিফ মাস্টরের মতো হোন্ডার ছুটিয়ে বেরিবাঁধের পথ ধরে। কিছু তারা ঠায় দাঁড়িয়ে আছে শরাফদ্দি বেপারির মতো এই বাড়িটাকে ঘিরে। বাড়ির চারপাশে মৃদু বাতাস, নাওয়ের পালের মতো বাতাসে গা হেলিয়ে কলাগাছের পাতাগুলো দোল খাচ্ছে এদিক ওদিক। শো শো শব্দ করে বাঁশির মতো সুর তুলেছে বাঁশ পাতা; এরমাঝে কিছু বাঁশ একে-অপরের সাথে গাঁ ঘষা দিয়ে বিকট শব্দ করে ভয় দেখায় অপর পাশের জীবকে। লেবু বাগান থেকে জোনাক পোকারা বেরিয়ে আসে শরাফদ্দির জানালার কাছে, ওরা মিটিমিট আলো জ্বালিয়ে যেনো পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে এসেছে। সুপারি বনের পাকা সুপারি বৃষ্টির মতো টুপটাপ করে পড়ার শব্দও আসে তাঁর কানে। ও দিকে নারিকেল গাছে হুতুম থেমে থেমে ডেকেই চলেছে, যেনো আজনা, অচেনা, অদেখা কেউ আসতে চলেছে এই বাড়িতে। দক্ষিণের গোয়াল ঘর থেকে আসছে গাভীর গুংরানির আর জাবর কাটার আওয়াজ। শরাফদ্দি খোলা জানালা হতে তাকিয়ে আছে দূর মাঠের দিকে; তার ঘরের ভিট থেকে নেমে চলে গেছে পুরোনো সেই খৈলসামারির বিল পর্যন্ত। এই বিলেই মধ্যরাতে মাছ শিকার করতে গিয়ে আজরের হাতে প্রাণ যায় তার বাবার। তার ঠিক দুই মাস পরে আপন পতির শোকে তার মাও চলে যান। পাশে শুয়ে থাকা পারুলের নিশ্বাস কানে লাগছে, তার ইচ্ছে করছে এখনি পারুলকে ডেকে তুলে দিতে। কিন্তু সে তা না করে একাই উঠে বসতে চায়। তাঁর ইচ্ছে করে, একটু বাইরে গিয়ে চাঁদের সাদা আলোয় গা ধুয়ে আসতে, পেটকা দাদার পুসকুনির মতো লাগছে আজকের জ্যোৎস্না: মন চাইছে এখনি সেই দিনের মতো কিছু সময় সাঁতার কাটতে, আগেভাগে চিরনিদ্রায় যাওয়া বাল্য বন্ধু হোসেনের মতো জোনাক পোকার সাথে কিছু পথ হেঁটে দূরে ঐ বড়ই গাছের নিচে গিয়ে বসে খোলা মাঠের সবুজ বাতাস নিতে ইচ্ছে করছে, গঙের চর ভাঙা দেখতে এখনি যাবার সময়; মানুষের চলাচল নেই, পাখপাখালি কলহ নেই, নিরবে নিশ্চুপ দেখা যাবে গাঙের পাড় ভাঙার বিরহ, মনের মাঝে এসে ঠাঁই নেবে চর হারানোর গান আর নদীর জলের নৃত্য। ইচ্ছে করছে, রাতের কাছে কিছু কিচ্ছা বলে যেতে, যেনো ফিরুজা রোজ শুনে শুনে ঘুমিয়ে পড়ে। এই সময়ের মধ্যে আরো অনেক কিছু বলতে চায় শরাফদ্দি। কিন্তু, তাঁর চোখ দুটি ছাড়া আর কেউ জেগে নেই। জেগে নেই হাত, জেগে নেই পা, জেগে নেই মুখ; ওরা আরো আগে থেকেই ঘুমিয়ে গেছে। অন্ধকার ঘরটার দিকে তাকিয়ে কাওকে দেখতে না পেয়ে আবার জানালা দিয়ে বাইরে তাকায় শরাফদ্দি। গত তিন মাস ধরে এই জানালাটাই তাকে সঙ্গ দিয়ে চলেছে। দিন রাত সবসময় খোলা  থাকে। হঠাৎ বাড়ির কুকুরটি ঘেউ ঘেউ শুরু করলো। তা শুনে পারুলের ঘুম ভাঙল। বালিশের পাশ থেকে টর্চ লাইট হাতে নিয়ে তিনি বিছানা ছেড়ে ওঠে ঘরের লাইট জ্বালাতে সুইচ দিলেন। কিন্তু তখন বিদ্যুৎ ছিল না। তিনি কুপি বাতি জ্বালিয়ে টেবিলের ওপরে রেখে শরাফদ্দির কাছে আসে। তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন। শরীর ধরের নাড়া দিলেন, শরাফদ্দি মাথা নাড়িয়ে সাড়া দিলেন। কুকুরটা ডেকেই চলেছে, মনে হচ্ছে চোর ডুকেছে বাড়িতে। অপরিচিত কেউ না আসলে এমন করে না কখনো। পারুল দরজা খুলো বাইরে গিয়ে টর্চ লাইট মারলো পথের দিকে। পাশের ঘর থেকে কলমুতের বউ বের হলো তার শাশুড়িকে ডাকতে ডাকতে। কুকুরটি ডাকতে ডাকতে শরাফদ্দির জানালার পাশে এসে দাঁড়াল। পারুল আর কলমুতের বউ দৌড়ে ঘরে আসলো। তাদের মনো হলো যেনো হীম শীতল বাতাস ঘরটা পূর্ণ হয়ে আছে। কলমুতকে ডাকা হলো। অল্প সময়ের মধ্যে বাড়ির সবাই শরাফদ্দির ঘরের মধ্যে জড়ো হয়ে গেল। কলমুত জানালা টা বন্ধ করে দিয়ে একটি কাঁথা দিয়ে শরাফদ্দির হাত পা ঢেকে দিল। বিলাপের সুরে ঘর পূর্ণ। এখন আর বাহিরের কোন সারাশব্দ নেই। বাহিরের সব কিছু যেনো কারো সাথে চলে গেছে ভিন্ন জগতে। ঘরের বিলাপ আস্তে আস্তে বাহিরে, বাহির হতে এই রাতের পথ ধরে পৌঁছে গেল পুরান বাড়িতে। ফিরুজার কাছে। মুসলেমের ছেলের কাছে। দূর ময়মসসিংহে থাকা শরিফ মাস্টারের কাছেও। পুরান বাড়ির শেষ রাস্তার ডান পাশের মাটির কাছেও পৌছাল বার্তা, নতুন মানুষের আগমন ঘটেছে। এদিকে ফজরের আজনের পড়ে, পুরান বাড়ির লতিফের ঘরে নতুন মানুষের আগমনের চিৎকারে.... ২২.০৮.২৬/ মৈসিং।
 

Comments

    Please login to post comment. Login