বিকেল ফুরিয়ে তখন গোধূলির আলো চারপাশটা সোনালী রঙে রাঙিয়ে দিয়েছে। রিমনের ইয়ামাহা আর১৫ বাইকটা যখন শহরের বাইপাস রোডের খোলা হাওয়ায় ছুটছিল, তখন পেছনের সিটে বসা ছোট আদনানের চোখে ছিল উপচে পড়া উল্লাস। আদনানের দুই হাত শক্ত করে রিমনের জ্যাকেট খামচে ধরে রেখেছিল।
"মামা, আরেকটু স্পিড বাড়াও না! মনে হচ্ছে একদম মেঘের ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছি!"—খুশিতে চেঁচিয়ে উঠল আট বছরের আদনান।
রিমন মৃদু হেসে বাইকের গতিটা একটু নিয়ন্ত্রণে রেখে বলল, "পাজিল ছেলে, এত স্পিড কিসের রে তোর? পড়ে গেলে তো নানুমনির কাছে আমাকেই বকা খেতে হবে!"
আদনান খিলখিল করে হেসে উঠল, "কখনোই না! আমার মামা তো বিশ্বের সেরা বাইকার, আমার কিচ্ছু হবে না।"
আদনানের কাছে তার এই রিমুন মামা মানেই এক অন্যরকম উত্তেজনা। মামার স্টাইলিশ লুক, হেলমেট আর এই বাইকটি—সবমিলিয়ে আদনানের ছোট্ট দুনিয়ার সবচেয়ে বড় হিরো হলো তার মামা। আজ ছুটির দিন থাকায় মামাকে একপ্রকার জোর করেই সে বাইক রাইডে নিয়ে এসেছে।
কিছুদূর যাওয়ার পর তারা একটা নিরিবিলি লেকের ধারের ফাঁকা জায়গায় এসে বাইক থামাল। চারপাশের পরিবেশটা তখন বড্ড মনোরম। পাখিদের ঘরে ফেরার কলকাকলি আর ঠান্ডা বাতাসে মন জুড়িয়ে যাওয়ার জোগাড়।
বাইক থেকে নেমে আদনান সোজা দৌড়ে লেকের পাড়ে চলে গেল। জলে তখন বিকেলের সূর্যের ছায়া ঝিকমিক করছে। রিমনও বাইকটি স্ট্যান্ড করে আদনানের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। পকেট থেকে ফোন বের করে একটা সুন্দর ছবি বন্দি করে ফেলল রিমন—যেখানে ব্যাকগ্রাউন্ডে সূর্যাস্ত আর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট আদনানের চোখে মুখে দুষ্টুমি মাখা হাসি।
কিছুক্ষণ লেকের পাড়ে হাটার পর রিমন আদনানকে একটা ভ্যানিলা আইসক্রিম কিনে দিল। আইসক্রিমে কামড় দিয়ে আদনান খুব গম্ভীর গলায় বলল, "মামা, আমি যখন বড় হব, তখন একদম তোমার মতো একটা বাইক কিনবো। আর জানো? তখন আমি তোমাকে পেছনে বসিয়ে পুরো শহর ঘুরিয়ে আনবো।"
ভাগ্নের কথা শুনে রিমনের বুকটা গর্ব ও ভালোবাসায় ভরে গেল। সে আদনানের মাথার চুলগুলোতে হাত বুলিয়ে স্নেহের সুরে বলল, "বেশ তো! আমি তোর পেছনে বসার অপেক্ষায় রইলাম। তবে তার আগে বড় হয়ে ভালো মানুষ হতে হবে এবং মনোযোগ দিয়ে পড়ালেখা করতে হবে, রাজি?"
আদনান তৎক্ষণাৎ তার ছোট্ট হাতটি বাড়িয়ে দিয়ে আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল, "একদম পাক্কা প্রমিজ, মামা!"
সন্ধ্যা নামার সাথে সাথেই তারা বাসার পথ ধরল। শহরের নিয়ন আলোর নিচে যখন বাইকটি ছুটছিল, তখন পেছনের সিটে বসে আদনান ক্লান্ত হয়ে আস্তে করে রিমনের পিঠে মাথা এলিয়ে দিল। রিমন বুঝতে পারল, জীবনের সাধারণ এই ছোট মুহূর্তগুলোই সবচেয়ে বেশি দামি।