''তাকে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই পাঠানো হয়েছিল - একবার পৃথিবী ঘুরে আসার জন্য। আমাদেরকে অতীতের কোন সময়ে নিয়ে যাওয়া হলে আমরা অস্বস্তি বোধ করবো, মানিয়ে নিতে কষ্ট হবে। তিনিও অস্বস্তি বোধ করতেন, মানিয়ে নিতে পারেননি অতীত সময়ের মানুষের সাথে। তিনি ভবিষ্যতের সন্তান, তাই তাঁর পুনর্জন্ম হবে একবার নয় বারবার - যতদিন না নিজের ইচ্ছেমতন কবিতা লিখে যাবেন, তাকে জীবিকা নিয়ে ভাবতে হবেনা।''
জীবনানন্দ সম্পর্কে আমার এই ধারণা শুনে ডাক্তারের তেমন কোন ভাবান্তর হলোনা। তিনি বললেন, 'কিন্তু বিজ্ঞানে পুনর্জন্ম বলে কিছু নেই, মানুষ একবারই জন্মে এবং একবারই মরে। তাহলে আপনি কেন এই একবিংশ শতাব্দীতে পুনর্জন্মে বিশ্বাস করছেন ?
তাঁর কথায় আমি হাসলাম, 'এটা আসলে.... বিজ্ঞানের বিষয় নয়।'
- তাহলে?
- প্রজ্ঞার।
- আপনি কারো পুনর্জন্ম দেখেছেন?
- হ্যা।
- মানে! কার?
- জীবনানন্দ দাশের।
আমার কথা শুনে তার চোখে মুখে কৌতুক খেলা করছে, 'পুনরায় জন্ম নেওয়া জীবনানন্দ কি এখনো বেঁচে আছেন?'
- হ্যা, বেঁচে আছেন।'
- কোথায় থাকেন তিনি?
- এখন আপনার সামনেই আছেন। আমিই পুনরায় জন্ম নেওয়া জীবনানন্দ দাশ।
তিনি এই কথা শুনে সরু চোখে তাকালেন। বুঝতে পারছিলাম না আমার কথা বিশ্বাস করেছেন কিনা। আমি তাকে জোর গলায় বললাম, 'আমিই জীবনানন্দ দাশ, যে ১৯৫৪ সালে কলকাতার ট্রামের নিচে পড়ে আত্মহত্যা করেছিলো। '
তিনি আমার দিকে ঝুকে আসলেন, ' আপনি বলছেন আত্মহত্যা, অথচ আমরা জানি দূর্ঘটনা। কোনটা সত্য? '
আমি উত্তেজিত হয়ে বললাম, 'দূর্ঘটনা কখনোই নয়। আত্মহত্যা অথবা বলতে পারেন হত্যা - আমাকে হত্যা করা হয়েছিলো। '
আমার কথায় তিনি চমকে না গিয়ে বরং চেয়ারে হেলান দিলেন আর বললেন, 'আপনাকে, মানে জীবনানন্দ দাশকে, ট্রামের লোকেরা দেখেছে একাকী ট্রাম লাইন ধরে ট্রামের দিকে এগিয়ে যেতে। তাই এটা দূর্ঘটনা হতে পারে, কিংবা আত্মহত্যা হতে পারে। কিন্তু কোন ভাবেই হত্যা নয়।'
আমি তার কথায় মৃদু হেসে বললাম, ' সাধারণ দৃষ্টিতে এটা দূর্ঘটনা কিংবা আত্মহত্যা বলে মনে হতে পারে। কিন্তু একটু ভেবে দেখুন, কাউকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করা কি... হত্যা নয়? রবি ঠাকুর আমাকে কোন উৎসাহ দিলেন না, সজনী কান্ত তাঁর 'শনিবারের চিঠি'তে আমার কবিতার বিরুদ্ধে বিষ উগ্রে দিতে থাকলেন। আমার স্ত্রী লাবন্য আমাকে ভালো না বেসে, উৎসাহ না দিয়ে, কেবল অবহেলাই করে গেল। একজন কেবল কবি হতে চেয়েছিলো আর কিছু নয়। তাকে তার কবিতা নিয়ে অনবরত বিদ্রুপ করে যাওয়া কি আত্মহত্যা করতে প্ররোচিত করা নয়। আর এটা কি হত্যার শামিল নয়?' আমি কিছুটা উত্তেজিত হয়ে গেলাম।
হয়তো আমাকে শান্ত করার জন্য তিনি বললেন,' আপনি ভালো বলেছেন। পৃথিবীর ইতিহাসে ট্রামের নিচে পড়ে মৃত্যুর ঘটনা একটাই, সেটা আপনার, মানে জীবনানন্দ দাশের। এটা কখনোই দূর্ঘটনা হতে পারে না।'
তার কথায় আমি শান্ত হলাম, 'ধন্যবাদ। আপনাকেই দেখলাম আমার কথা এতো মনোযোগ দিয়ে শুনতে, বিশ্বাস করতে - আমার স্ত্রী পর্যন্ত বিশ্বাস করতে চায় না, ভয় পায়। ভাবে আমি পাগল হয়ে গেছি। এই দেখুন আপনার কাছে নিয়ে এসেছে। আপনিতো মানসিক রোগীর চিকিৎসা করেন। তা বেশ ভালো হয়েছে। আমার কথা গুলো আপনি শুনেছেন, বুঝেছেন এতেই আমি খুশি।'
- কবে থেকে বুঝতে পারলেন যে, আপনি জীবনানন্দ দাশ?
- আমি কবিতা লিখতে, বই পড়তে, বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ভাবতে ভালোবাসি। আমার ভাবনা গুলো মাঝে মাঝে টুকে রাখতাম। একটা বই পাই জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে লেখা, বইয়ের নাম 'একজন কমলা লেবু' লেখক শাহাদুজ্জামান। বইটি পড়তে পড়তে বুঝতে পারলাম আমি এ যুগের জীবনানন্দ দাশ। তাঁর চিন্তার সাথে আমার চিন্তার অনেক মিল খুঁজে পেয়েছি। তাঁর মতো আমিও অবহেলার শিকার হই পদে পদে। এমনকি আমার স্ত্রীও আমাকে বুঝতে চায়না, প্রতিনিয়ত সংসারের চাপে ফেলে জর্জরিত করে। আসলে পুনর্জন্ম বলতে আমি ব্যক্তির নয় বরং তাঁর জীবন-কর্ম-চিন্তা-আদর্শ-দর্শনের পুনর্জন্ম বুঝিয়েছি। যারা প্রজ্ঞাহীন তারা আমার কথাটি আক্ষরিক অর্থে বুঝেছে ভাবার্থ বুঝেনি।
'তাই বলুন, আপনিতো আমার মাথাটাও নষ্ট করে দিচ্ছিলেন আর একটু হলে,' এই বলে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ জনাব খালেকুজ্জামান ভূঁইয়া আমার স্ত্রীকে ডাকলেন এবং স্ত্রী সম্পর্কে আমার বক্তব্য টুকু বাদ দিয়ে বুঝিয়ে বললেন আমি কেন নিজেকে জীবনানন্দ দাশ মনে করি।
আমি আর আমার স্ত্রী চৈতী ডাক্তারের কাছে বিদায় নিয়ে রিকশা নিলাম বাসার উদ্দেশ্যে। চৈতী বললো, 'তুমি মিছেমিছি আমাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছিলে। এমন করলে কেন বলতো।'
আমি চৈতীর দিকে তাকিয়ে হৃদয় হিম করা হাসি দিলাম আর শীতল কণ্ঠে বললাম, 'লাবণ্য তুমি আমাকে তখনও বুঝোনি এখনো বুঝলেনা।'
9
View