গল্প

মৃত স্ফটিকের কান্না

September 3, 2026

Cristal Dead

5
View

মৃত স্ফটিকের কান্না

গত তিন দিন ধরে একটা কালো রঙের পালসার বাইক অর্কর পিছু নিচ্ছে।

অফিস শেষ করে অর্ক যখন কাওরান বাজারের ওভারব্রিজ পেরিয়ে ল্যাম্পপোস্টের আবছা আলো-আঁধারিতে এসে দাঁড়ায়, ঠিক তখনই বাইকের স্টার্ট বন্ধ হয়। বাইকে বসা দুজন যুবকের চোখ আটকে থাকে অর্কর হাতের কালো চামড়ার এক্সিকিউটিভ ব্যাগটার ওপর। ব্যাগটা সে সবসময় বুকের সাথে এমনভাবে চেপে ধরে রাখে, যেন ওর ভেতরে কোটি টাকার কোনো গুপ্তধন লুকিয়ে আছে। ইস্ত্রি করা নিখুঁত হালকা নীল শার্ট, ইন করা কালো প্যান্ট আর চকচকে জুতো—বাইরে থেকে দেখলে অর্ককে মনে হবে কোনো বড় করপোরেট অফিসের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, যে প্রতিদিন ব্যাগে করে দামী ল্যাপটপ, নথিপত্র কিংবা মোটা অঙ্কের ক্যাশ টাকা নিয়ে ঘোরে।

বাইকের পেছনে বসা ছেলেটা ফিসফিসিয়ে বলল, "বস, মালদার পার্টি। গত তিনদিন ধরে খেয়াল করতেছি। ব্যাগটা এক্কেরে বুকের সাথে আঠা দিয়া লাগায়া রাখে। নির্ঘাত ভেতরে লাখ টাকার মাল আছে। আজকেই ফিনিশিং দিতে হইবো।"

অথচ এই 'ফিটফাট' খোলসের আড়ালে লুকিয়ে থাকা মানুষটা আসলে জীবনযুদ্ধের এক অত্যন্ত ক্লান্ত, বিধ্বস্ত সৈনিক। একটা মাঝারি গোছের কোম্পানির ফ্রন্ট ডেস্ক রিসেপশনিস্ট সে। সেখানে বসতে হয় বলে কোম্পানির কড়া নিয়ম—সবসময় পরিপাটি থাকতে হবে। অথচ মাস শেষে তার পকেটে যা ঢোকে, তা সেই তুলনায় কিছুই না।

এই সামান্য কটা টাকা হাতে নিয়ে প্রতি মাসের এক তারিখে অর্কর চোখের সামনে ঘন অন্ধকার নেমে আসে। এই টাকা দিয়ে সে ঢাকার বুকে ছোট্ট এক চিলতে বাসার ভাড়া দেবে, নাকি মায়ের হার্টের ওষুধ কিনবে? নাকি সারা মাসের চাল-ডাল-নুন কিনবে? মধ্যবিত্তের না-বলা যত হাহাকার, সব যেন ওই একটা বেতনের অঙ্কে এসে থমকে দাঁড়ায়।

সংসারে টানাপোড়েন বাড়লে ভালোবাসা জানলা দিয়ে পালায়—কথাটা অর্ক এখন হাড়ে হাড়ে টের পায়। আজ সকালেই অফিসের জন্য বেরোনোর সময় স্ত্রী সুমি চেঁচিয়ে বলেছিল, "বউকে দুবেলা দুমুঠো খাওয়াতে পারো না, বিয়ে করতে গিয়েছিলে কেন? এমন নেড়িকুত্তার মতো জীবন নিয়ে বেঁচে আছ কেন? মরে যেতে পারো না?"

কথাগুলো তীরের মতো বুকে বিঁধেছিল অর্কর। তবু সে মরে যায়নি। গরুর মতো খেটে গেছে সারাটা দিন। রাত নয়টায় যখন তার ডিউটি শেষ হলো, তখন পকেটে পড়ে আছে মাত্র সত্তর টাকা। মাসের শেষ, ঘরে একটা দানাও নেই। ওদিকে মায়ের আজ রাতের ওষুধটাও কেনা হয়নি। তীব্র এক অপরাধবোধ আর ক্ষুধা পেটে নিয়ে অর্ক কাওরান বাজারের এক দোকান থেকে পঁয়ষট্টি টাকা কেজি দরে এক কেজি মোটা চাল কিনল। বাকি পাঁচ টাকা দিয়ে একটা দিয়াশলাই। চালের পলিথিনটা যত্ন করে নিজের অফিসিয়াল কালো ব্যাগটার ভেতর ভরে চেইনটা আটকে দিল সে। এটাই এখন তার পৃথিবীর洍বচেয়ে দামী সম্পদ, তার পরিবারের বাঁচার শেষ সম্বল। আর সে কারণেই সে ব্যাগটাকে পরম মমতায় বুকে চেপে ধরেছিল।

রাত তখন সাড়ে দশটা。 ল্যাম্পপোস্টের আবছা আলোয় অর্ক যখন তাদের গলির মুখে ঢুকল, চারপাশটা একদম নিঝুম। ঠিক তখনই সেই চিরচেনা পালসার বাইকটা এসে তার সামনে ব্রেক কষল। নিমিষেই দুজন মানুষ তার পথ আটকে দাঁড়াল। একজনের হাতে ধারালো চাপাতি, অন্যজনের চোখমুখ হিংস্র।

"চুপচাপ ব্যাগটা দিয়ে দে, কোনো চিল্লাচিল্লি করবি না!" চিৎকার না, ফিসফিসিয়ে তাগাদা দিল একজন।

অর্ক চমকে উঠে এক পা পেছাল। ভয়ে বুকটা ঢিপঢিপ করছে, কিন্তু দুই হাত দিয়ে সে ব্যাগটাকে আরও শক্ত করে বুকের সাথে চেপে ধরল।

ছিনতাইকারীদের একজন কুৎসিত হেসে বলল, "শালা, অনেকদিন ধরে তোরে ফলো করতেছি। প্রতিদিন একদম স্যুট-বুট পইরা বাবু সেজে যাস আর আসিস। ব্যাগে নিশ্চয়ই দামী ল্যাপটপ আর লাখ টাকার মাল আছে। ব্যাগটা ছাড়!"

অর্ক মাথা নাড়ল। তার মাথায় তখন সুমির ক্ষুধার্ত মুখটা ভাসছে। এই ব্যাগটা চলে গেলে কাল সকালে ওরা কী খাবে? সে অনুনয় করে বলল, "ভাই, প্লিজ এটা নিয়েন না। এতে দামী কিছু নাই। দোহাই আপনাদের..."

"নাটক করিস না!" অন্যজন অর্কর হাত থেকে ব্যাগটা হ্যাঁচকা টানে কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু অর্ক যেন আজ দানবীয় শক্তি পেয়েছে। সে কিছুতেই ব্যাগটা ছাড়বে না। এই ব্যাগটা তার আত্মসম্মান, তার বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন।

টানাহ্যাঁচড়ার এক পর্যায়ে একজন ছিনতাইকারী ধৈর্য হারিয়ে ফেলল। চাপাতি দিয়ে কোপ দিয়ে দিল কয়েকটা অর্কর পেটে।

একটা তীব্র আর্তনাদ রাতের বাতাসকে ভারী করে তুলল। অর্কর হাত দুটো শিথিল হয়ে গেল। সে ধপাস করে রাজপথের ধুলোয় লুটিয়ে পড়ল। ছিনতাইকারীরা ব্যাগটা ছিনিয়ে নিয়ে অন্ধকারের দিকে দৌড় দিল।

কিছুটা দূরে গিয়ে একটা ভাঙা দেয়ালের আড়ালে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে ব্যাগটার চেইন খুলল তারা। অধীর আগ্রহে ভেতরে হাত বাড়াল দামী কোনো গ্যাজেট বা টাকার বান্ডিল পাওয়ার আশায়। কিন্তু হাতের মুঠোয় যা উঠে এলো, তা দেখে দুজনেরই হাতের তালু ঠাণ্ডা হয়ে গেল。

ভেতরে কোনো ল্যাপটপ নেই, কোনো আইফোন নেই, এক গোছা টাকাও নেই। সেখানে পড়ে আছে শুধু একটা স্বচ্ছ পলিথিন, যার ভেতরে ৬৫ টাকা দামের এক কেজি সস্তা, মোটা চাল। আর একটা পাঁচ টাকার দিয়াশলাই।

ছিনতাইকারী দুজন পাথর হয়ে গেল। যে মানুষটাকে তারা মাত্র কয়েক সেকেন্ড আগে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিল, সে কোনো ধনকুবের নয়; সে তাদের মতোই এক অভাগা, যে শুধু এক কেজি চালের জন্য নিজের জীবনটা বাজি রেখেছিল! এক তীব্র, পৈশাচিক বিবেকের দংশন কামড়ে ধরল তাদের বুক। একজন কাঁপা হাতে চালের পলিথিনটা ব্যাগের ভেতর চালান করে দিয়ে অস্ফুট গলায় বলল, "ধুর শালা, এক কেজি চালের জন্য লোকটার জান নিয়ে নিলাম?" অন্যজন কোনো উত্তর দিতে পারল না। এক অদ্ভুত অপরাধবোধ আর ধরা পড়ার ভয়ে তারা ব্যাগটা ওখানেই ফেলে রেখে অন্ধকারের বুকে পাগলের মতো দৌড়ে পালিয়ে গেল।

ওদিকে, নিঝুম গলির পিচঢালা রাস্তায় একাকী পড়ে আছে অর্ক। তার মুখে আর কোনো অভিব্যক্তি নেই—না কোনো রাগ, না কোনো ক্ষোভ। আসলে সামর্থ্যহীন পুরুষের কোনো রাগ-ক্ষোভ থাকতে নেই, থাকতে পারে না। কেবল সহ্য করে যেতে হয়, এরপর কোনো একদিন খাটতে খাটতে মরে যেতে হয়।

শার্টের নীল রঙটা ততক্ষণে বুকের রক্তে কালচে হয়ে গেছে। তার নিষ্প্রাণ, স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ চোখ দুটো আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে, যেন সে সমাজকে জিজ্ঞেস করছে—তার অপরাধটা ঠিক কী ছিল? ধীরে ধীরে সেই চোখের কোণ বেয়ে দু ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল তপ্ত পিচের ওপর। পুলিশ এসে মাঝরাতে এক রক্তাক্ত যুবকের অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার করে মর্গে নিয়ে গেল, যার কোনো পরিচয় কেউ সেদিন উদ্ধার করতে পারেনি।

পরদিন সকাল গড়িয়ে দুপুর হলো, অর্ক আর ফিরল না। কিন্তু সুমির মনে কোনো অনুশোচনা কাজ করল না। অর্ক আসবে কি আসবে না—তা নিয়ে সুমি একটুও ভাবল না। তার ধারণা হলো, প্রতিদিনের অভাবের যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে অর্ক হয়তো তাকে এবং তার বৃদ্ধা মাকে এই নরকে একলা ফেলে রেখে কোথাও পালিয়ে গেছে। সে মনে মনে ভাবল, এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন পুরুষের সাথে আর এক মুহূর্তও থাকা সম্ভব নয়। এই নিখোঁজ হওয়াটাকে সুযোগ বানিয়ে, তীব্র ক্ষোভ আর স্বার্থপরতায় সুমি নিজের গোছানো জিনিসপত্র ব্যাগে ভরে এক চিলতে ভাড়া বাসাটা চিরদিনের মতো ছেড়ে বাপের বাড়ির উদ্দেশ্যে চলে গেল। পেছনে ফেলে গেল অর্কর অসুস্থ বৃদ্ধা মাকে।

অর্ক আর কোনোদিন ফিরবে না, তার কোনো খোঁজও নেই। ওদিকে নিজের চোখের সামনে পুত্রবধূর এমন নির্মমভাবে চলে যাওয়া এবং একমাত্র ছেলের কোনো সন্ধান না পাওয়া—এই দ্বিগুণ আঘাত সইতে পারলেন না বৃদ্ধা মা। তীব্র শোকে আর একাকিত্বে কয়েকদিনের মাঝেই তিনি সম্পূর্ণ পাগল হয়ে গেলেন।

ঘর থেকে বেরিয়ে তিনি ঢাকার রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। ক্ষুধার্ত, জরাজীর্ণ অবস্থায় যুবকদের শার্টের হাতা ধরে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করতেন, "বাবা, আমার অর্কর খোঁজ পেয়েছ? ও কি আমার ওষুধটা নিয়ে এসেছে?" কেউ তাকে তাড়িয়ে দিত, কেউবা পাগল ভেবে এড়িয়ে যেত। এক রাতে প্রচণ্ড শীতে ফুটপাতে ধুঁকে ধুঁকে মারা গেলেন তিনি। আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের গাড়ি এসে এক বৃদ্ধার বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে তাকে দাফন করে দিয়ে গেল। নিজের ছেলের লাশের মতোই, মায়ের লাশটাও এই নিষ্ঠুর শহরের মাটিতে বেওয়ারিশ হয়েই মিশে গেল।

ঢাকার কাওরান বাজারের রাস্তাগুলো আজো আগের মতোই ব্যস্ত। প্রতিদিন হাজার হাজার 'ফিটফাট' অর্ক ব্যাগে এক কেজি চালের স্বপ্ন নিয়ে যাতায়াত করে, আর কোনো এক অজ্ঞাত গলির কোণে পড়ে থাকে মৃত স্ফটিকের কান্নার না-বলা করুণ ইতিহাস।


 

Comments

    Please login to post comment. Login