গল্প

অনু গল্প-চোখ

September 3, 2026

Muztaba Ali

10
View

বেশ কিছুদিন হলো চোখে সমস্যা হচ্ছে। লিখতে গেলে ঝাপসা লাগে। চোখের ডাক্তার দেখালাম। তিনি পরীক্ষা করে দুটো টেস্ট লিখে দিয়ে বললেন রিপোর্ট গুলো দেখাতে। টেস্ট রিপোর্ট দেখালে তিনি বললেন, আপনি কি চোখে আঘাত পেয়েছেন কোন?
- নাতো।
- আপনার চোখে রক্তক্ষরন হয়েছে। আপনাকে অন্য একজন ডাক্তারকে রেফার করছি। আপনি তাকে দেখান।
আমিও রেফার করা ডাক্তারের কাছে গেলাম। আমার রিপোর্ট দেখে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আপনি চোখে কোন আঘাত পেয়েছেন?
-না।
তিনি বললেন, একটু ভেবে বলুনতো ছোট বেলায় কখনো চোখে আঘাত পেয়েছিলেন কিনা।
বাহ্ এই কথাটা আমার বেশ ভালো লেগেছে। ভাবতে আমার ভালোই লাগে। আমি ভাবতে শুরু করলাম। না ছোট বেলায় চোখে আঘাত পাওয়ার কোন ঘটনা মনে পড়লো না । তবে এক বন্ধুর চোখে আঘাত দিয়েছিলাম তা মনে পড়লো। তারপর সে কী ভয়ে ভয়ে বাসায় আসলাম বিচার দিয়েছে এই ভেবে।  কিন্তু না বিচার দেয়নি, তা-না হলে বাবার হাতে উত্তম মাধ্যম খেয়ে দিন কয়েক বিছানায় শুয়ে থাকতে হতো! 
- কি কিছু মনে পড়লো? 
-হ্যা, মনে পড়েছে। 
-বলুন। 
-আমি চোখে কোন আঘাত পাইনি, তবে ছোট বেলায় এক বন্ধুর চোখে গুতো দিয়েছিলাম। 
ডাক্তার একটু বিরক্তি নিয়ে বললেন, আমিতো আপনার বন্ধুর চিকিৎসা করবো না। আপনার চিকিৎসা করবো। 
- না মানে ছোট বেলার কথা ভাবতে গিয়ে একটু নস্টালজিক  হয়ে পড়েছিলাম। 
ডাক্তার আমার কথায় কান না দিয়ে বললেন, শুনুন আপনাকে চোখে কয়েকটি ইনজেকশন দিতে হবে আর একটা লেজার অপারেশন করাতে হবে। আচ্ছা আপনার বয়স কত?
- আসল বয়স উনচল্লিশ। সার্টিফিকেট অনুযায়ী সাইত্রিশ।
- আমি আপনার চাকরির ইন্টারভিউ নিচ্ছি না। আপনার সার্টিফিকেটের বয়স আমার প্রয়োজন নেই। আসলটাই লাগবে। 
- কী করবো বলুন কেউ যখন জন্ম তারিখ জানতে চায় প্রথমেই আমার আসল জন্ম তারিখ মনে আসে। এরপর ভেবে সার্টিফিকেটের জন্ম তারিখ  বলি।  অভ্যাসটা তাড়াতে পারছিনা। তাই এখন যখন বয়স জানতে চাইলেন আসলটা বলার সাথে সাথে মস্তিষ্ক অটোমেটিক ভাবে সার্টিফিকেটের টা হিসেব করে ফেলছে।
- আপনি বলছেন তাহলে ছোট বেলায় বা কখনো চোখে আঘাত পাননি?
- পাইনি। 
- আপনার কি ঘুম হয় ঠিকমতো?
-মাঝে মধ্যে ঘুম ঠিক মতো হয়না।
- আপনি কি কিছু নিয়ে খুব চিন্তিত? দুশ্চিন্তা করেন বা ভাবেন বেশি? 
-হ্যা।
- কী নিয়ে? 
- এইতো দেশ, জাতি, সমাজ নিয়ে। 
এতক্ষন আমার কথা শুনে তাকে বিরক্ত দেখাচ্ছিলো, এখন কেমন সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকালেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন - আপনি কী করেন? 
- ব্যাংকে চাকরি করি।
তিনি কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবলেন। তারপর তার প্যাডে কিছু একটা লিখে আমাকে দিয়ে বললেন, আমি আপনার চিকিৎসা করবো তবে একে একবার  দেখিয়ে আসেন।
দেখলাম কাগজে একজনের নাম ঠিকানা আর মোবাইল নম্বর লেখা আছে। কী জ্বালা এক চোখের চিকিৎসা করতে তিনজন ডাক্তার দেখাতে হচ্ছে। 
কাগজে লেখা মোবাইলে ফোন দিয়ে ডাক্তারের এপয়েনমেন্ট নিলাম। গিয়ে দেখি তিনি চোখের ডাক্তার না মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন - কী সমস্যা?
বললাম, কিছুদিন হলো চোখে সমস্যা। লিখতে গেলে ঝাপসা লাগে। 
- চোখে সমস্যা তো আমার কাছে কেন? যাবেন চোখের ডাক্তারের কাছে। 
- জ্বি, গিয়েছিলাম। একজন না দুজনের কাছে। প্রথম জন পাঠিয়েছেন দ্বিতীয় জনের কাছে আর দ্বিতীয় জন পাঠিয়েছেন আপনার কাছে। এখন আপনি কার কাছে পাঠাবেন কে জানে?
কথা শুনে হাসতে হাসতে তিনি বললেন, তাহলে আপনার বিষয়টা জটিল মনে হচ্ছে। তা কে পাঠিয়েছেন আপনাকে? 
আমি হাতে রাখা ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনটা দেখালাম তাকে। তিনি দেখে বললেন, আরে এতো দেখছি আমার স্কুল ফ্রেন্ড। 
আমার সাথে কিছুক্ষন কথা বলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ তার  চক্ষু বিশেষজ্ঞ বন্ধুকে ফোন দিয়ে বললেন, বন্ধু তুমি যাকে পাঠিয়েছো সে মানসিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ।
ওপাশ থেকে কী বললো তা আমি শুনতে পেলামনা। ফোন রেখে তিনি জানতে চাইলেন আমার সাথে চোখের ডাক্তারের কী কী কথা হয়েছিল। আমাদের সেদিন কী কথা হয়েছিল তা বললাম। শুনে তিনি বললেন, আসলে বর্তমানে দেশ জাতি সমাজ নিয়ে কেউ তেমন একটা ভাবেনা। তাই আপনি যখন বললেন এগুলো নিয়ে চিন্তা ভাবনা করেন আমার বন্ধু আপনাকে নিয়ে একটু চিন্তিত হয়েছিল। 
- তিনি কি আমায় মানসিক রোগী ভেবেছেন? 
- না ঠিক তা নয়। সে যাহোক, এখন আপনি বলুন দেশ ও জাতি নিয়ে আপনি কী ভাবেন? 
- ভাবি আমাদের দেশটির কী হওয়ার কথা ছিল আর কী হলো! সমাজতন্ত্র ধর্ম নিরপেক্ষতার আদর্শে জন্ম নেওয়া দেশে পুঁজিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার আগ্রাসন। আমরা সবসময় নিজের সুখ খুঁজি আর অন্যের ভুল। তাই না পারি নিজে সুখী হতে, না অন্যের ভুল শুধরাতে। যদি অন্যের সুখ খুঁজে বেড়াতাম আর নিজের ভুল, তবে হয়তো ভুলগুলো শুধরে সকলেই সুখী হতে পারতাম।
আরও শুনতে চান?
- শুনতে ভালো লাগছে, আমার হাতে সময় থাকলে আমি আরও শুনতাম। 
আমি সেখান থেকে বের হয়ে বাসায় চলে আসি। কিছুদিন পর চোখে ইনজেকশন দিয়ে বাসায় ফিরছি, ইনজেকশন দেওয়া চোখে ব্যান্ডেজ লাগানো, পথে আমার ছোট বেলার সেই বন্ধুর সাথে দেখা। আমাকে থামিয়ে বন্ধু জানতে চাইলো চোখে আঘাত পেয়েছি কিনা? বলতে গিয়ে থেমে গেলাম আমি কোন আঘাত পাইনি তবে ছোট বেলায় ওর চোখে একটা গুতো দিয়েছিলাম।

Comments

    Please login to post comment. Login