আমরা এর আগে দেখেছি নারীর জননাঙ্গ ছিঁড়ে ফেলার হুমকি দিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির সমালোচনা করা হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী ও তার পরিবারের নাম উল্লেখ করে যাচ্ছেতাই ভাষায় গালিগালাজ করা হলো এবার। অনেকেই দেখছি গালিবাজদের পক্ষ নিয়ে গালির স্বাধীনতা চেয়ে বিবৃতি ভাষণে ভরিয়ে ফেলছে সোশ্যাল হ্যান্ডেলের টাইমলাইন। এমন দাবি কোনো সভ্য সমাজে টেকে?
এই ধরনের অ্যাটিচ্যুড কি আসলেই ব্যক্তিগত স্বাধীনতা? দেশজ ও আন্তর্জাতিক আইন এ ব্যাপারে কী বলে?
ব্যক্তিগত স্বাধীনতা হলো -আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড (জাতিসংঘের Universal Declaration of Human Rights (UDHR), Article 3) অনুযায়ী, অন্যের অধিকার ও আইনের সীমা অক্ষুণ্ণ রেখে নিজের জীবন, মত, বিশ্বাস ও সিদ্ধান্ত সম্পর্কে স্বাধীনভাবে পছন্দ ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার।
অপরদিকে বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯(১): অনুযায়ী নাগরিকদের চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তাদান করা হয়েছে। তবে সেটিও নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে। ৩৯(২) -এ বলা হয়েছে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা বা নৈতিকতা, আদালত অবমাননা, মানহানি কিংবা অপরাধে প্ররোচনার ক্ষেত্রে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ সাপেক্ষে: (ক) প্রত্যেক নাগরিকের বাক্ ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং (খ) সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতা -নিশ্চিত করা হয়েছে।
এখন আপনি বলেন, কাউকে যখন তার মৃত মা বাবা তুলে পাবলিকলি বেফাঁস ভাষায় বেপরোয়াভাবে গালিগালাজ করেন, সেখানে শালীনতা বা নৈতিকতা থাকে? সেখানে অন্যের অধিকার ও আইনের সীমা অক্ষুন্ন থাকে? তার ওপর দেশের প্রধান নির্বাহীকে আপনি এভাবে গণপরিসরে 'অ্যাবিউজ' করতে পারেন?
হ্যাঁ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে সবাই নাকাল হচ্ছে -তাই বলে সংক্ষুব্ধ নাগরিকেরা একযোগে আইন ভঙ্গ করবে? শিষ্টাচার ও শালীনতা জলাঞ্জলি দেবে? পরিস্থিতি উত্তরণের জন্য ধৈর্য ধরবে না? গঠনমূলক ভাষায় সমালোচনা করা যায় না?
কাজেই প্রধানমন্ত্রী বা তাঁর পরিবারের সদস্যকে যাচ্ছেতাই ভাষায় গালিগালাজ করা কোনোভাবেই 'ব্যক্তিগত স্বাধীনতা' বা সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদের সুরক্ষিত মতপ্রকাশের আদর্শ উদাহরণ নয়। সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ বাক্ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করলেও সেই স্বাধীনতা মানহানি, অপরাধে প্ররোচনা, জনশৃঙ্খলা ইত্যাদি বিষয়ে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধের অধীন।
গালিগালাজ করা একেবারেই ন্যায়সঙ্গত নয়; কিন্তু শুধু গালিগালাজের অভিযোগকে কাউকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্রেপ্তারের যথেষ্ট আইনি কারণও বলা যায় না।
সরকারের বিদ্যুৎনীতি বা প্রধানমন্ত্রীর কর্মকাণ্ডের তীব্র সমালোচনা করা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অংশ হতে পারে; কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে অশ্লীল গালিগালাজ, মিথ্যা মানহানিকর অভিযোগ, হুমকি বা অপরাধে প্ররোচনা করলে তা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সীমার বাইরে যেতে পারে -তবে গ্রেপ্তার করতে হলে সেই নির্দিষ্ট অপরাধের আইনি ভিত্তি ও যথাযথ প্রক্রিয়া অবশ্যই থাকতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী একটি রাজনৈতিক/সরকারি পদে থাকা ব্যক্তি হিসেবে সাধারণ নাগরিকের চেয়ে বেশি মাত্রার রাজনৈতিক সমালোচনা সহ্য করবেন -এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ নীতি। কিন্তু 'প্রধানমন্ত্রীকে সমালোচনা করা' আর 'প্রধানমন্ত্রীকে গালিগালাজ করা' -দুটিকে এক করে দেখা যুক্তিসঙ্গত কোনো কারণ নাই।
ব্যক্তিগতভাবে আমরা চাই না -সোশ্যাল হ্যান্ডেলে কারো অশ্লীল, কুরুচিপূর্ণ, শিষ্টাচারবহির্ভূত ও অশ্রাব্য গালিগালাজ শুনে আমাদের কোমলমতি সন্তানেরা প্ররোচিত হোক। ভবিষ্যতে তারাও গালিবাজ প্রজন্ম হয়ে উঠুক।গালি কোনোভাবেই ন্যায়সঙ্গত সমালোচনার ভাষা নয়। আমরা আগে নিজেকে শোধরাবো ঠিক তারপরই নাগরিকের প্রতি যথোচিত আইন প্রয়োগের দাবি তুলব।
আপনি এখন যদি সমাজে ন্যায্যতা বা ন্যায়নিষ্ঠা প্রতিষ্ঠা করতে গালিগালাজের জন্য কাউকে বিচারের আওতায় আনতে চান -রাজনীতিতে ওই গালিগালাজ আমদানির ক্ষেত্রে যিনি রীতিমতো 'The epitome of verbal abuse' -তার বিরুদ্ধে Posthumous legal proceedings শুরু করবেন না? তা না হলে সেটা তো Double standards -এর বড় উদাহরণ হয়ে যাবে।
▪️
লেখক: সাংবাদিক
৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬