ট্রেন স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম ছুঁয়ে দাঁড়াতেই শুরু হয়ে গেল হুড়োহুড়ি।
যাত্রী নামার আগেই আরেকদল ওঠার জন্য ব্যস্ত।
এতে ভিড় ঠেলে নামাটাই ঝক্কি।কিন্তু উপায় নেই। নামতেই হবে।
শক্ত হাতে ট্রলি ব্যাগটা ধরে রেখে কোনো রকমে নেমে এলো নীরা।
অন্যান্যে দিনের চেয়ে,আজকে ভিড়টা একটু বেশি!
তার অবশ্য একটা বিশেষ কারণও আছে।
গত পরশু রাতে, মানবতাবিরোধী একাত্তরের দালাল,কাদের মোল্লার ফাঁসি হয়েছে।
দেশের প্রায় সব জায়গায় নাশকতা শুরু হয়ে গেছে।
সব ট্রেন ছাড়ার সময়সূচি পরিবর্তন হয়েছে।অনেক ট্রেনের যাত্রা বাতিলও হয়েছে।
নীরা হাটঁতেছে আর ভাবিতছে ;কি ঝক্কিঝামেলাই না পোঁহাতে হলো!
হঠাৎই একটা মা কুকুরকে দেখে, তার চোখ আটকে গেল।ছয়টা বাচ্চা মা কুকুরটাকে ঘিরে আছে।কুকুরটা ভয়য়ার্ত চোখে চারপাশে তাকাচ্ছে।এতো মানুষ!বাচ্চাদের ঠিকমতো দুধটুকুও দিতে পারছেনা।
সাধারণ মানুষের কী অবস্থা!
ভিড় থেকে অনেকটাই দূরে এসেছে নীরা।
হঠাৎ তার মোবাইলে রিং বেজে ওঠে...
হ্যালো মা।
হ্যা রে,ঠিক আছিস তো!
ক্যান যে শুধু শুধু চিন্তা কর,বুঝিনা।
না মানে,টিভিতে তো চারদিকের অবস্থা দেখাচ্ছে।
মিডিয়ার লোকদের এ ছাড়া আর কোনো কাজ নেই।শুধু সাধারণ মানুষের আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠা বাড়িয়ে দেয়া।যা সাধারণ মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলে; কি দরকার তা লাইভ কাস্ট করার।দেশে কত দুর্নীতি হচ্ছে; কোথাও,কখনো দেখলাম না তো,কোনো চ্যালেনের অনুসন্ধানী টিমকে অনুসন্ধান করতে!
শুধু সাধারণ মানুষের আবেগ নিয়ে খেলে।
শুধু শুধু ওনাদের দোষ দিচ্ছিস কেনো, এটা বাংলাদেশ! শুধু কী ওনারা দায়ী?
আচ্ছা মা,রাখলাম,ভালো থাকো।
হাজারো হলো মায়ের মন তো, সন্তানের জন্য টেনশন হওয়াটাই স্বাভাবিক।
নীরা মোবাইল রেখে হাটঁতে থাকে আর গত দু'দিনের কথা ভাবতে থাকে...।
সকাল ৯টায় ট্রেন ছিল।সেই ট্রেন ৩০ মিনিট পরে পরে করে আসতে আসতে,এলো রাত ১২টায়।
চারদিকে আতঙ্ক!প্যাট্রোল বোমা, গাছ ফেলে রাস্তা অবরোধ,ট্রেনের স্লিপার খুলে ফেলা ইত্যাদি ইত্যাদি।
ভুক্তভোগী আর কেউ নয়; ও-ই সাধারণ মানুষেই!
এদেশে সুস্থ ধারার রাজনীত...।
সেই ট্রেন আর ছাড়লো না।অনন্যােপায় হয়ে ;ঠিক ভোরে অন্য ট্রেনে ওঠতে হলো।
ট্রেন ধীরেধীরে চলতে চলতে ভোরের ঘন কুয়াশা কেটে গেলেও যাত্রীদের মনের মাঝে তখনো ধোঁয়াশা।
কোনো বিপদ ছাড়াই ট্রেন ৫টায় প্ল্যাটফর্মে এসে পৌঁছালো।
অনেকটা পথ হাঁটার পরে নীরার মনে হলো,রুটি-কলা খেয়ে আর কতো!
এমন নিরিবিলি শহরে আশেপাশের কোনো হোটেলে ভাত খেলে মন্দ হয়ে না।
এ-ই যে কাকা,যাবেন?
হ,যামু
আশেপাশের কোথাও খাবার হোটেলে নিয়ে চলেন।
রিক্সা ওঠেই নীরা আবারও ভাবনার সাগরে হারিয়ে যায়।
সন্তান বাহিরে থাকলে মা-বাবার অনেক চিন্তা হয়।তাছাড়া বাড়িতে আসার কথা শুনলে তো নাওয়া,খাওয়া,ঘুম একদম ছেড়েই দেয়।
নীরা নিজেই নিজেকে দোষ দেয়;কেন যে,এ-ই অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে বাহির হতে গেলাম
এত বছর হলো পড়াশোনা শেষ!কই,চাকরি নিয়ে মা-বাবার একটু সেবা করবো;তা না,শুধুশুধু প্যারা দেই।
চেষ্টা তো আর কম করতেছিনা;বাংলাদেশ বলে কথা!
না,এভাবে দেশকে দোষ দেয়া ঠিক হচ্ছে না।
হয়তো যেভাবে প্রস্তুতি নেয়া দরকার সেভাবে নিচ্ছি না বলেই চাকরি পাচ্ছিনা।
এই যে হোটেল, এ্যাহানে মোটামুটি সব পাবেন।
ধন্যবাদ কাকা।
খাবার শেষেে নীরা বের হয়ে একজনকে জিজ্ঞেস করেন;মেইন রাস্তাটা কোন দিকে,যদি একটু বলে দিতেন?
রাস্তা দিয়া কী করবেন! গাড়ি তো পাইবেন না।
তাহলে কোথাও যাওয়ার কী উপায়?
ওলিগলি দিয়া ভ্যান,রিক্সা,সিএনজি নিয়া যাওন যায়।
আচ্ছা, ঠিক আছ। ধন্যবাদ।
একটা গলির মোড়ে এসে নীরা কিছু লোকের সাথে ভ্যানে ওঠে রওনা দেয়।
আবারও মোবাইলে রিং বেজে ওঠে...
হ্যা মা, বলো।
কি আর বলবো!বেরিয়েছিস তো গত পরশু সকাল। সেদিন গেছে,রাত গেছে,আজকেও তো সন্ধ্যা হয় হয় অবস্থা! ঠিক আছিস তো।না কী, মিথ্যা সান্ত্বনা দিচ্ছিস।
টেনশন করোনা,ঠিক এসে পরবো।
কেউ কী ইচ্ছে করে টেনশন করে!চারদিকে যে অবস্থা,চিন্তা এমনিতেই আসে।
আচ্ছা মা,রাখলাম।
ঠিক আছে;আল্লাহ যেন ভালো ভাবে নিয়ে আসে।
ভ্যানের যাত্রীদের মুখে ঘুরে ফিরে একই আলোচনা,দেশের রাজনীতি!
যে গনতন্ত্রের মূল ভিত্তি জনগণের ক্ষমতা ;অথচ সেই শাসনব্যবস্থায়, জনগণেই বেশি নির্যাতিত অবহিত।
ভ্যান থেকে নেমে আবারও গাড়ির জন্য অপেক্ষা। এবার সঙ্গী হয়েছে একটি পরিবার। ছেলে-মেয়ে সহ একটা মহিলা। বাবার বাড়ি বিয়ে খেতে যাচ্ছে।
ঘন্টা দুই অপেক্ষার পরে একটা অটো পাওয়া গেল।এবার গ্রামের ভিতরের রাস্তা দিয়ে চলা।ঘড়িতে প্রায় রাত ৮টা।সব কেমন থমকে গেছে।কোথাও মানুষের একটুও কোলাহল নেই।
অটোতে মহিলার সাথে কথা বলতে বলতে জানতে পারলাম। সকালে একটু খেয়ে বেরিয়েছে,ছেলে-মেয়ে না খেয়ে সারাটা দিন গেল।
আমি বললাম, কিছু মনে না করলে আমার কাছে বিস্কুট ও ফল আছে,সবাই খেতে পারি।
উত্তরে অপেক্ষা না করে;সবাইকে বিস্কুট ও ফল বাড়িয়ে দিলাম,সাথে পানি।
অটো থেকে নেমে কিছুক্ষণ হাটাঁর পর,খেয়া পার হতে হলো। ঘড়িতে প্রায় ১০টা।
খেয়া পারের টং দোকান দুটো খোলা।লোকের আনাগোনা নেই বললেই চলে।আবারও অপেক্ষা...।
অবশেষে আবার একটা ভ্যান পাওয়া গেল।রাত ১২টা।
ভাড়ার কথা জানতে চাইলে,বললেন-যা ভাড়া তাই দিয়েন।
নিজের কাছেই অবাক লাগলো!
নিম্নবর্গের মানুষগুলো বিবেকবান হলেও উচ্চবৃত্তের মানুষগুলো দিনদিন...।
যখন ছোট ছিলাম।তখন গভীর রাতে আশে-পাশের গ্রাম থেকে অনেকে চোর-চোর, ডাকাত-ডাকাত বলে চিৎকার করত। আর এখন নেই বললেই চলে।
কিন্তু বড় বড় আমলা ও রাজনীতিবিদদের দৌড়ত্ব থেমে নেই!
ভ্যান থেকে নেমে,হাটঁতেছি সেই চিরচেনা শহরের রাস্তায়।ফুসফুস ভরে বাতাস টেনে নিচ্ছি।নিজের শহর বলে কথা।রাত প্রায় ২টা।
মোবাইলে রিং বেজে উঠলো...
হ্যা, বাবা বলো।
মা রে,আমি তো ব্রিজে তোর অপেক্ষায়!
আর কতক্ষণ।
ক্যান শীতের রাতে শুধুশুধু কষ্ট করে আসতে গেছো?
পাগল মেয়ে,তোকে বাহিরে রেখে কেমনে ঘরে থাকি!
অপেক্ষা করো,এক্ষুনি আসতেছি।
“অপেক্ষা”
মো: ফরহাদ