গল্প

" প্রতিবন্ধকতা"

September 5, 2026

MD FORHAD

6
View

এই সুন্দর পৃথিবীতে মানুষের জীবনের নানা বাধা -বিপত্তি ও প্রতিবন্ধকতা।
বাহির থেকে জীবনকে দেখতে সমতল মনে হলেও জীবনটা আসলে প্রতিটা ক্ষেত্রেই বন্ধুর।
মানুষকে বাঁচতে হলে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হয়।
ঐশ্বরিক শক্তির মতো পরিবার, সমাজ জীবনের গতিপথ পরিবর্তন করে দেয়। তখন মানুষ নিজেকে হারিয়ে, নতুন করে খোঁজে। মাঝে-মাঝে নিজের সত্তার সাথে একা-একা বকে যায়।ক্লান্ত, অবিশ্রান্ত মানুষ, জীবনের বাস্তবতা ভেবে সবকিছুই মেনে নেয়।
তেমনি একটা বাস্তবতা স্বীকার 'আলো'
সে ছোটবেলা থেকেই চটপটে স্বভাবের। ক্লাসে যেমন ছিল মেধাবী তেমনি পারদর্শি ছিল খেলা, নাচ-গান ও অভিনয়ে।
কিন্তু যতোই বড় হচ্ছে ততোই সে যেন নিজেকে হারিয়ে ফেলছে।তার চারপাশে প্রতিবন্ধকতার দেয়াল তৈরী হচ্ছে।
নিজের পরিবারেই তার প্রধান প্রতিবন্ধকতা।
রক্ষণশীল পরিবারে যারা জন্মগ্রহণ করেন একমাত্র তারাই জানেন সেখানে বেড়ে ওঠা কতটা কঠিন। 
নিজের স্বাধীনতা বলে কিছু থাকেনা,সকল চাওয়া -পাওয়া, আশা-আকাঙ্ক্ষা কে টুটি চেপে হত্যা করা হয়।
ব্যক্তি মানুষ হিসেবে তার ভালো লাগা থাকতে পারে না।তাকে পুতুলের ন্যায় অসার, অনাড়ম্বর জীবন -যাপন করতে হয়ে।এমন রক্ষণশীল পরিবারের কারণে অনেক সৃজনশীল সম্ভাবনা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়।
আলো ধীরে ধীরে পড়ালেখায় মনোযোগ হারিয়ে ফেলে। কাউকে যদি সকল প্রকার সুবিধা দেওয়ার পরে হঠাৎই বন্ধ করে দেওয়া হয়।তখন তার জীবনে যে বাস্তবতা নেমে আসে শুধু সেই উপলব্ধি করতে পারে। 
আলোকে ছোট থাকতে সবকিছুই করতে দেয়া হলেও যতোই বড় হচ্ছে ততোই ক্রমে ক্রমে সব বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে।
অষ্টম শ্রেণিতে তার এই প্রতিবন্ধকতা শুরু। 
স্কুলে নিয়ে যেতো তার মা,আবার ছুটির পারে তিনিই নিয়ে আসতেন।এমনকি বাসায় যে শিক্ষক পড়াতে আসতেন সেখানেও কেউ না কেউ বসে থাকতো।

রবি ঠাকুর বলেছেনঃ -'মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ।'
মানুষ কখনো কারো বিশ্বাসকে অপমান করে না,যদি কেউ করতে চায় অনুশোচনার অগ্নি শিখা তাকে প্রতিনিয়ত দগ্ধ করে।
নিজেদের উপর আমাদের বিশ্বাস নেই সন্তানের প্রতি রাখবো কিভাবে! 
শাসন করলেও তো তার একটা সীমা আছে। 
এই বয়সে তো অন্য কিশোর -কিশোরীর মতো তারও আকাশ ছুঁতে মনে চায়।কিন্তু শাসনের কণ্টক আঘাতে জর্জরিত হয়ে চারদেয়ালের মাঝে হাপিত্যেশ করে দিন গুজরাতে হচ্ছে। 
খাঁচার পানিও তো স্বাধীনতা আছে।খাঁচায় বন্দী থাকে ঠিকই কিন্তু পায়ে তো আর শিকল থাকে না।
খাঁচার মাঝেই সে আকাশ  কল্পনা করে পাখা মেলে কিন্তু 'আলো' শুধু বন্দী না তার পায়ে শিকলও আছে!
চাইলেই সে তার আকাশে পাখা মেলতে পারে না।
মাঝেমধ্যে সে ব্যালকুনিতে দাঁড়িয়ে অদূরে ছোট ছোট  ছেলে-মেয়েদের দৌড়াদৌড়ি দেখে। তার বয়সি মেয়েদের রাস্তায় হাঁটতে দেখে। 
এসব দেখে তার ইচ্ছে করে-'বসন্তের এলোমেলো বাতাসে চুল এলিয়ে,বিকেলের মিষ্টি রোদে ঘোরাঘুরি করতে।সকালে শীতের স্নিগ্ধতা অনুভব করতে।হেমন্তের শিশির সিক্ত ঘাসের ওপরে খালি পায়ে হাঁটতে। '
এসব অবাস্তব কল্পনা করতে করতে নিজের অজান্তেই তার চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে।

হাজারো ব্যথা বুকে চেপে রেখে সে জে.এস.সি. পরীক্ষা দেয়। 
রেজাল্ট হলে দেখে যতটা খারাপ হওয়ার কথা তার চেয়ে অনেক ভালো হয়েছে। 
এবার পরিবার থেকে আরো কঠোর শাসন শুরু হয়।
আগে তবুও ব্যালকুনিতে দাঁড়িয়ে নানা চিন্তার মাঝে  ছোটবেলার দিনগুলো রোমন্থন করা যেতো এখন সে সুযোগও নেই।
কতো সুন্দরই না ছিল সেই  দিনগুলো! 
ক্লাসে প্রথম হওয়া, বার্ষিক ক্রিড়া প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন রাউন্ডে প্রথম হওয়া।নাচ,গান ও অভিনয়ে দর্শকদের মুগ্ধ  করে রাখা, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেয়া।
অথচ এখন তাকে বন্দিনীর মতো থাকতে হচ্ছে।
কিশোরী বয়সের দুরন্তপনার তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে কিন্তু পরিবারের প্রতিবন্ধকতার কারণে সে সাড়াও দিতে পারছে না।

দেখতে দেখতে আলো এস.এস.সি পরীক্ষাও দিয়ে ফেলে।
পরীক্ষা শেষে কিছুদিন বেড়াতে নানা বাড়িতে যায়।
সেখানে আবার ফিরে আসে সেই দুরন্তপনা,চঞ্চলতা। 
সবচেয়ে ভালো লেগেছে তার সমবয়সী মামাতো বোনের সাথে থেকে। 
আলো এ-ই বয়সে মোবাইল ব্যবহার করা দূরে থাক কাছেও যেতে পারে না অথচ তার মামাতো বোন ফোন ব্যবহার করে।
ফেসবুকে নিজেদের গ্রুপে পড়া-লেখার বিষয় শেয়ার  করে।কেউ কোনো বিষয় সমাধান, বা না বুঝতে পারলে অন্যজন তার সাহায্য এগিয়ে আসে।
অনেক প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তির সম্পর্কে জেনে অনুপ্রাণিত হওয়া যায়।
বিশ্বের কোথায় কি ঘটিতেছে মূর্হুতে তা জানা যাচ্ছে।
সমাজ সেবামূলক অনেক কাজের সম্পর্কে জেনে মূল্যবোধ জাগ্রত হয়।
সচেতনতা মূলক পোস্ট পড়ে সচেতন হওয়া যায়। 
চরিত্র গঠন থেকে শুরু করে ইত্যাদি ভালো বিষয়ে জানা যায়।
যে কোনো ক্ষতিকর বিষয় সম্পর্কে প্রবল সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা যায়।
কোনো অন্যায় কাজের বিষয় মূর্হুতের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়ে প্রতিরোধ করা যায়। 
নির্যাতিত,অবহেলিত, অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সাহায্যের আহ্বান করা যায়। 
এসব দেখে আলো ভাবে-'যদি এমন সুযোগ পেতাম তাহলে জীবনটা নতুন করে সাজাতাম।'

এর মাঝেই তার এস.এস.সি রেজাল্ট প্রকাশ পেয়েছে।এবার সে অনেক খারাপ করেছে। 
এই নিয়ে তাকে অনেক বাজে কথাও শুনতে হয়েছে।
নিজে নিজে ভাবে-'পাশ করেছে এটাই তো সুভাগ্য।'

এবার এইচ.এস.সি-তে ভর্তির পালা।
বাড়ির আশেপাশে না,তাদের বিভাগীয় শহরে। 
তার বড় কাকী যেখানে শিক্ষকতা করেন। 
বাহিরে ভর্তির কথা শুনে আলোর চোখে -মুখে আনন্দের আভা দেখা  যায়। কিন্তু তার বাবার নীতিমালা চরম!ছেলেদের সাথে প্রাইভেট পড়তে পারবে না।কাকীর সাথে ক্লাসে যাবে ছুটির পরে তার সাথেই আসবে।

সে প্রথম দিন ক্লাসে গিয়ে দেখে এখানকার পরিবেশ সম্পূর্ণ আলাদা। 
ছেলে কি মেয়ে সবাই অনেক আপডেট। 
বাহিরের জগৎ সম্পর্কে প্রত্যেকে অনেক কিছুই জানে।সে তুলনায় আলো কুপমুন্ডুক।
কিছুদিন ক্লাস করার পর আলো দেখে,অনেকে নেটের সাহায্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় বিষয় সহজেই হাতে পেয়ে যায়। তারাই অনেক ভালো করে।
কোনো বিষয় বুঝতে সমস্যা হলে,ইউটিউবে টিউটোরিয়াল দেখে সহজেই তা বুঝে নেয়া যায়।
আলো একটা ভালো ফোনের অভাব অনুভব করে।কম্পিউটার ,ল্যাপটপ না থাকলেও একটা স্মার্ট ফোন হলে কিছু টা তো সুবিধা ভোগ করতে পারবে।
আলো প্রতিদিন টিফিনের টাকা থেকে জমানো শুরু করে।
কিছুদিন পর সে টাকা দিয়ে একটা মোবাইল কেনে।
সবার অগোচরে সে এটা ব্যবহার করে।
ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলে নাম দিয়েছে -'রুপ কথার আলো'।
বন্ধুদের কাছ থেকে অনেক ভালো সাড়াও পায়।
সে যেনো রুপ কথার আলোর মতোই সবার মাঝেই জায়গা করে নেয়।
সে মানসিক দিক থেকে সন্তুষ্ট থাকার কারণে মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করে সান্মাষিক পরীক্ষায় প্রথম হয়।
পরিবারে সবাই অনেক খুশি।
তাকে আরো ভালো করে পড়ার চাপ দিতে থাকে।
তাদের আঙ্খাকা বাড়তে থাকে।

গরমের ছুটিতে আলো বাড়িতে বেড়াতে আসে।
তার মা ব্যাগ থেকে কাপড়,বই-খাতা বাহির করতে গিয়ে মোবাইলটা দেখতে পায়।
আলোকে জিজ্ঞেস করলে,সে বলে-'টিফিনের টাকা জমিয়ে কিনেছে'।
সে ভেবেছিল -'মেয়ে বড় হয়েছে বিষয়টি মা সহজ ভাবেই নিবেন'।কিন্তু না,তার মা অনেক বকাঝকা করে। 
সে যে বড় হয়েছে তার যে একটা ব্যক্তিত্ব তৈরি হয়েছে।এটা মনে করে অনেক কষ্ট পায়।মায়ের ওপর অনেক রাগ হয়।
একজন মেয়ে হয়েও তার ব্যথাটা বুঝলো না।
মা বাহিরে গেলে আলো ফোন নিয়ে ফেসবুকে স্টাটাস দেয় -
"কোনো এক পাখি ডাকা ভোরে,
জীবনের সব মায়া ছেড়ে,
অভিমানী কেউ চলে যাবে জীবনের ওপারে।
কেউ জানবে না সে কথা,
জানবে শুধু তার ডাইরির পাতা।"

ফুল যদিও সকালে ফুটে বিকেলেই ঝরে যায় তবুও তার সার্থকতা কারণ তার পবিত্র ঘ্রাণে চারপাশকে সুভাষিত করে কিন্তু যে ফুল মুকুলেই ঝরে যায় তার সার্থকতা কোথায়?

আলোকে আর ফেসবুকে দেখা যায় না।

'প্রতিবন্ধকতা'

মো: ফরহাদ

Comments

    Please login to post comment. Login