আর্ট এক ধরনের চ্যালেঞ্জ। বিশাল ঝুঁকি। জীবনের কুৎসিত নগ্নতা, সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে সৃজনশীল প্রাণবন্ততার চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ এবং তার প্রতিক্রিয়া এক জাতের খেলা। শিল্পের খেলা। এই খেলা যে পূর্ণ আস্থা নিয়ে খেলতে পারবে, সেই শিল্পী—এই যে শিল্প আর শিল্পী সম্পর্কে নান্দনিক একটা ধারণা, এঁকে ভেঙে ফেলাটা যথেষ্ট জরুরি ছিল। ঋত্বিক ঘটক এই খেলার নিয়মটাই ঘুরিয়ে দিলেন। একদম এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিলেন তৎকালীন নন্দনতত্ত্ব, আর্টের ভাষাকে। জীবনের কুৎসিত নগ্নতাকে উপস্থাপন করলেন শিল্পরূপে। এমনভাবে উপস্থাপন করলেন, আপনার হাতে ডিনাই করার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই। সবচেয়ে মজার ব্যাপার, আমি আজ থেকে চার বছর আগে রামকিঙ্কর বেইজ নিয়ে লিখেছিলাম। সেদিন যে বাক্য দিয়ে শুরু করেছিলাম, আজও সেই বাক্যটা দিয়েই শুরু করলাম। অন্য কোনো বাক্য খুঁজেই পেলাম না। ঘটক আবার কিঙ্করবাবুকে নিয়ে একটা ডকুমেন্টারিও বানিয়েছিলেন। কেমনে কেমনে অঙ্ক মিলে যায়। অঙ্ক কি এতই সোজা? ডকুমেন্টারি শেষ হওয়ার আগেই ঘটক মারা পড়লেন। ঈশ্বরের ঘটকের সাথে জরুরি মিটিং, অনেক তাড়া ছিল। ঘটক ছাড়া ঈশ্বরকে উদ্ধার করার সামর্থ্য কজন রাখে?
ঋত্বিক ঘটক নিয়ে আলাপ করতে গেলে, লিখতে গেলে আমি খুব সেন্টিমেন্টাল হয়ে যাই। আমার গুরু তো। আমি তার সমালোচনা করে, তাকে গালাগাল দিয়ে উদ্ধার করে ফেলি। আবার ওর কথা মনে হলেই চোখে জল আসে। আমি খুব বলিষ্ঠ স্বরে আমি আজ অবধি বলে এসেছি, ঋত্বিক ঘটককে টেক্কা দেওয়ার সামর্থ্য শুধু আমিই রাখি। ঘটককে ছাড়িয়ে যাওয়ার হিম্মত আমার ছাড়া কারও নেই। আমিই তার একমাত্র আধুনিক উত্তরসূরি। আর কেউ তার সমকক্ষ হওয়ার সাহস তো করেনি। সবাই ধরে নিয়েছে ঘটক ধ্রুব, আমি ঘটককে টেক্কা দিয়েছি।ভেঙেচুরে দিয়েছি।নতুন করে ভাবার জায়গা উৎপাদন করেছি।কিছুক্ষণ আগে আমার ভাই কেরালার ফিল্মমেকার অর্জুনের সাথে ঘটক নিয়ে আলাপ হলো। আমার বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা দেখে অর্জুন বললো, “ঘটকের কাছে তবুও মদ খাওয়ার টাকা ছিল, সেলিম। তুমি কিন্তু বেশিই রিস্ক নিয়ে নিচ্ছো।” আরও বেশ কথা হলো। যাগ্গে, বাদ দিই এসব। ওই যে বললাম, ঋত্বিক ঘটক নিয়ে আলাপে আমি খুব ষেনটিমেনটাল। পাঠক এ লেখা পড়ে বড়ই বিরক্ত হবেন। খুব বেশি আগ্রহ না থাকলে এখানেই ইতি হোক।আমার তিনটি সিনেমার একটিও সেন্সরে পাস করে নাই,ফেল।পাস নাম্বার কোনরকমেও পেলো না।আমার এ নিয়ে ভীষণ আফসোস,ভীষণ।
মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, উসকোখুসকো চুল, মলিন পাঞ্জাবি-পাজামা, ঠোঁটে বিড়ি, হাতে বাংলা মদের বোতল, কাঁধে শান্তিনিকেতনী ঝোলা নিয়ে তখনকার কলকাতায় ট্রেডমার্ক ঋত্বিক হয়ে গেলেন। সিজোফ্রেনিয়াতেও আক্রান্ত হন। স্পষ্টভাষী, ঠোঁটকাটা। নিজের পরিচয় দিতেন মাতাল বুদ্ধিজীবী, ব্রোকেন ইন্টেলেকচুয়াল বলে। এমন গল্প আছে যে, হয়তো রাতে বাড়ি ফিরছেন, মাতাল অবস্থায় পা চলছে না। ট্যাক্সি নিলেন। বাড়ি এসে ভাড়া দিতে গিয়ে বললেন, ১/১ বিশপ লেফ্রয় রোডে গিয়ে কলিং বেল টিপলে একজন ঢ্যাঙা লোক বেরিয়ে আসবেন। তাকে বলবে, ঋত্বিক ঘটক ভাড়া দিতে পারেনি। আপনাকে দিতে বলেছেন। সেই ঢ্যাঙা লোকটি সত্যজিৎ রায়। অনেকবার সত্যজিৎ এভাবে নাকি ঋত্বিকের ট্যাক্সিভাড়া পরিশোধ করেছেন।
কিন্তু অভাব নিয়ে ঋত্বিকের কোনো দুঃখবোধ ছিল না। স্পষ্টভাষী, ঠোঁটকাটা ঋত্বিক একবার বলেছিলেন যে, তাঁর বাবা চেয়েছিলেন তিনি ইনকাম ট্যাক্স অফিসার হন। ঋত্বিক ইনকাম ট্যাক্সে চাকরি পেয়েও না করে উল্টো কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান করেন। তিনি বলেন যে, হয়তো তিনি ওই চাকরি করলে হতে পারতেন অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেলও। আজ তিনি রাস্তার কুকুর। কিন্তু শিল্পী হিসেবে তাঁর উদ্দেশ্য বাণিজ্য বা অর্থ নয়। শিল্পীর দায়িত্ব আছে সমাজের কাছে, জনগণের কাছে। তাঁর মতে, প্রতিবাদ করা শিল্পীর প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব।
সিনেমাকে তিনি বিনোদনের হাতিয়ার নয়, প্রতিবাদের ভাষা করতে চেয়েছেন। সস্তা জনপ্রিয়তার ধার ধারেননি আদৌ। মাত্র ৮টি পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি তাঁর। কিন্তু বিশ্বসিনেমায় তা দিয়ে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। কোনো প্রকার কম্প্রোমাইজ করেননি। তাঁকে বলা হয়েছিল, সুবর্ণরেখা গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ফেস্টিভ্যালে যাবে, শুধুমাত্র বেশ্যালয়ে রিফিউজি কলোনির মাতাল ভাইয়ের (বিন্দুমাত্র ধারণার বাইরে যে নিজের বোন সেখানে থাকতে পারে) বোনের ঘরে প্রথম খদ্দের হিসেবে যাওয়ার দৃশ্যটি বাদ দিতে হবে। রাজি হননি ঋত্বিক।
তাঁর মতে, শিল্পী সমাজের দাস। এই দাসত্ব স্বীকার করে সে ছবি করবে। তিনি সিনেমায় ‘জীবন ঘষে আগুন’ বের করতে চেয়েছেন। ‘আমার চরিত্ররা বলে, আমাকে বাঁচতে দাও। মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও সে বাঁচতে চায়—এত মৃত্যু নয়, জীবনেরই জয় ঘোষণা।’
তিনি নায়ক-নায়িকার পুতুপুতু করা সিনেমায় বিশ্বাসী নন। তিনি সেখানে বিপ্লবী। তিনি বলেন, ‘আমি প্রতি মুহূর্তে আপনাকে ধাক্কা দিয়ে বুঝাব যে, ইট ইজ নট এন ইমাজিনারি স্টোরি বা আমি আপনাকে সস্তা আনন্দ দিতে আসিনি। আমি আপনাকে হাতুড়ি মেরে বুঝাব যে, যা দেখছেন তা একটি কল্পিত ঘটনা। কিন্তু এর মধ্যে যেটা বোঝাতে চাইছি, আমার সেই থিসিসটি বুঝুন। .....যদি আপনি সচেতন হয়ে ওঠেন, ছবি দেখে বাইরের সেই সামাজিক বাধা, দুর্নীতি বদলের কাজে লিপ্ত হয়ে ওঠেন, আমার প্রচেষ্টাকে যদি আপনার মধ্যে চাপিয়ে দিতে পারি, তবেই শিল্পী হিসেবে আমার সার্থকতা।’
ঋত্বিক বলেন যে, চিত্রনির্মাতা দুই ধরনের—এক দল পরিচালক, আরেক দল স্রষ্টা। ‘আমি স্রষ্টার দলে।’
কিন্তু প্রচণ্ড জীবনমুখী, নির্লোভ, পূর্ণ কমিটেড শিল্পী নিজেই জীবনযুদ্ধে অকালে পরাজয় স্বীকার করে চলে গেলেন। নাকি যুক্তি, তক্কো আর গপ্পে নিজের গপ্প বলে, বিভিন্ন দ্বান্দ্বিকতার তক্কো হাজির করে, নিজের যুক্তি দিয়ে সুশীল লেখক সত্যজিৎ বসুকে (উৎপল দত্তের ভূমিকায়) দেওয়া ডায়ালগ—‘ভাবো, ভাবো, ভাবা প্র্যাকটিস করো’—এর ন্যায় অন্যদের বিষয়গুলো ভাবতে বলে তিনি শিল্পের দাসত্ব থেকে নিজে মুক্তি নিলেন? দায়ভার চাপিয়ে দিয়ে গেলেন জীবিতদের হাতে? কে জানে।বিজন ভট্টাচার্য ঋত্বিক নিয়ে তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘প্রচণ্ড এই প্রতিক্রিয়াশীলতার মাঝখানে ঋত্বিকের ছবিতে কিন্তু কোনো অবক্ষয়ের নজির নেই। শ্মশানের মাঝখানে বসে কাপালিক ঋত্বিককে কি আমরা আবিষ্কার করতে পেরেছি?’
অনেক সমালোচকের মুখে বারবার যে কথা শুনে আসছি—ঘটক শরণার্থী, দেশভাগ, কলোনির বাইরে বের হতে পারেননি। কিংবা বের হতে চাননি। অথচ ঘটকের অযান্ত্রিক সিনেমাটি বাংলা সিনেমার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এক্সপেরিমেন্টাল অ্যাপ্রোচ। একটা গাড়ি যে জীবন্ত ক্যারেক্টার হতে পারে, এই যে এক্সপেরিমেন্ট, ঘটক ছাড়া কেউ করার হিম্মত করেনি। হিম্মত কি ছাতার মাথা, কারও মাথায়ই ছিল না এসব। সবাই ওকে পাগলচোদা বলে এড়িয়ে গেছে।১৯৬২-তে নির্মিত সত্যজিৎ রায়ের অভিযান ও ১৯৭৬ সালে মার্টিন স্করসেস নির্মিত ট্যাক্সি ড্রাইভার—সিনেমা দুটিতে বেশ প্রভাব ঋত্বিকের অযান্ত্রিক-এর।আজকের দিনেও আমি অযান্ত্রিক নিয়ে খুব বেশি আলাপ দেখি না। সবাই বাকি সিনেমা নিয়ে একটু আধটু ইমোশন দেখালেও অযান্ত্রিক নিয়ে খুব কম আলাপ পেয়েছি। তুলনামূলক কম, আরকি। এই সিনেমাটি নিয়ে সামনে বিস্তারিত লিখব। এ টু জেড লিখব, অ্যানালাইসিস।অযান্ত্রিক বাংলা সিনেমায় নতুন এক দিগন্ত উন্মোচনের প্রথম দিককার অ্যাপ্রোচ। ঋত্বিক নিয়ে এই প্রজন্মের তেমন একটা উৎসাহ দেখি না। খুবই সেন্টিমেন্টাল আমরা, অথচ আমরা লোক চিনি না।
কদিন আগে ব্রাত্য রাইসু নামে একজন বুদ্ধিজীবী ঘটকসহ আরও দুজন ফিল্মমেকারকে মিডলক্লাস কালচারের বলে ডিনাই করে দিলেন। আমি এসব বুদ্ধিজীবীকে খুব বেশি পাত্তা দিই না। সবগুলো পরজীবী। সবগুলো নিজেকে অ্যানার্কিস্ট দাবি করে বাটপারি করে। চিন্তার সাথে বাটপারি।যাই হোক, ঘটককে ডিনাই করে দেওয়ার ভীষণ পক্ষে আমি। তিনি আমাদের কোণঠাসা, কারাগার থেকে উদ্ধার করতে চেয়েছিলেন; পরিশেষ দৃশ্য অবধি তিনি জীবিত থেকেছেন, যেন অন্য কেউ নয়, এই বাঙালিরাই নিজেদের, বাঙালিদের শেষ করে দেয়।এই যে লেংটা করে দেওয়ার অ্যাপ্রোচ, তা কিন্তু খুব ভয়ঙ্কর। ফলে আমাদের বিদ্যমান এলিট বুদ্ধিজীবী (আমি সবাইকে এলিট বুদ্ধিজীবী হিসেবে কাউন্ট করি। জনগণের বুদ্ধিজীবী কোন শুয়োরের বাচ্চা?) যেহেতু লেংটা হতে ভয় পায়, সেহেতু তারা সবার প্রথমে খুঁজে বের করে কারা ওদের লেংটা করার অ্যাপ্রোচ নিয়েছে। তাদের ডিনাই করার জন্য উঠে-পড়ে চেষ্টা করেন।তারপর শেষমেশ স্থির হন, যখন দেখেন ডিনাই করতে গিয়ে লেংটা তো হয়েছেনই, সাথে কাঁচা গু সারা গায়ে। তখন চুপসে যান।এটাই বাস্তবতা।আমি আবার তাদের এই যে ডিনাই করার প্রবনতাকে খুব পজিটিভলি নিই।
একাধিকবার স্বল্প সময়ের জন্য মানসিক ভারসাম্য হারানো ঋত্বিক ঘটক পুরোপুরি বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়েন শেষ ছবি যুক্তিতক্ক আর গপ্পোর পর। চিকিৎসার জন্য তাঁকে ভর্তি করা হয় মানসিক হাসপাতালে। স্মৃতি হারানো ঋত্বিক পরিবার-পরিজন আর শুভাকাঙ্ক্ষীদের চিনতে পারতেন। জটিল সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ায় মাঝেমধ্যেই মারমুখী হয়ে উঠতে থাকেন। জীবনের শেষ দিনগুলো তাঁকে কাটাতে হয়েছে হাসপাতালের নির্জন প্রকোষ্ঠে। সীমাহীন অসহায়ত্ব। ঋত্বিক মারা যাচ্ছেন, দেখ তোরা। পিপলস আর্টিস্ট চলে যাচ্ছে। আর কে কথা বলবে? আর কে রইল?এমনকি মৃত্যুর সময় পাশে থাকতে পারেননি সুরমা ঘটক। পাশে ছিলেন বন্ধু, বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার মৃণাল সেন। ঋত্বিক ঘটকের মৃত্যুর পর মৃণাল সেন সুরমা ঘটককে টেলিগ্রাম করেন, ‘Ritwik Ghatak expired’।
ঋত্বিক ঘটকের মৃত্যুর ঠিক পরে লেখা একটি কবিতায় শক্তি চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন, ‘… আর কেউ নেই যে কড়কাবে/বিদ্যুচ্চাবুকে এই মধ্যবিত্তি, সম্পদ, সন্তোষ/মানুষের, তুমি গেছ, স্পর্ধা গেছে, বিনয় এসেছে।’
ঋত্বিকও কোলাপস করে গেলো।একটি যাত্রার শেষ হলো।বেঁচে থাকার সময়ে লাথি-ঝাঁটা ছাড়া তাঁর কপালে বিশেষ কিছু জোটেনি৷ বিরক্ত, কিচ্ছু করতে না পারার অসহায়তা এবং কিছু একটা বলতে চাওয়ার অদম্য ইচ্ছায় তাঁর বন্ধু হয়ে গিয়েছিল মদ আর এই পোড়া দেশ।
(ঋত্বিক ঘটক নিয়ে বিস্তারিত লিখব শিগগিরই।বিশেষ করে তার চলচ্চিত্র নিয়ে আমার এ্যানালাইসিস।আগেই বলে নিয়েছি ঋত্বিক ঘটক নিয়ে আলাপে আমি খুব ষেনটিমেনটাল।আবার ওকে আমার চেয়ে ভালো ভাঙতে কে পারে?)