পর্ব-১
আইরিন কে সাজিয়ে দিচ্ছে তার ভাবি সুমি।
দ্রুত হাত চালাতে গিয়ে কাজ এগুনোর চেয়ে ভুল হচ্ছে বেশি। চুল বাঁধতে হয়েছে এই নিয়ে তিনবার। চোখে আইলাইনার দিতে গিয়ে হাতের কম্পনে বারবার এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।
শ্বাশুড়ি র বকাঝকার ভয়ে তটস্থ হয়ে আছে সুমি। সাজ শুরু করার পাঁচ মিনিট পরে একবার এসে বলেছে," দ্রুত করো সুমি। পাত্র পক্ষ এসেই গেলো। তোমাকে দিয়ে যদি একটা কাজও ঠিকঠাক হয়!"
তার পাঁচ মিনিট পরে আবার এসে তাড়া দিলো।
আইরিনের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে বললো, " মুখটা অমন ফুলিয়ে রেখেছিস কেন? চোখে-মুখে হাসিটা টেনে রাখতে হবে। "
আইরিনের দমবন্ধ লাগছে। এভাবে আর কতক্ষণ পারা যায়! '
-ভাবি আর কতক্ষণ? এবার শেষ করো প্লিজ।
-এই তো হয়ে গেছে, শুধু শাড়ির কুচি টা ঠিক করা বাকি।
উজ্জ্বল শ্যামলা মায়াবী চেহারা আইরিনের। মেকাপ ছাড়াও যে কারো চোখে পড়ার মতো। এবার ইন্টারমিডিয়েট ফাইনাল দিবে। শান্ত,কোমল, নম্র স্বভাবের মেয়ে। বাবা আশরাফ রহমানের খুব আদরের। মায়ের আদর টা ঠিক বুঝতে পারে না আইরিন । মা মেহরুনন্নেছা আদরের চেয়ে শাসন টা ই বেশি করেন।
তারা চার ভাই বোন। ভাই দু'জন বড়। বড় ভাই সোহেল বিদেশে থাকে। বিয়ে করেছে চার বছর। মেজ ভাই বোরহান বাবার সাথে দোকান করে। আর আইরিনের ছোট বোন তাঁহা। সবার ছোট হওয়ায় সে যেমন আদরের তেমনি হয়েছে বাঁদর। এমন কোনো দুষ্টুমি নেই যা এই বাড়ির তাঁহা মনি করে না।
ভাবি সুমি -আইরিন কে নিয়ে পাত্র পক্ষের সামনে এলো।
সালাম দেওয়ার পর পাত্রের বড় ভাবি আইরিন কে হাত ধরে বসালেন। ঠুকঠাকঃ কিছু প্রশ্ন করছেন ; যার উত্তর আইরিন খুবই সাবলীল এবং কোমল গলায় দিলো।
"জনি ভাই, চলো না বাইরে যায়। তোমার সাইকেলে চড়াবে চলো,,। " তাঁহা মনির এমন উচ্ছ্বসিত কান্ডে সবাই সেদিকে তাকালো। সবার মতো আইরিন ও তাকালো।
সঙ্গে সঙ্গে ই বুকটা ধুকধুক করে উঠলো। জনি ভাই!
জনি ভাই এখানে কি করছে। কেন এসেছে। কখন এসেছে। যখন তখন এসে পড়বে। এখানে কেন আসতে হবে তার? আপন মামাতো ভাই তো না। মায়ের চাচাতো ভাইয়ের চাচাতো মামাতো ভাই।
এ বাড়িতে তার এত কিসের কাজ? আর এই তাঁহা মনিকে একটা থাপ্পড় দিতেই হবে আজকে ।
সেদিনের ঘটনার পর জনি ভাইয়ের সামনে পড়েনি আইরিন। লজ্জা, ভয়,সংকোচে সবসময় তটস্থ থাকতো। তাই আজ তার সামনে পড়ে গজগজ করছে মনে মনে।
জনি মিজবা। সম্পর্কে আইরিনর মামাতো
ভাই। আপন নয় দূর সম্পর্কের মামাতো ভাই।
মাঝে মাঝে এই বাড়িতে আসে। মা,বড় ভাইদের সাথে গল্প করে চলে যায়।
কাওকে না পেলে তাঁহা মনির সাথে সময় কাটায়।
আইরিন এমনিতেই কম কথা বলে তারউপর সেদিনের ঘটনার পর একদমই কথা বলে না।
সেদিনে বিকেলে বাড়িতে কেউ ছিলো না। সবাই একটা দাওয়াতে গিয়েছে। আইরিন লোকসমাগমে যেতে কম পছন্দ করে তাই যায়নি। তার এই স্বভাব সবার জানা তাই কেউ জোরও করেনা।
সেদিন হঠাৎ করে ই জনি ভাই আসলো। গ্রীষ্মের তাপদাহে অতিষ্ঠ জনজীবন। হঠাৎ ঝড়ো হাওয়া শুরু হল। গ্রীষ্মকালে এভাবে হুটহাট ঝড়-ঝাপটা, বৃষ্টি নতুন নয়। আইরিন দৌড়ে ঘর থেকে বের হলো। বাতাসে স্বস্তি লাগছে একটু। বাড়ির আঙ্গিনায় একটা বেলি ফুলের গাছ। অনেক পুরনো। কত পুরনো আইরিন নিজেও জানে না। শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে ছিটিয়ে একবারে জঙ্গলের মতো অবস্থা। প্রতিদিন অসংখ্য ফুল ফোটে। বাড়ির আনাচকানাচে এই ফুলের সুভাস ; রাতে তো কথায় নেই!
আইরিন নিচে পড়ে যাওয়া কিছু বেলী ফুল কুড়িয়ে নিচ্ছিলো। বেশ কিছু ফুল হওয়াতে ওড়নার এক প্রান্তে নিলো।
জনি ভাই এসে সেখান থেকে একটি ফুল নিয়ে টুপ করেই আইরিনের চুলে গুঁজে দিলো। অজানা আতঙ্কে, দ্বিধায় অস্থির হয়ে উঠলো আইরিন।
এটা কি হলো!
দ্রুত দরজা খুলে ঢুকে যেতে চেয়ে বাঁধলো আরেক বিপত্তি। ভিতর থেকে দরজা লক পড়ে গেছে। একটা চাবি ভিতরে, আরেকটা এক্সট্রা চাবি আছে যেটা মায়ের কাছে থাকে। ভিতরে ঢুকার আর কোনো উপায়ও নেই। এদিকে ঝড়ো হাওয়ার সাথে বৃষ্টি ও শুরু হয়েছে।
নিরুপায় আইরিন ঘরের সামনের সিড়ি তে বসে রইলো। ভয়,লজ্জা সব তাকে ঘিরে ধরেছে।
তার এই হাঁসফাঁশ করা দেখে মুচকি মুচকি হাসছে জনি মেজবা । হঠাৎ এসে ওড়নার কোণায় ধরে রাখা সব বেলী ফুল নিজের হাতে নিয়ে নিলো ।
পাশের কলাগাছের আঁশ নিয়ে কেমনে কেমনে ফুলগুলো মালা গাঁথা শুরু করলো।
আইরিন নিরবে ক্লান্তিতে ভরা চোখে তাকিয়ে আছে। চোখে মুখে বিরক্তি, অবাক, ভয়!
মালা গাঁথা শেষ হলে মালাটি আইরিনের হাতে দিয়ে বললো,
" রেখো প্রিয় আদরে,যদি এতটুকু মনে ধরে।
রেখো দিয়ো যতনে, যদি কখনো হঠাৎ মনে পড়ে।"
তারপর দ্রুত সেখান থেকে চলে গেলো।
বাকরুদ্ধ আইরিন সেই চলে যাওয়ার পানে চেয়ে রইলো।
গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিতে শুভ্র শার্ট পরহিত একজন প্যান্টের পকেটে হাত দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। আরেক হাতে মাঝে মাঝে চুলে জমা বৃষ্টির ফোঁটা সরিয়ে দিচ্ছে। না দৌঁড়াচ্ছে,না স্বাভাবিক হাঁটছে।
এই দৃশ্য টা কেমন যেন কাল্পনিক চরিত্রের মতো সুন্দর লাগলো আইরিনের। হাতে মোবাইল থাকলে একটা ছবি তোলে রাখা যেতো।
আনমনে হাতের দিখে তাকিয়ে বেলিফুলের মালাটা দেখে অদ্ভুত অস্বস্তি অনুভব হলো। না খারাপ লাগা,না ভালো লাগা। এমন অস্থির অনুভূতির কারণ বুঝে আসছে না। বেলীফুলের তীব্র সুঘ্রাণ রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে যাচ্ছে।
মস্তিষ্কে বিচরণ করছে অন্য কেমন উপলব্ধি। অজানা কোনো সুুর। অজানা অসুখ। অজানা টান। বুকের বা'পাশে চিনচিনে মৃদু এক ব্যথা।
মাঝরাতে প্রচন্ড জ্বরে ঘুম ভেঙে গেলো আইরিনের। শরীর কাঁপছে। খুব ঠান্ডা লাগছে। বাইরে তখন অঝোরে বৃষ্টি। বালিশের নিচে রাখা বেলীফুল গুলোর সাদা রঙে ধূসর দাগ এসেছে, তবে সুগন্ধি এতটুকু ও কমেনি। বরং এই রাতের বেলা গন্ধ টা আরো তীব্র হলো। লাইট জ্বালাতে গিয়ে বুঝলো বিদ্যুৎ নেই।
তৃষ্ণা পেয়েছে কিন্তু রুমে পানি নেই। হাতড়িয়ে পাশে থাকা তাঁহা কে ডাকলো।
" তাঁহা মনি, বোন শুনছিস, ওঠনা একটু।আমার খুব জ্বর এসেছে। একটু পানি এনে দেয় না। খুব তৃষ্ণা পেয়েছে। " দিচ্ছি বলে ঘুুম কাতুরে তাঁহা আবার ঘুমিয়ে পড়লো।
পুনরায় ডেকে তুলতে মায়া হলো আইরিনের।
কোনো রকমে মোবাইল টা খোঁজে নিলো। মোবাইলের লাইট জ্বালিয়ে পানি খেলো।
তারপর লাইট টা জ্বালিয়ে রেখেই ঘুমানোর চেষ্টা করলো।
আইরিনের মা মেহরুনন্নেছা ঘুম ভেঙে মেয়ের রুমে আলো জ্বলতে দেখে উঁকি দিলো। ঘুঙ্গানির শব্দে ভ্রু কুঁচকে ঘরে ঢুকলো। আইরিন কে কাচুমাচু করতে দেখে গায়ে হাত দিলো।
মেয়ের শরীরের তাপমাত্রা বুঝে ভয় পেয়ে গেলেন। " আইরিন,মা তোর তো অনেক জ্বর। কখন থেকে উঠলো? আমাকে তো বলিস নাই। "
প্রায় অচেতন আইরিন অস্পষ্ট স্বরে কিসব বলছে আর কাঁপছে।
মেহরুনন্নেছা সারারাত মেয়েকে জলপট্টি দিলেন, পাশে বসে রইলেন। সকালে প্রায় কাঁদতে কাঁদতে ডাক্তার কে কল দিলেন।
---------------------------------------
পাত্র পক্ষের পাত্রী পছন্দ হলো। তারা কথা আগানোর অনুরোধ করলো।
আশরাফ রহমান সময় চাইলেন।-হুট করে তো এভাবে হয়না ভাইজান। আপনাদের ভালো লেগেছে, এবার আমরাও একটু খোঁজ খবর নিই।দুপক্ষের চেনা জানা হোক।বিয়ে শাদির ব্যাপার বোঝেনই তো।
-চেনা জানার আবার কি আছে। আমার বোন কি খারাপ পাত্র দেখাই দিবে? আমার বোনের বাসুরের ছেলে,,এইটুকু পরিচয় কি যথেষ্ট নয় সোহানের বাবা? আমার বোনের উপর কি কোনো ভরসা নেই আপনার? তারপর কানের কাছে গিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল- ছেলের বাবার অনেক সহায়-সম্পত্তি সেটা তো আপনি জানেনই।আরে আপনার মেয়ের পাঁচ কপাল যে এতো বড় ঘর থেকে প্রস্তাব এসেছে। আমার তো বুঝেই আসেনা আমার মেয়ে কে কি দেখে তাঁরা পছন্দ করল! যাক,,সুভাগ্য যখন নিজে থেকে এসে ধরা দিয়েছে এই সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না কোনো ভাবেই।
বউয়ের ধারালো কথায় সবসময়ের মতো নির্বিক আশরাফ রহমান।
উনার উত্তর কে উপেক্ষা করেই ; পাত্র পক্ষের দিকে চেয়ে মেহেরুনন্নেছা বললেন -আমরা রাজি। আপনারা বাকি কথা আগাতে পারেন।
-তাহলে আগামী শুক্রবার ছোট পরিসরে বিয়ে টা পড়িয়ে ফেলি নিজেদের মধ্যে। আর আমাদের কোনো চাওয়া পাওয়া নেই। আমরাই সবকিছু দিয়ে মেয়েকে সাজিয়ে নিয়ে যাবো।
মনে মনে খুশির শ্বাস ফেললেন মেহেরুনন্নেছা- তার মেয়ের সত্যি ই রাজকপাল।
শুক্রবার বিয়ে! ভয়ে আঁতকে উঠল আইরিন। চেনা নেই, জানা নেই হুট করে একেবারে বিয়ে। যার সাথে বিয়ে হবে তাকে চোখের দেখাও দেখেনি।তাছাড়া পড়াশোনা শেষ করতে চাই সে।
মায়ের কথায় এই বাড়িতে শেষ কথা। তার কথার উপর টু শব্দ করার সাহস কারো নাই। তার উপর সেই দিন থেকে তো নিয়ম করে তিনবার তাদের সহায়-সম্পত্তির বর্ণনা শুনান।
বিয়ের পর একবার গিয়েছিলাম । তাদের এই আছে, সেই আছে,,।শুধু কি নেই বল?
শুনতে শুনতে সবাই বিরক্ত!
মা উঁচু গলায় কথা বলছে।ঠিক কথা না খুব জোরে জোরে কাওকে গালি দিচ্ছে ।অবশ্য এই বাড়িতে এটা নতুন না। আইরিন ধীরে উঠে সেদিকে গেলো।
-জনির সাহস কি করে হয় আমার মেয়েকে বিয়ে করার। দুটো ভালো কথা বলি, বসতে বলি বলে,, কি ভেবেছে নিজেকে।আমার মেয়ের যোগ্য!
আইরিনের আর পা বাড়ানোর সাহস হলো না।সেখান থেকেই রুমে চলে আসে।
বিশাল কামরার এক কোণে গুটি-শুটি মেরে বসে আছে আইরিন । একটা রুম এতো বড় হতে পারে তা আইরিনের ধারনার রূপরেখায়ও ছিলো না কখনো। সাজানো-পরিপাটি। এই সৌন্দর্য কে আরো বেশি বাড়িয়ে দিয়েছে রোমের সাথে সংযুক্ত বারান্দা। চারপাশে চোখ বুলিয়ে আইরিনের কেবলি মনে হচ্ছে ভ্রম। এ যেন প্রকাণ্ড এক রাজপ্রাসাদ! সিনেমার মতো পরিপাটি সবকিছু।
আইরিনের সর্বাঙ্গে ঝলমলে গহনা, পরণে ঝকঝকে জামদানী শাড়ি। বিস্ময়ে,রাগে,ভয়ে ছোট ছোট নিশ্বাস ফেলছে আর শুনছে ঘরের বাইরে বড় লোক বাড়ির প্রকাণ্ড সংসারের কলরব। আমন্ত্রিত অতিথিদের হৈচৈ, আনন্দ।
আরো কিছুক্ষণ পর পাঞ্জাবি পরিহিত একজন ঘরে ঢুকলো। তার বর হবে হয়তো।
ঢুকেই পাঞ্জাবি খোলে শুয়ে পড়ল ধপাস করে। আইরিনের দিকে ফিরে ও তাকাল না।
তারপর উঠে এক পলক চেয়ে বলল- আরে তুই তো ভালোই সুন্দর। নে উঠে প্রস্তুত হ,আমি দুই মিনিট পরে আসছি।
কিসের প্রস্তুতি বুঝলোনা আইরিন। তারউপর এই ব্যবহার,,! বুক ফেটে কান্না এলো আইরিনের।
দুই মিনিটের আগেই ফিরে এলো।হাতে কয়েকটা বোতল। নাটক-সিনেমায় দেখা সেই মদের বোতলের মতো। সেগুলো নিয়ে সোফায় আরাম করে বসলো।
আইরিন কে ডাকল।আইরিন নিষ্পলক চেয়ে আছে।
-আসতে বলেছি না? ভয়ংকর কন্ঠস্বরের সাথে সাথেই আইরিন উঠে গেলো।
-এই পানীয় টা আমি প্রতিদিন খাই।আর আজকের পর থেকে এটা বানিয়ে দিবি তুই। মনোযোগ দিয়ে দেখ কোনটার সাথে কোন টা মিশাই,কতটুকু দিই।কোনো হেরফের হলে কিন্তু খবর আছে।
আইরিনের মূর্চ্ছা যাওয়ার উপক্রম। তার জন্য আরো কি কি অপেক্ষা করছে আল্লাহ ই জানেন।
ইচ্ছে মতো সেসব খেয়ে টলতে টলতে আইরিনের উপর জোর করা শুরু করলো। পৈশাচিক অধিকার জাহির করলো।
পরদিন সকালে খুব স্বাভাবিক আচরণ। ওষুধ, কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস আর ফলমূল এনে দিলো।আইরিন একবারও চোখ তুলে তাকায়নি। তার চোখ বেয়ে অঝোরে জল পড়ছে। একটা মেয়ে এসে তাকে হাতে ধরে রান্না ঘরে নিয়ে গেলো। তার ননদ হবে সম্ভবত। বাড়ির সবাই একদম স্বাভাবিক। বরং সবাই তার প্রতি একটু বেশি যত্ন দেখাচ্ছে।
পরদিন রান্না ঘরের পাশের দরজায় দাঁড়িয়েছিল।পাশেই ভাবি। এই বাড়ির বড় বউ।
হঠাৎ লোকটা আসলো। জিশান যার নাম।
প্রচন্ড ব্যথায় গলা ফাটিয়ে চিৎকার দিলো আইরিন। ব্যথার যায়গা থেকে হাত সরাতেই দেখলো টলটলে তাজা লাল রক্ত। লোকটা আকস্মিক তাকে কামড় দিয়ে চলে যাচ্ছে। বড় ভাবি খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ই বসিয়ে একটা ক্রিম লাগিয়ে দিল।
মুখে কোনো কথা নেই।
এ কোন জগতে এসে পড়েছে সে!
তখনই বাইরের উঠানে হইচই। কোনো এক ফেরিওয়ালা নাকি ভিতরের ঘরে দাওয়া পর্যন্ত এসেছে। সম্ভবত একটু আগে ঘটে যাওয়া কান্ড ও দেখে ফেলেছে।
-লোকটা কে মেরেই ফেলবে আজ।ক্রিম লাগিয়ে দিতে দিতে বলল বড় ভাবি।
আইরিন বাড়িতে কল করার সুযোগ খোঁজছে। তার কাছে মোবাইল নেই। বিয়ের আগেই নাকি এই বাড়ি থেকে বলে দিয়েছে বাড়ির বউ মোবাইল ইউস করতে পারবে না। কোনো দরকারে স্বামী-শ্বশুরের মোবাইল তো আছেই!
শরীরের ব্যথা আর গালের ব্যথায় জ্বর এলো আইরিনের। রাতে লোকটা চুপচাপ এসে পাশে শুয়ে পড়লো। কোনো কথা বললো না। আইরিনের গায়ের উপর একটা হাত দিয়ে ঘুমিয়ে গেলো।
এতো কষ্টের মাঝেও আইরিন অল্প একটু তাকে নিয়ে পজেটিভ চিন্তা করলো। হয়তো গল্পের মতো তার জীবনে ও কোনো দূর্ঘটনা ঘটেছে তাই এমন অদ্ভুত আচরণ।
সকালে সাহস করে মোবাইল চাইলো-আপনার মোবাইল টা দিন বাড়িতে একটু কথা বলবো।
জিশান নিজেই কল ডায়াল করলো। রিসিভ হতেই লাউডস্পিকার অন করে মোবাইল এগিয়ে দিলো।
ফিসফিস করে বললো- আমাকে নিয়ে টু শব্দ ও বলা যাবে না।
দুপুরের দিকে আশেপাশের কয়েকজন বউ দেখতে এসেছে। বড় ভাবি আর আইরিন ছাড়া বাড়িতে কেউ নেই। মেয়ে গুলো কথায় কথায় বললো - জিসান পাগলার এতো সুন্দর বউ। ভাবা যায়? সব সম্পত্তির লোভ!
আইরিনের মাথায় আসছে না ব্যাপার টা। পাগল মানে!
সে ভেবেছিল বড় লোকের ছেলে তাই খারাপ জিনিস খায়।কিন্তু,,?
সেদিন সন্ধ্যার পরপরই জিসান ঘরে এলো। সবার সামনে থেকে হাত ধরে টেনে আইরিন কে রুমে নিয়ে এলো। দরজা লাগিয়ে একটা পোশাক এগিয়ে ধরলো -ঝটপট এই কাপড় টা পড়ে নাও।
বিস্মিত আইরিন কাপড় দেখে আরো অবাক হলো।খুবই ছোট কাপড়। যেমন লম্বায় ছোট তেমনি পাশে।এগুলো সে পড়বে!
-পড়ে নিতে বলেছি না? আরেক বার বলতে হলে মাথা ফাটিয়ে দেবো।
ভয়ার্ত দানবদের মতো শুনালো কথাগুলো।
আইরিন ওয়াসরুমে ঢুকে কোনো রকম পড়লো। পড়ে তার নিজের কাছে ই খুব বাজে লাগছে। এমন কাপড় পড়ে সে অন্য কারো সামনে কি করে যাবে। না মরে গেলেও না।
ভিতর থেকে চিৎকার আসছে বের হওয়ার। আইরিন অনড়।
খুব জোরে কিছু একটা ভাঙার শব্দ হলো।
দুই হাতে শরীর ঢাকার বৃথা চেষ্টা করে কাঁপতে কাঁপতে সামনে এসে দাঁড়ালো আইরিন।
লোকটা বাঁকা হেসে গান ছেড়ে দিলো। কেমন বাজে সুরের গান। জীবনে এমন গান কোথাও শুনেনি আইরিন।
- এবার পায়ে ঝুমুর গুলো পড়ে নাও। শান্ত, দৃঢ় কন্ঠে বলল জিসান।
নৃত্য যারা করে তাদের পায়ে দেখেছে সে এগুলো। সে কেন এসব পড়বে?
তার ভাবনার মাঝে আবার হুঙ্কার।
ভয়ে ভয়ে দ্রুত পড়ে নিলো।
তারপর যা শুনলো আইরিনের এতটুকু বাঁচতে ইচ্ছে হলোনা।
-নাচ শুরু করো।
তাকে কি নর্তকী ভেবেছে এই লোক? নোংরামি র একটা সীমা আছে। ভয় দেখিয়ে যা খুশি করিয়ে নিবে।যথেষ্ট হয়েছে, আর নয়। মরে গেলেও সে আর এই লোকের কোনো কথা শুনবে না।
আইরিন কাপড় চেইঞ্জ করে নিলো।এরমধ্যে বহু হুঙ্কার, ডাক, ভাঙাচোরের শব্দ এসেছে আইরিন পাত্তা দেয়নি। আইরিন ওয়াশরুম থেকে বের হতেই খপ করে তার চুলের মুটি ধরে মেঝেতে ধাক্কা দিলো।
মাথা গিয়ে টেকলো খাটের কোনায়। প্রচন্ড ব্যথায় কুঁকড়ে গেলো আইরিন। তার মধ্যে ই ধপাধপ্ লাথি,ঘুষি পড়ছে। জ্ঞান হারালো আইরিন।
পরদিন সকালে ডাক্তার এনেছে আইরিনের শ্বশুর। তাদের ফ্যামিলি ডাক্তার। যা ঘটছে তাতে এই বাড়ির সবাই নির্বিকার। যেন সব স্বাভাবিক আর তাঁরা অভ্যস্ত।
আইরিন সুযোগের অপেক্ষায় থাকলো।বাড়িতে সব জানাতে হবে। যে করেই হোক এখান থেকে বের হতে হবে।
আইরিনের খালা মনুজা কে দেখে যেন বুকে পানি এলো আইরিনের। মনুজা এসেছে আইরিনের শ্বশুর বাড়ি। মোবাইলে কিছু বলার সুযোগ তো পাচ্ছে না। খালা কে বললে কিছু একটা উপায় ঠিক বের হবে। তাছাড়া তার এই বিয়ের সবকিছু তো তার খালা ই এগিয়েছে। খালা নিশ্চয় জানতো না এরা এমন। জানলে কি এমন ছেলের সাথে বিয়ে দিতো!
খালা কে সব বলতে হবে।
আইরিন দৌড়ে গিয়ে খালা কে জড়িয়ে ধরল। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো ।
মনুজা তেমন কিছু বললেন না। আইরিন কে কিছু সময় কাঁদার সুযোগ দিয়ে হাত ধরে পাশের সোফায় বসালেন। নিজেও বসলেন।
শরীরের অন্য কোনো আঘাতের চিহ্ন দেখা না গেলেও গালের কামড়ের দাগ আর কপালের পাশের ব্যান্ডেজ স্পষ্ট। মনুজা আইরিনের গালে হাত রেখে বললেন - এমন অবাধ্য হলে হয় মা? জিসান বড় লোক ঘরের ছেলে তাদের স্বভাব, আচার আচরণ আমাদের সাথে মিলবে না এটাই স্বাভাবিক। তুই, আমি তোর মা মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে। আমরা জগতের অনেক কিছুই জানি না, বুঝি না। তোর মায়েরও বিয়ে হয়েছে গ্রামের মধ্যবিত্ত পরিবারে তাই তারও সুযোগ হয়নি বড় লোকদের সাথে মেশার। আর এই যে আমাকে দেখ?
আমি কি এই জীবনে কম সহ্য করেছি বল?
যে সয়,সে রয়। বুঝলি?
তোকে আরো ধৈর্য্যশীল হতে হবে। দেখবি আসতে আসতে সব অভ্যেস হয়ে যাবে। জিসান ছেলেটা অন্য রকম একটু।কিন্তু কোনো কিছুর অভাব জীবনে ও বুঝতে পারবি না। তাছাড়া ছেলেদের অল্প একটু বদ অভ্যেস থাকা এমন দোষের কিছু না।
মনুজার কথায় আইরিন চুপচাপ চেয়ে আছে। সে তার খালা কে দেখছে। খালার গলায়,হাতে, কানে, আঙ্গুলে নতুন গয়না। যেমন সুন্দর ভরাট ডিজাইন তেমনি নতুন চকচকে রঙ। খালার অনেক গয়না আছে জানে। কিন্তু এগুলো সে আগে কখনো দেখেনি।মনে হচ্ছে নতুন গড়িয়েছে। কিন্তু একসাথে এতো গুলো গয়না কীভাবে? স্বর্ণের যা দাম! তাছাড়া খালাদের অবস্থা এতটাও ভালো না।
গয়নার চিন্তা বাদ দিয়ে সে আবার তার খালাকে বলল- মাকে একটা কল দাও না। খুব কথা বলতে ইচ্ছে করছে।
মনুজা মোবাইল বের করলেন। মোবাইল হাতে দেওয়ার আগে সতর্ক করে বললেন - খবরদার আইরিন এখানকার কোনো কথা বলবি না। যে-ই মেয়ে শ্বশুর বাড়ির কথা বাবার বাড়ি লাগায় সে আর যায় হোক সংসার করতে পারেনা। তাছাড়া তোর মায়ের আছে পেসার। এসব অবান্তর কথা বলে,ন্যাকা কান্না করে তোর মার শরীর খারাপ করবি না।
মেয়েদের শুধু বিয়ে করলে হয় না,মানিয়ে ও নিতে হয়।
ছলছল চোখে আইরিন মা'কে কল দিলো। সবার খোঁজ খবর নিলো। তারপর আস্তে করে বলল- মা তোমাকে আমার অনেক কিছু বলার আছে। তুমি মানুষ চিনতে পারোনি।ওরা,,
চট করে মনুজা মোবাইল কেড়ে নিলো- দেখলি আপা? তোর মেয়ের কান্ড। তুই তো এমন ন্যাকা না।তোর মতো কঠিন মানুষের মেয়ে এমন ন্যাকা হলো কীভাবে। শ্বশুর বাড়ি আসতে না আসতেই নালিশ শুরু করেছে তোর মেয়ে। স্বামী আদর করে মুখে কামড় দিয়েছে সেটা পর্যন্ত দোষ ধরতেছে।স্বামীর দেখতে ইচ্ছে হয়েছে বউ কে ছোট ড্রেসে। আজকালকার ছেলে ইচ্ছে করতেই পারে। নিজের বিয়ে করা বউকেই তো দেখছে, পরকীয়া তো না।
কিন্তু তা নিয়ে তোর মেয়ে জেদ করতে গিয়েছে। স্বামী অভিমান করে সরাতে গেলে পড়ে গিয়ে কপালে ব্যথা পেয়েছে। সেই খবর এখন তোকে বলতে চাচ্ছে,,।
এই মেয়ে সংসার কীভাবে করবে বল তো আপা?
কই আমরা ও তো বিয়ে করেছি, আমরা কি কখনো বাবার বাড়ি এসব বলে জ্বালিয়েছি? স্বামী-স্ত্রীর কথা কাপড়ের মধ্যে থাকতে হয় এই মেয়ে কি তা জানেনা। কি নির্লজ্জ মেয়ে!
শুন আপা,মেয়ের কথায় কান দিবি না।তাহলে সর্বনাশ হবে। তোর মেয়ের হাবভাব ভালো ঠেকছে না। নাহয় স্বামী র কোনো কিছু ই তার সহ্য না হওয়ার কথা না। আচ্ছা আপা,আইরিনের কি কারো সাথে কোনো সম্পর্ক বা পছন্দ টছন্দ ছিলো?
মেহুরোনন্নেছার হুট করে জনির কথা মনে পড়লো।এই ছেলে এখন আর এই বাড়িতে আসে না। বিয়েতেও আসেনি। আশরাফ তো বললো- সেদিন রাস্তার মোড়ে পাগলের মতো বসে আছে।
সব মিলিয়ে ভাবতেই ভয়ে বুক কেঁপে উঠলো তার।
এই জন্য ই তার মেয়ে স্বামীর আদর সোহাগ পর্যন্ত মেনে নিতে পারছে না। নিশ্চয় জনির সাথে কোনো সম্পর্ক ছিল। এতো দিন কিছু বলে না কিন্তু বিয়ের কথা উঠতে ই বিয়ের প্রস্তাব দিলো। এ-ই তো দুইয়ে দুইয়ে চার মিলে যাচ্ছে।
-কি হলো আপা,চুপ করে আসিস কেন?
- কিছু না মনুজা। আচ্ছা শুন, আইরিন কে একটু বুঝিয়ে বল।ছোট মানুষ বুঝতে পারছে না। ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে যাবে। আমরা দুই একদিনের মধ্যে আসতে চাইছিলাম। কি বলিস আসবো?
-একদম না আপা,তোরা এখন আসিস না।আগে তোর মেয়ে সবকিছু মানিয়ে নিক। সংসারে মনোযোগ দিক।
আইরিন তার খালার কথায় শুধু যে অবাক হয়েছে তা নয়,বরং সে অনেক কিছু ই বুঝতে পারছে। তার সরল মস্তিষ্কে হঠাৎ জটিল জটিল অংক ঘুরছে।অনেক কিছু,,। সে যা বুঝলো তার খালা সব জানে।আর জেনেশুনেই এখানে বিয়ে দিয়েছে। তাও নিজের বোনের মেয়েকে।এখন আবার তার মাকে সবকিছুর ভুল ব্যাখ্যা দিচ্ছে। লজ্জায় ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিল আইরিন।
কোন খেলায় নেমেছে খালা? তবে কি,,!
মনুজা চলে যাওয়ার জন্য উঠলো। আইরিন তেমনি বসে রইল। ফিরেও তাকাল না।
মনুজা তার কানের কাছে এসে বলল- আজকে খালা কে সহ্য না হলেও একদিন ঠিক হবে। যেদিন এই সমস্ত সম্পত্তির মালিক তুই হবি। এ-তো এ-তো সম্পত্তির একমাত্র মালিক জিসান। । যদি এই সংসার টা করতে পারিস তবে সবকিছুর মালকিন তুই। আরে দাঁতে দাঁত চেপে কয়েকটা সন্তান জন্ম দিলেই তো উত্তরাধিকারী চলে আসে !
জিসানের নানা-নানির একমাত্র মেয়ে তোর শ্বাশুড়ি। সে-তো বেঁচে নেই। স্বাভাবিক ভাবেই সবকিছু জিসানের।
আর ঐ যে বড় ভাই টা? আরে সে তো পালক সন্তান। সন্তান হচ্ছিল না বলেই তাকে এনেছিল। তারপরই কোল জুড়ে এলো জিসান। এই রাজত্বের একমাত্র রাজা। আর রাজার স্বভাবে অনেক ভুল থাকতে পারে। তাদের দোষের কিছু নেই।
তোকে সবকিছু কেন বললাম জানিস? তুই যদি বুদ্ধিমতী হস তবে এবার তুই নতুন চাল চালবি।সংসার টা করবি,সব মেনে নিবি,ধীরে ধীরে সবকিছু নিজের আয়ত্তে নিবি,আর তারপর,,,,
হেঁসে উঠে চলে গেলেন মনুজা।
আইরিন সেদিকে চেয়ে আছে। খালা নাকি মায়ের চেয়ে ভালা।
এই খালা তার এতটাই ভালো চাচ্ছে যে,তার জীবন টা-ই নরক হয়ে গেলো।
অদ্ভুত লোভী মহিলা!
আইরিনের বিয়ের আজ একুশ দিন। বাবার বাড়ি থেকে এখনো কেউ আসেনি। সেরকম করে কথা বলার সুযোগ ও হয়নি। জিসানের মোবাইল থেকে
কল দিলে সে সামনেই দাঁড়িয়ে থাকে। দুয়েক বার ভিন্ন ভাবে চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তার মা তার কোনো কথা শুনতেই চাইলোনা। ভাবির সাথে কথা বলতে চেয়েও কোনো লাভ হলোনা। ভাবিকে কিছু তেই মোবাইল দেয় না মা।
এ কোন অগ্নি পরীক্ষায় পড়ল সে!
আইরিন এখন চুপচাপ সব মেনে নেয়। কোনো দিন রাতে নর্তকীর মতো স্বামীর সামনে অশ্লীল পোশাকে নাচে। কোনো দিন তার মদের নেশার সঙ্গী,কোনো দিন তার চাহিদার স্বীকার,,।
এরপর থেকে সে অবশ্য খুব একটা গায়ে হাত তোলেনি। নিজেকে এখন রোবটের মতো মনে হয় আইরিনের। একবার আত্মহত্যা করতে গিয়েছিল।ছাঁদ থেকে লাফ দেওয়ার আগে ই বড় ভাবি টেনে নিয়ে আসে।
দুহাত কাঁধে রেখে বলে- আগের দুই বউ তো আত্মহত্যা করেই মরল। একজন ফ্যানে ফাঁস দিয়ে, আরেকজন ছাঁদ থেকে লাফ দিয়ে। কিছু ই তো হলোনা। শুধু নিজেরা মরল। আর কারোর কিছু হলো না। টাকা দিয়ে সব ধামাচাপা দেওয়া যায়।
নিজের জীবন টা ঐ অসুস্থ মানুষের জন্য নষ্ট করো না বোন।
আমরা তো এখানে পড়ে আছি শ্বাশুড়িরে কথা দিয়েছিলাম বলে। আমার স্বামী তার মাকে খুব ভালোবাসে। মরে যাওয়ার আগে তিনি ছেলের হাত ধরে বললেন - আমার জিসান কে একা ফেলে তোরা চলে যাইস না কখনো। আমার ছেলেটার মাথা ঠিক নেই। পাগল!
তাছাড়া শ্বশুর বৃদ্ধ মানুষ। কি করে মুখ ফিরিয়ে নিই!
-কিন্তু ভাবি, সে তো পাগলের মতো আচরণ করছে না। করছে অসভ্যের মতো।
-কারণ সেই রোগ আর নেশা একসাথে মিলে তাকে অন্য মানুষে পরিণত করেছ।
-কী রোগ?
- আমি এতো কিছু বলতে পারবো না বইন।নিষেধ আছে। এতকিছু বুঝিও না আমি। মূর্খ্য মানুষ।
তাছাড়া ডাক্তার বলেছে এটা নাকি কোনো এক মানসিক রোগ। তার মাথায় কি সব চলে। তারপর হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে যা খুশী করে।
আর ঐ যে মদের নেশা, নাচ-গান,, এসব তার ছিলো না। হয়েছে সঙ্গ দোষে। মা মারা যাওয়ার পর রাতের বেলা এদিক ওদিক ঘুরতো। একে তো মাথায় সমস্যা তারউপর আবার মায়ের মৃত্যু। ভালো -মন্দ জ্ঞান একেবারেই গেছে। কিন্তু টাকা তো ছিলো। টাকার গন্ধে হুড়মুড় করে বন্ধু বেড়ে গেলো। কষ্ট কমানোর নাম করে রাত-দিন নেশা করা। নাচ দেখা, যা খুশি করা।
ধীরে ধীরে পরিণত হলো এই ভয়ংকর মানুষে।
শুধু একটা কথা বলি,,সহ্য করতে না পারলে চলে যাও। নিজের পরিবারের কাছে যাও। তাদের সব খুলে বলো। তবু মরতে যাইও না।
আর তোমার তো ভাগ্য ভালো যে, বিয়ে হয়ে যাওয়ার পরও কেউ তোমার খোঁজ খবর নিতে কতরকম বেশ ধরছে।
- কি বেশ ধরছে ভাবি?
- কিছু না।
আরে এই বাড়ির সবার মাথায় কি একেক রকম সমস্যা আছে? আজব মানুষ সব!
আইরিন বড় ভাবির কথা মতো তার শ্বশুরের কাছে গেলো।- বাবা, আমাদের বাড়ি যায়না কতদিন। সবার জন্য মন খারাপ লাগছে। কয়েকদিনের জন্য বাড়ি যেতে চাই।
-ঠিক আছে, জিসান আসুক তার সাথে কথা বলে দেখি।
জিসান শুনে রাজি হলো।যতদূর বুঝেছে এই মেয়ে সব মেনে নিয়েছে। তার কথা মতোই হচ্ছে সব। তাছাড়া মেয়েটা কে আজকাল কেমন যেন আপন লাগে। দেখলেই মায়া লাগে।
কি সুন্দর চুপচাপ সব কথা মেনে নেয়। কিন্তু জিসান একটা বিষয় লক্ষ করেছে তার মাথায় আগের মতো যন্ত্রণা হয় না। মেয়ে টা কে দেখলেই ভালো লাগে।
না দেখে বেশিক্ষণ থাকতে ই পারেনা। তাই সে ঠিক করলো সেও যাবে আইরিনের সাথে।
জীবনে প্রথম জিসান নিজে মার্কেটে গেলো। বউয়ের জন্য শাড়ি, গয়না কিনলো।
খুশি মনে সেসব আইরিনের হাতে দিয়ে পড়তে বলল।
আইরিন চুপচাপ নিলেও পড়ে নি।বাবার বাড়ি যাওয়ার সময় জিসান খেয়াল করলো আইরিন তার দেওয়া শাড়ি পড়েনি। তখনই তার মাথায় চাপ সৃষ্টি হলো।হিতাহিত জ্ঞান চলে যাচ্ছে,, কিছু একটা ভাঙতে ইচ্ছে করছে। নিজের হাতের মোবাইল টা ছুড়ে মারলো আইরিনের দিকে। কপাল আর এক চোখ বরাবর পড়েছে। সাথে সাথে ফুলে গেছে।
আইরিন কাঁদল না,কোনো কথা বলল না। চুপচাপ গাড়িতে উঠে বসলো।
জিসানের আবার মায়া হলো আইরিনের প্রতি। সে অপরাধীর মতো মুখ করে আইরিনের পাশের সিটে গিয়ে বসল।
পরবর্তী পর্বে শেষ,,,,
#ছোটগল্প
বেলীফুলের মালা