বাঙালি বিয়ের হাজারো অঘটন ঘটে থাকে। কেউ কম কাবিনে বেঁকে বসে, কেউ ডেকোরেশনের রং অপছন্দ করে বরযাত্রী ফেরত পাঠায়। কিন্তু স্রেফ একখানা ‘আস্ত খাসি’র অভাবে শুভকাজ পণ্ড হয়ে বর যে ২৪ ঘণ্টার নোটিশে অন্য হাটে গিয়ে হাঁড়ি বসাতে পারেন, তা বোধহয় এই চব্বিশ পরগণার ইতিহাসে কোনো মহাভারতও লেখেনি।
ঘটনার নায়ক জনাব জুনায়েদ। সুদূর সূর্যোদয়ের দেশ জাপানপ্রবাসী। সেখান থেকে তিনি সুশি আর প্রোটিনের সুষম ব্যবহার দেখে দেশে ফিরেছিলেন কি না জানা নেই, তবে বিয়ের প্যান্ডেলে পা রেখেই তিনি বুঝে গেলেন—খাসির রেজালা ছাড়া বাঙালির প্যান্ডেল যেন জল ছাড়া পুকুর। কনেপক্ষের বাড়িতে এলাহী কাণ্ড! আলোকমালার ঝিলিক, ফুলের গন্ধ, আর আত্মীয়াদের কানফাটা গীত। কিন্তু খাবারের প্যান্ডেলে ঢুকেই জুনায়েদ সাহেবের কপাল কুঁচকে গেল। চোখের সামনে বাটি ভরা মুরগি আর গরুর মাংস ঘুরছে, কিন্তু যে ‘আস্ত খাসি’র মহিমায় পুরো বরযাত্রী লাল হয়ে বসে আছে, তার কোনো নামগন্ধ নেই!
বরপক্ষের এক প্রবীণ চাচা পাঁপড় ভাজায় কামড় দিয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন, "জুনায়েদ, এরা তো আমাদের ইজ্জত শেষ করে দিল! আস্ত খাসি ছাড়া আমরা কি এই শুকনো ভাত গিলব?" জুনায়েদের প্রবাস ফেরত রক্ত ততক্ষণে টগবগ করে ফুটছে। তিনি বুঝলেন, এটা শুধু প্রোটিনের অপমান নয়, এ এক বিশাল ভূ-রাজনৈতিক চক্রান্ত! সঙ্গে সঙ্গে তিনি বিয়ের পাঞ্জাবির পকেট থেকে জপমালা ফেলার মতো করে ঘোষণা দিলেন, "যেখানে খাসি নাই, সেখানে বরও নাই!"
কনেপক্ষ তো হাঁ! কনের বাবা হাতে পায়ে ধরে বললেন, "বাবা, খাসির বদলে চারটে খাস খাস খাসি-মার্কা গরু জবাই করেছি!" কিন্তু বর অনড়। “নাহ, আমার আস্ত খাসিই চাই।” কাবিনের টাকার অংক আর খাসির ওজনের গ্যাঁড়াকলে পড়ে শুভপরিণয় মুহূর্তে মহাশূন্যে মিলিয়ে গেল। বরযাত্রী দলবদ্ধ হয়ে না খেয়ে, কেবল পেটের ভেতর ক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে প্যান্ডেল ত্যাগ করল।
তবে জুনায়েদ সাহেব যে কেবল রেগে গিয়েই ক্ষান্ত হওয়ার পাত্র নন, তিনি দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে জাপানি বুলেট ট্রেনের চেয়েও গতিশীল। ২৪ ঘণ্টা যেতে না যেতেই চারদিকে রটে গেল ঐতিহাসিক খবর—জুনায়েদ ভাই দমে যাননি! প্রতিবেশী গ্রামে নতুন পাত্রী প্রস্তুত। তবে এবার আর কোনো রিস্ক নেওয়া হয়নি। নতুন কনেপক্ষ আগেভাগেই খাসির হাট থেকে সবচেয়ে মোটাসোটা, চারপায়া রাজকীয় খাসিটি কিনে নিয়ে বরকে আগাম মেসেজ পাঠিয়ে দিয়েছে—"ভাই, খাসি রেডি, আপনি কনে সাজিয়ে নিয়ে যান!"
দ্বিতীয় দিন রাত বারোটা। লাল বেনারসি পরিহিত নববধূর পাশে বসে জয়ে হাসছেন আমাদের খাসি-প্রেমী বর। আস্ত খাসির হাড় চিবানোর তৃপ্তি যেন তাঁর চোখেমুখে ফুটছিল। রাত একটায় সোশ্যাল মিডিয়ায় একখানা ছবি ঝুলিয়ে দিলেন। ক্যাপশনে লিখলেন—"আলহামদুলিল্লাহ, সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে..."
নেটিজেনরা অবশ্য চুপ থাকেনি। কমেন্ট বক্সে ঝড় উঠে গেল। কেউ লিখল, "ভাবির চেয়ে খাসির ছবিটা পোস্ট করলে বেশি মানাতো ভাই!" কেউ আবার ট্রল করে বলল, "পরবর্তী কনেপক্ষদের প্রতি সতর্কবার্তা: মেয়ের পাশে একটা আস্ত খাসি বাঁধার জায়গা রাখুন।"
বাঙালি বিয়ের ইতিহাস বহু কিসিমের গল্প দেখেছে, কিন্তু এক খাসির মহিমায় যে বিয়ের বর ২৪ ঘণ্টায় এমন অলটারনেটিভ রুট খুঁজে নেয়, তা আধুনিক যুগের এক মহা কাব্যিক ট্র্যাজেডি নাকি কমেডি, তা নিয়ে সমাজবিজ্ঞানীরা এখনও গবেষণায় ব্যস্ত!