শেষ পর্ব
আইরিনের বাড়ির মানুষ, আশেপাশের মানুষ,আত্মীয় স্বজন সবাই আইরিনের ভাগ্য দেখে অবাক। জিসান এতো এতো উপহার, নাস্তা এনেছে শ্বশুর বাড়ি তে। উপরন্তু আইরিন কে চোখে হারাচ্ছে।
এক মিনিটের জন্য বউয়ের পাশ থেকে সরে না। চুপচাপ বসে থাকে। মাঝে মাঝে আইরিনের দিকে চেয়ে থাকে অপলক। কেউ কোনো প্রশ্ন করলে অমায়িকভাবে উত্তর দেয়।
এমন বড় লোক আর বোকা সোকা নিরঞ্ঝাট জামাই পেলে আর কি লাগে!
কিন্তু কেউ করলো না সবার বিস্ময়ের মাঝে একজনের চোখ ভয়ংকর লাল হয়েছে আইরিনের ফোলা কপাল আর চোখ দেখে।
আইরিন তার বাড়ির সবাই কে সব খুলে বলবে এমন কোনো সুযোগ পাইনি। এই মানুষ তো সে ওয়াসরুমে গেলেও দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে।
একদিন জিসান ঘুমিয়ে গেলে সে চুপচাপ মায়ের রুমে গেলো। বাবা-মা কে যতটুকু সম্ভব রয়ে সয়ে বলল।
-আমার শেষ কথা ঐ বাড়িতে আমি আর ফিরে যাবনা।
মেহেরুনন্নেচ্ছা সজোরে এক থাপ্পড় দিলেন।
-না চাইতে ই সব পেয়ে গিয়েছিস তো তাই সইছে না।আমাদের চোখ কি অন্ধ? এই ছেলে তোকে কতটা ভালোবাসে সেটা প্রতিটি মানুষ বুঝতে পেরেছে। শুধু আমি না। যে ভালোবাসতে পারে সে শাসনও করতে পারে। খবরদার আরেকবার যদি জামাই নিয়ে কিছু বলেছিস!
আইরিন মুখে হাত দিয়ে বাবার দিকে চাইল।
এই প্রথম সে বুঝল তার বাবাও তাকে বুঝতে ভুল করছে- মা আইরিন, সংসারে একটু জোট ঝামেলা হয়। এই যে ছেলেটা তোর জন্য নিজের কাজ ফেলে এখানে পড়ে আছে। আমাদের মতো ঘরে তার কি অসুবিধা হচ্ছে না? হচ্ছে। কিন্তু তোর জন্য মেনে নিচ্ছে। আমার মেয়েটা কে তার স্বামী সারাদিন চোখে চোখে রাখছে একজন বাবার কাছে এটাই সবচেয়ে বেশি খুশির।
-কিন্তু বাবা সে তো অসুস্থ। তার মাথায় সমস্যা আছে,,
আইরিনের কথা শেষ হওয়ার আগেই তার মা বলে উঠলো - সে অসুস্থ আমরা জানি। সবকিছুই আমাকে মনুজা বলেছে। যখন মাথায় যন্ত্রণা হয় একটু রাগ উঠে এটুকুই। এমন তো না যে সে কাপড় না পড়ে পাগলামি করছে,রাস্তায় গিয়ে মানুষ মারছে,কাপড়ে পায়খানা -প্রশ্রাব করছে। আচ্ছা বল,
তোর কি তাকে খাইয়ে দিতে হয়? গোসল করিয়ে দিতে হয়?কাপড় পড়িয়ে দিতে হয়?
আইরিন না বোধক মাথা নাড়লো।
- তাহলে তো হয়েই গেলো । অনেকের ভাগ্যে তো স্বামী অসুস্থ হলে এসবও করতে হয়। ধর তোর বাবা এক্সিডেন্ট করে হাত-পা ভাঙলো। আমার কি তাকে খাইয়ে,পরিয়ে দিতে হবে না? ফেলে তো দিতে পারবোনা। তাই না?
আর তোর বাবার তো এই ভিটে মাটি ছাড়া কিছু ই নেই। তোর কপাল তো সেদিক দিয়ে সোনায় সোহাগা।
শেষের কথায় কেশে উঠলেন আশরাফ রহমান। সারাজীবন এই এক খোঁটা। আর কথা বাড়ানোর সুযোগ না দিয়ে বললেন - আইরিন ঘরে যা।জামাই ঘুম ভাঙলে খুঁজবে।
আইরিন ভাবলেশহীন ভাবে উঠে দাঁড়ালো। সে বেরিয়ে যেতে যেতে তার মা আবার বলল- তোর খালা ঠিকই বলেছিল তোর মন সংসারে নেই। অন্য কোনো মতলব করবি না আইরিন। কাল সকাল হোক ঐ জনির বাবা-মার কাছে যাবো আমি। বেয়াদব একটা ছেলে জন্ম দিয়েছে।তাকে তো আমি,, !
হঠাৎ জনি ভাইয়ের কথা শুনতে ই বুকটা ধক করে উঠলো। হার্টবিট বেড়ে গেছে সে স্পষ্ট টের পাচ্ছে।
এই প্রথম বার নিজের অজান্তে আইরিন বলল-জনি ভাই ঠিকঠাক সময়ে বিয়ে করে নিলেই পারতো।তাহলে তার ভাগ্য টা এমন বিভৎস হতো না।
নিজের কথায় নিজেই আৎকে উঠে আশেপাশে তাকালো।
লোকটা এখনো ঘুমাচ্ছে। আইরিন জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। বেলীফুলের গন্ধ সেদিনের মতো ই রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে যাচ্ছে। মনে বিচরণে করছে সেদিনের দৃশ্য। হঠাৎ সেই বেলীফুলের মালাটা পড়তে ইচ্ছে করছে। খুব করে!
আইরিন সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে আর কাওকে কিছু বলবেনা। নিজের অদৃষ্ট কে মেনে নেওয়া ছাড়া কি করার আছে তার।
অবশ্য বলেও কোনো লাভ হবে না। একে-তো খালা মাকে ভুল-ভাল বুঝাচ্ছে,আবার এই পাগল লোক টা যা ঢং শুরু করেছে।
হঠাৎ হলো কি কে জানে!
পাগলের যদি এতো ভালো অভিনয় হয়,সুস্থ হলে তো নায়ক শাকিব এর কাছে ফেল!
ভাই-ভাবি কেও কিছু বললো না আইরিন। তারা তো বরাবরই মায়ের কথায় উঠে বসে।
--------------------------
আইরিনের ভাবি সুমি হঠাৎ তাকে ডেকে ডেকে রুমে এলো। -আইরিন আর পারছি না। তাড়াতাড়ি চলো আমার সাথে।
আইরিনের হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছে সুমি।
জিসান কাচুমাচু করে উঠতে যাবে তখনই সুমি বলল-ভাইয়া আইরিনের সাথে আমার একটু কাজ আছে হাসপাতালে । মেয়ে গঠিত কাজ। এখুনি ডাক্তারের কাছে যেতে হবে নাহয় অঘটন ঘটে যাবে।
এদিকে মা গেছে নানাবাড়ি।
তাই আইরিনকে নিয়েই যায়। আপনি এখানেই থাকুন। বাড়িতে তো আর কেউ নেই। বুঝেন ই তো।
হতভম্ব আইরিন কে নিয়ে ছুটে বেরিয়ে গেলো সুমি।
আগে থেকেই সিএনজি অপেক্ষা করছিল। ঝটপট উঠে স্টার্ট দিতে বললো।
আইরিন জিঙ্গাসু দৃষ্টিতে তার ভাবির দিকে চেয়ে আছে। সুমি নির্লিপ্ত ভাবে বলল- জনি ভাই সব জানে।আর আমিও। জনি ভাই প্রতিদিন আমাকে তোর খবর জানাতো।
-কিন্তু জনি ভাই কি করে জানবে?
তোর হাসবেন্ড এর খোঁজ খবর নিতে গিয়েই তার মনে খটকা লাগে। তারপর থেকে নানান উপায়ে তোর খোঁজ রেখেছে। ফেরিওয়ালা সেজে প্রথম বার যায়। তখন বাহির বারান্দা থেকেই তোর রক্ত মাখা গাল দেখেছিল। আর সে খেয়েছিল লাথি-ঘোষা। আহা! প্রেম।
তাদের বাড়িতে যাওয়া দুধ ওয়ালা, মাছ ওয়ালা,, সবার সাথেই যোগাযোগ রেখেছিল।
বলেই রিনঝিন করে হাসল সুমি।
সে অনেক কাহিনি পরে জনি ভাইয়ের কাছে শুনে নিস। আপাতত জনি ভাই তোকে এই এলাকা থেকে দূরে কোথাও রেখে আসবে। ঠিক সময়ে ডিভোর্স হয়ে যাবে জিসানের সাথে। তোর মেজভাই আইনজীবীর সাথে কথা বলেছে। তার আগের দুই স্ত্রী আত্মহত্যা করেছে এটা আর তোর শরীরের দাগই যথেষ্ট প্রমাণ হিসেবে।
মা-বাবা কে আমরা ম্যানেজ করে নিব। আপাতত তোর এই সাইকো থেকে দূরে থাকা জরুরী।
সে যেকোনো অঘটন ঘটাতে পারে।
ভাবির কথার মাঝখানেই জনি ভাই গাড়ি তে উঠে পড়লো। আর ভাবি নেমে গেলো আমার হাতে মোবাইল আর কাপড়ের ব্যাগ দিয়ে।
সবকিছু আমার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। বেশ খানিকটা সময় লাগলো সবকিছু মাথায় গুছাতে আর বুঝতে।
আইরিনের ভাবনার শুরু থেকেই তার দিকে চেয়ে আছে জনি। ঠোঁটের কোণে লেগে আছে হাসি।
- ভাবা শেষ?
- হ্যাঁ? বুঝিনি,,
-বলছি তোর মতো বোকার জন্য ঐ সাইকো ই ঠিক।
এই এতটুকু বিষয় বুঝতে তোর হা করে এতক্ষণ ভাবতে হলো? হাঁদারাম কোথাকার!
-জনি ভাই,হাঁদারাম বলবা না বলে দিচ্ছি।
-বললে কি করবি? তোর জামাই র মতো মাথা ফাটিয়ে দিবি?
আইরিন আর কিছু বললো না। চুপচাপ বাইরে তাকিয়ে আছে। দ্রুত চলন্ত গাড়ির সাথে তাল মিলিয়ে ছুটছে বাতাস।
চোখে -মুখে আঁচড়ে পড়ছে অবাধ্য চুল।
আইরিনের ভালো লাগছে। অনেক দিন পর বুকের মাঝখান থেকে যেন একটা বড় পাথর সরে গেছে। বাঁচার আশা দেখছে। সে তো ভেবেই নিয়েছিল তার জীবন টা এভাবেই শেষ হবে।
কিন্তু জনি ভাই আর তার ভাই-ভাবী ঠিক তাকে ধরে রেখেছে।
চোখের কোনায় জমা জল মুচে জনি ভাইয়ের দিকে তাকাল-
"কেন করলেন এত কিছু? "
-তুই আমার লতানো পাতানো চাচাতো ফুফাতো বোন। একটা দায়িত্ব আছে না?"
-একদম মজা করবেন না। সত্য সত্য বলেন।
- কি শুনতে চাস তুই? আইরিন আমি তোকে ভালোবাসি,তোকে ছাড়া আমি বাঁচবো না। তোর কষ্ট আমি সহ্য করতে পারছিনা আইরিন, এই দেখ আমার বুকে কি যন্ত্রণা,, এসব শুনতে চাস নাকি?
-আইরিন লজ্জিত হয়ে মাথা নিচু করে নিল।
আইরিনের হাতে একটা বেলীফুলের মালা জড়িয়ে দিয়ে জনি আবার বলল- আমি এসব করেছি তোকে বেলীফুলের মালা দেওয়ার জন্য।
প্রতিদিন বেলীফুলের মালা পড়িয়ে দেওয়ার লোভে।
-পড়বি তো আইরিন? আমার বেলীফুলের মালা।
আইরিন মাথা নিচু অবস্থাতেই ক্ষীণ স্বরে বললো -হুম।
-------------------------------