চিন্তা

আ.লীগের দ্বিতীয়বার আশাভঙ্গের কারণ ঘটতে যাচ্ছে?

September 10, 2026

ফারদিন ফেরদৌস

24
View

আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব যদি শেষ পর্যন্ত শেখ সেলিমের হাতে যায়, তাহলে দলটির দ্বিতীয়বার আশাভঙ্গের কারণ ঘটতে পারে -এমন সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

বিএনপিকে মাইনাস করার কৌশলে জামায়াতের লোকজনকে নিজেদের দিকে ভেড়ানোর মতো রাজনৈতিক সমীকরণে হাঁটতে গিয়ে আ. লীগ এখন ভারতে অবস্থান করছে। দলটির সামনে নেতৃত্বের প্রশ্নটিও তাই বেশ গুরুত্বপূর্ণ। শেখ সেলিম যদি শেষ পর্যন্ত দলের গুরুদায়িত্ব পান, তাহলে কেউ কেউ হয়তো আশাবাদী হতে পারেন। কিন্তু আমাদের আশঙ্কা, দলটিকে তিনি হয়তো আন্দামান-নিকোবরের দিকে আরও দূরে নির্বাসনে ঠেলে দেওয়ার মতো অবস্থাও তৈরি করতে পারেন!

শেখ সেলিমের কিছু আত্মীয়স্বজন বিএনপিতে আছেন -এটি নিঃসন্দেহে একটি পারিবারিক সংযোগ। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে দলীয় পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে আত্মীয়তার এই সেতু কতটা কার্যকর হবে, সেটিই প্রশ্ন। বরং শেখ সেলিম যদি সত্যিই আ. লীগের গুরুদায়িত্ব পান, তাহলে এনসিপি, জামায়াত এবং ক্ষমতাসীন বিএনপির জন্য সেটি হয়তো স্বস্তির খবর হতে পারে; কিন্তু আওয়ামী লীগের জন্য তা কতটা তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তন বয়ে আনবে, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

আ. লীগের অনেকেই হয়তো ভাবতে পারেন, শেখ সেলিমের বিএনপি-কানেকশন অন্যদের তুলনায় ভালো। কিন্তু রাজনীতিতে অনেক সময় কাছের সম্পর্কও দূরের ফলাফল এনে দেয়। ফলে সেই আশার আঙুর শেষ পর্যন্ত টক বলেও পরিণত হতে পারে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগ্নে শেখ ফজলুল করিম সেলিম বিএনপি সরকারের তথ্যমন্ত্রী আন্দালিব রহমান পার্থের মামা। আবার শেখ সেলিমের চাচাতো ভাই শেখ হেলাল পার্থের শ্বশুর। অর্থাৎ দুই পরিবারের মধ্যে আত্মীয়তার সম্পর্ক যথেষ্ট ঘনিষ্ঠ। কিন্তু ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থের মতো দৃঢ় জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক অবস্থানের একজন মানুষকে কেবল আত্মীয়তার সূত্রে আ. লীগের রাজনৈতিক পুনর্বাসনের সম্ভাব্য সেতু হিসেবে দেখাটা বোধ হয় বাস্তবসম্মত নয়। রাজনীতির নিজস্ব হিসাব-নিকাশ শেষ পর্যন্ত আত্মীয়তার হিসাবকে ছাপিয়ে যায়।

একই কথা প্রযোজ্য ববি হাজ্জাজের পরিবারকে ঘিরেও। শেখ সেলিমের সঙ্গে তাদের পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে; শেখ সেলিমের বড় ছেলে ববি হাজ্জাজের বোনকে বিয়ে করেছেন। কিন্তু রাজনৈতিক পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে বেয়াই-সম্পর্কও যে খুব কার্যকর কোনো পাসপোর্ট হবে -এমনটা মনে করার কারণ নেই। পারিবারিক সম্পর্ক হৃদয়ের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু দলীয় রাজনীতির দরজা খোলার চাবি সব সময় তা হয় না।

শেখ সেলিম বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ হলেও তাঁকে খুব জবরদস্ত বা কারিশমাটিক গণনেতা হিসেবে দেখার সুযোগ সীমিত। অন্যদিকে শেখ হাসিনা তাঁর অনুপস্থিতিতে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্যদের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা বলে থাকলে, সেটি হয়তো একটি বাস্তবতারও ইঙ্গিত -দলকে তাঁর নিজের নেতৃত্বে আবার ঘুরে দাঁড় করানোর সম্ভাবনা নিয়ে তিনিও হয়তো আগের মতো নিশ্চিন্ত নন।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, সতেরো বছরের বঞ্চনার পর ক্ষমতায় ফিরে আসা বিএনপি কেন এখনই আ. লীগকে ভরা গাঙের কচুরিপানার ভেতর থেকে মাথা তুলতে দেবে? রাজনীতিতে ক্ষমতাসীনরা সাধারণত প্রতিদ্বন্দ্বীকে পুনর্গঠনের জন্য খুব বেশি অবকাশ দেয় না। তবে রাজনীতির আরেকটি শিক্ষা হলো -কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়।

“Time is the best healer”‌ -সময়ই অনেক ক্ষত সারিয়ে তোলে। আপাতত এই প্রবাদবাক্যটিকেই হয়তো আপ্তবাক্য হিসেবে ধরে রাখতে পারে গণরোষে নির্বাসিত আওয়ামী লীগ। শেষ পর্যন্ত সময়ই বলে দেবে -শেখ সেলিমের নেতৃত্ব আ. লীগের জন্য নতুন কোনো রাজনৈতিক দরজা খুলবে, নাকি ইতিহাসের আরও একটি দীর্ঘ করিডোরে ফেলে দেবে। অথবা শেখ হাসিনা অবসরে গিয়ে তার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের ওপর দায়িত্ব দিয়ে পারিবারিক লিগ্যাসি বা পলিটিক্যাল ডাইন্যাস্টি বয়ে নিয়ে যাবে।

▪️
লেখক: সাংবাদিক 
৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

Comments

    Please login to post comment. Login