Critic

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: এতক্ষণে অরিন্দম কহিলা বিষাদে

September 15, 2026

28
View

ছাত্রলীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করলে চব্বিশজয়ী শিবিরের আনন্দ হবে -এটা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই আনন্দরে উন্মাদনায় মাত্রা দিতে মধুর ক্যান্টিনে গরু জবাই কেন করা লাগবে? কারণ একাত্তরে হানাদারবাহিনীর হাতে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা মধুসূদন দেকে হিন্দু বিবেচনায় নিয়ে তার জাতপাতকে গরু দিয়ে শুদ্ধ করতে হবে। এই যে শিবির তথা এক্স গুপ্ত ছাত্রলীগাররা মানুষকে তার বিশ্বাস ও আবেগের জায়গায় আঘাত করে হিউমিলিয়েট করে -এটাই গুপ্তদের কাজ। সেসময় তৎকালীন ঢাবি উপাচার্য নিয়াজ আহমেদ খান ওই ন্যাক্কারজনক ঘটনাকে গোষ্ঠীস্বার্থ চরিতার্থ করতে আশকারা দিয়ে গেছেন। একেবারে নির্বাক, নির্বিকার ও নিশ্চুপ থেকেছেন।

জুলাই আন্দোলনের পরে স্বাধীনতা উদযাপন উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীনতা ভোজ ও গণবিবাহের আয়োজন করা হয়। ২০ সেপ্টেম্বর ২৪-এর ওই বিয়ের সকল খরচ বহন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের শিক্ষার্থীরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমভিত্তিক বিভিন্ন গ্রুপে ওইসময় শিক্ষার্থীদের পাত্র-পাত্রী খুঁজতে দেখা যায়। শেহরিন আক্তার ইপা নামে এক শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের এক ফেসবুক গ্রুপে লিখেন, ‘জহুরুল হক হলে অনুষ্ঠিতব্য স্বাধীনতা ভোজ উৎসবকে কেন্দ্র করে আয়োজিত হতে যাচ্ছে লায়লাতুল গণবিবাহ। আপনারা যারা জহুরুল হক হলের সাবেক বা বর্তমান তারা চাইলে, আপনার পার্টনারকে রাজি করিয়ে আয়োজকদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। মেহেদীর সাজ করিয়ে দেয়ার দায়িত্ব তার -এমনটাও তিনি জানান।

এখন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করতে যায়, নাকি গণবিয়ে করতে যায়? পৃথিবীর তাবৎ ইতিহাস ঘাটলে এমন হাস্যকর ঘটনা কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়টা পাওয়া যাবে? এমন ফালতু ও ফাজলামো ইভেন্টকেও প্রমোট করে গেছে তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

দিন বদলেছে। ভোটে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় বসেছে। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যেন সেই ইন্টিরিমের অন্ধকার দেড় বছরেই হাবুডুবু খাচ্ছে। ওখানে ডাকসু নামের ছাত্র সংসদ আছে। ওই সংসদের সভাপতি পদাধিকার বলে বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। কিন্তু ডাকসুর সকল সিদ্ধান্ত নেন সেখানে থাকা ভিপি আবু সাদিক কায়েম ও জিএস এস এম ফরহাদ গংরা।

এবার ঢাকসুর সংগ্রহশালা সংস্কার করা হয়েছে। সংগ্রহশালা থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি ফেলে দিয়েছে। সেটা তারা দিতে পারে। কারণ জামায়াত-শিবির চিহ্নিত ও ইতিহাস স্বীকৃত স্বাধীনতাবিরোধী। তাদের সাথে মুজিবের মিলবে না এটা খুব স্বাভাবিক। কিন্তু ওরা করেছে কী? সংগ্রহশালায় ছাত্রসংঘের নেতা ও বাংলাভাষা বিরোধী মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি ওয়ালে খুব মর্যাদার সাথে সাঁটিয়ে দিয়েছে। আবার সেটা গর্বের সাথে ভিডিও কন্টেন্ট বানিয়ে নিজেদের সোশ্যাল হ্যান্ডেলে প্রচারও করে দিয়েছে।

এই দেশ একসময় পাকিস্তানের পার্ট ছিল। ওই পাকিস্তানের জাতির পিতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় তাঁর ছবি আমাদের যেকোনো সংগ্রহশালায় থাকাটা অবাঞ্ছনীয় না। কিন্তু ডাকসুর নেতৃত্ব জিন্নাহকে এমন মর্যাদায় আমাদের ওয়ালে রেখেছে -যেটা দিয়ে তারা প্রমাণ করতে চায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্রপুরুষ নাকি ওই জিন্নাহ। এমন খারাপ অভিপ্রায় মুক্তবুদ্ধির মানুষ মেনে নেবে না এটা ডাকসু নেতাদের জানা থাকা দরকার ছিল।

ঘটনা এখানেই শেষ না। মুক্তিযুদ্ধের আগে ৬৯ সালের সেই গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল সময়ে বাংলাদেশে বসে পাকিস্তানের ধর্মভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালুর দাবি তোলা থিওলজিস্ট আবুল আলা মওদুদীর ভাবশিষ্য ছাত্রসংঘ নেতা আবদুল মালেকের ছবিও ডাকসুতে মর্যাদার সাথে রাখা হয়েছে -যাকে মুক্তিকামী তরুণেরা তখন পিটায়ে মেরে ফেলেছিল। আপাদমস্তক মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী মালেকও নাকি শহীদ।

খুব স্বাভাবিকভাবেই আবু তৈয়ব হাবিলদার নামের উর্দু বিভাগের এক শিক্ষার্থী এবং ছাত্র ফেডারেশন নেতা অর্ক বড়ুয়া ওই দুইজনের ছবি ওয়াল থেকে নামিয়ে ডাকসুর অন্যায্য আচরণের কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছেন। ভাষা আন্দোলনের মহিমা সমুন্নত রেখেছেন।

আবু তৈয়ব সাংবাদিকদের বলেন, যে জিন্নাহ আমাদের মাতৃভাষার বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত দিয়েছিল, যে জিন্নাহ ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে ছাত্র-ছাত্রীদের গ্রেফতার করেছিল, সেই জিন্নাহ ডাকসুতে স্থান পেতে পারে না।

ইতিহাস যেখানে যতবার বিকৃত করা হয়, ওই ইতিহাস নিজগুণে এক নিমিষেই তার আসল সত্যটা দেখিয়ে দেয়। ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি প্রদর্শন করার প্রতিবাদে জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযমকে ১৯৮১ সালে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের সামনে জুতাপেটা করার ছবি সাঁটিয়ে দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ফেডারেশনের নেতা–কর্মীরা। এখন ওই ছবিটা নিয়েও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে চর্চা হচ্ছে।

এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল। তারা লিখিত বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জিন্নাহ ও মালেকের ছবি ডাকসু সংগ্রহশালা থেকে অপসারণ করতে বলেছে।

অতঃপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ঘুম ভেঙেছে। এই ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠন করেছে। দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এখন একে একে আরও থলের বিড়াল বের হয়ে আসছে।

অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানীকে আহ্বায়ক করে করা কমিটি ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহ ও তৎকালীন ছাত্রসংঘের সাবেক নেতা আবদুল মালেকের ছবি রাখার ঘটনা তদন্ত করবে। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতি না নিয়ে শিক্ষক মূল্যায়নের ওয়েবসাইট চালু এবং অনুমতি ছাড়া ‘নির্ভীক জুলাই’ ও কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করার বিষয়েও তদন্ত করবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম এ কথা জানিয়েছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেছেন, ছবি লাগানো বা ডাকসুর নেওয়া এই কার্যক্রমগুলোর বিষয়ে তিনি আগে থেকে অবগত ছিলেন না। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একটি লিখিত বক্তব্যও দিয়েছে। এতে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ যেকোনো সিদ্ধান্ত উপাচার্যের নির্দেশনা সাপেক্ষে গ্রহণ করবে। কিন্তু ডাকসু ‘নির্ভীক জুলাই’ নামে কলাভবন-সংলগ্ন ডাকসু ভবনের পশ্চিম পাশে ও কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে যে স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করেছে, তা সিন্ডিকেট কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কোনোরূপ অনুমতি বা আলোচনা করে স্থাপন করেনি, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আইন অনুযায়ী এখতিয়ারবহির্ভূত।

ওই বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহ এবং ছাত্রসংঘের নেতা আবদুল মালেকের ছবি প্রদর্শনের বিষয়টিও ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহশালায় এমন ছবি প্রদর্শন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

ডাকসুর পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মূল্যায়নের জন্য অনুমোদন ছাড়া ওয়েবসাইট চালু করা হয়েছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।

ডাকসু থেকে জিন্নাহ ও ছাত্রসংঘের নেতা প্রয়াত আব্দুল মালেকের ছবি যারা ডাকসু সংগ্রহশালা থেকে সরিয়ে দিয়েছে তাদেরকে সন্ত্রাসী বলে উল্লেখ করেছে ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা। আর এই জুমাদের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

অবস্থাদৃষ্টে এটা অনুমান করা স্বাভাবিক যে, ডাকসুর নামে কয়েম-ফরহাদ-জুমারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বৈত প্রশাসন কায়েম করে নিয়েছে। ওদের যেখানে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মুখপাত্র হয়ে উঠবার প্রতিশ্রুতি ছিল -সেখানে ওরা জামায়াত-শিবিরের দলীয় রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে উঠেপড়ে লেগেছে। এবং দেশের অপরাপর তিনটি স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়েও একই ধাঁচের কাজ করছে ওরা। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, সিন্ডিকেট বা সিনেট নয় -শিক্ষকদের মূল্যায়ন করবে টোটালি শিবিরঘেঁষা ছাত্র সংসদ! ওদের ছাকনিতে বাছাইয়ে পড়া বিএনপি কিংবা অপরাপর রাজনৈতিক মতাদর্শী অথবা একেবারেই দলনিরপেক্ষ শিক্ষকেরা ওদের মবোক্রিসির ঠেলায় কোথাও টিকতে পারবে? গণমানুষ জীবন দিয়ে এক ফ্যাসিজম ঠেকায়ে দিয়েছে আরেক ফ্যাসিজমকে জায়গা করে দিতে? নাকি সর্বত্র শুদ্ধাচার ও ন্যায়নিষ্ঠা প্রতিষ্ঠা করতে?

মোদ্দাকথা দেশের বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদকে নানামুখী বিতর্কিত কর্মকান্ড দিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলছে সেখানকার ক্ষমতাসীনরা। ওদের কার্যকলাপে ত্যক্তবিরক্ত হয়ে কেউ কেউ পদত্যাগ করতেও বাধ্য হচ্ছেন। প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ, সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বাধীনতার অভাব এবং নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে যথাযথ মর্যাদা না পাওয়ার অভিযোগ তুলে গেল ৯ আগস্ট জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (জাকসু) সাংস্কৃতিক সম্পাদক মুহিবুল্লাহ শেখ জিসান পদত্যাগ করেছেন।

সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ফিরে দেখার সময় এসেছে, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদের নেতৃবৃন্দ শিক্ষার্থীদের ন্যায্য অধিকার রক্ষা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবার ক্ষেত্রে আদৌ কোনো ভূমিকা রাখছে, নাকি প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য দলবাজি দিয়ে তারা তাদের হীন রাজনৈতিক অভীপ্সা বাস্তবায়ন করছে।

লেখক: সাংবাদিক

১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

Comments

    Please login to post comment. Login