রক্তস্নাত ২৬ আগস্ট: ফুলবাড়ী গণঅভ্যুত্থান এবং আমাদের জাতীয় সার্বভৌমত্বের রূপরেখা
এস. এম. শুআইব ত্বাসীন

আজ ২৬ আগস্ট। বাংলাদেশের ইতিহাস-মানচিত্রে একটি রক্তাক্ত এবং স্বকীয় দীপ্তিতে উজ্জ্বল দিন। আজ থেকে ঠিক বিশ বছর আগে, ২০০৬ সালের এই দিনে দিনাজপুরের ফুলবাড়ীর রাজপথ পরিণত হয়েছিল এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও প্রতিরোধের প্রান্তর। কর্পোরেট পুঁজিবাদ, ক্ষমতার অন্ধ লিপ্সা এবং সাম্রাজ্যবাদী লুণ্ঠনচক্রের মুখে দাঁড়িয়ে সাধারণ কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি মানুষ সেদিন নিজেদের বুকের রক্ত দিয়ে রক্ষা করেছিল নিজেদের মাতৃভূমি, জল-জঙ্গল আর অস্তিত্ব। ফুলবাড়ী ট্র্যাজেডি আমাদের উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রকাঠামো, জ্বালানি নীতি এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বের নগ্ন বাস্তবতার এক ঐতিহাসিক দলিল।
ফুলবাড়ী আন্দোলনের সূত্রপাত কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে বহুজাতিক কয়লা কোম্পানি 'এশিয়া এনার্জি' (পরবর্তীতে জিএসিএমএম) উত্তরবঙ্গের উর্বর কৃষিপ্রধান অঞ্চলের নিচে থাকা বিশাল উচ্চমানের কয়লা সম্পদ উন্মুক্ত বা 'ওপেন-কাস্ট' পদ্ধতিতে উত্তোলনের নীলনকশা তৈরি করে। বহুজাতিক এই কোম্পানিটি তাদের মুনাফার অংক কষলেও, স্থানীয় জনগণের জন্য তা ছিল এক জীবন-মরণ সমস্যা।
বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা খনন করলে ফুলবাড়ীসহ পার্শ্ববর্তী বিস্তীর্ণ এলাকার প্রায় পৌনে এক লাখ একর কৃষি জমি এক নিমেষে ধ্বংস হয়ে যেত। বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছিল অন্তত কয়েক লাখ মানুষ। শুধু তা-ই নয়, ভূগর্ভস্থ পানির যে ভয়াবহ অবক্ষয় ঘটত, তাতে গোটা উত্তরবঙ্গ মরুকরণের দিকে ধাবিত হতো এবং সুন্দরবনের পরিবেশিক ভারসাম্যও হুমকির মুখে পড়ত। মাটির ওপরের জীবন, সবুজ ও জীবিকাকে বলি দিয়ে মাটির নিচের কয়লা তুলে বিদেশি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের পকেটে পুরে দেওয়ার এই রাষ্ট্রীয় প্রস্তাবনাকে তৎকালীন জনগণ সরাসরি 'জাতীয় আত্মহত্যা' বলে চিহ্নিত করে।
২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি এবং স্থানীয় অরাজনৈতিক গণসংগ্রাম পরিষদের যৌথ আহ্বানে ফুলবাড়ীতে এশিয়া এনার্জির অফিস ঘেরাও কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। ভোর থেকেই ফুলবাড়ীর সীমানা পেরিয়ে সমবেত হতে থাকে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ; কৃষক, দিনমজুর, সাঁওতাল ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারী-পুরুষ, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। একপর্যায়ে সেই প্রতিরোধ মিছিলে প্রায় অর্ধেকেরও বেশি জনতা সমবেত হয়ে মহাসমুদ্রে রূপ নেয়। বিকেল চারটার দিকে যখন মিছিলটি ফুলবাড়ী ব্রিজের দিকে অগ্রসর হয়, ঠিক তখনই তৎকালীন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিডিআর বিনা প্ররোচনায় মিছিলে কাঁদুনে গ্যাস, টিয়ারশেল ও নির্বিচারে তাজা গুলি বর্ষণ করে। মুহূর্তের মধ্যে ফুলবাড়ীর রাজপথ পরিণত হয় এক রক্তস্নাত যুদ্ধক্ষেত্রে। তাজা রক্তে ভেসে যায় ফুলবাড়ীর পিচঢালা পথ। তৎক্ষণাৎ শাহাদাত বরণ করেন তরিকুল ইসলাম, তৌহিদুল ইসলাম সালেকিন এবং মোহাইমিনুল আমিন। যার মধ্যে তরিকুল ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন মেধাবী ছাত্র। পঙ্গুত্ব বরণ করেন দুশোরও বেশি মানুষ; অন্ধ হয়ে যান বহু মানুষ। রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগের এই নির্মমতা জনগণকে ভয় পাইয়ে দেওয়ার বদলে পরিণত হয় এক দাবানলে।
২৬ আগস্টের এই হত্যাকাণ্ডের পরদিন থেকেই পুরো উত্তরবঙ্গ স্তব্ধ হয়ে যায়। ক্ষুব্ধ জনতা রেললাইন ও মহাসড়ক অবরুদ্ধ করে চার দিন ধরে পুরো অঞ্চলকে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। জনতার এই অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন সরকার পিছু হটতে বাধ্য হয়।
২০০৬ সালের ৩০ আগস্ট আন্দোলনকারীদের সাথে তৎকালীন সরকারি প্রতিনিধি দলের ঐতিহাসিক '৬ দফা চুক্তি' স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির প্রধান শর্তগুলোর মধ্যে ছিল:
১. ফুলবাড়ী থেকে এশিয়া এনার্জিকে অবিলম্বে বহিষ্কার করা।
২. উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা খনি প্রকল্প সম্পূর্ণরূপে বাতিল করা।
৩. ২৬ আগস্টের নির্মম হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও দায়ী পুলিশ-বিডিআর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া।
৪. শহীদদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ ও আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা।
৫. উন্মুক্ত পদ্ধতিতে খনি করার প্রস্তাবকদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দেশীয় সম্পদের ওপর জনগণের মালিকানা নিশ্চিত করা।
রাজনীতির দোলাচল ও দুই দশকের অপূর্ণ বাস্তবায়ন
আজ বিশ বছর পেরিয়ে গেলেও ফুলবাড়ী চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন একটি অপূর্ণ স্বপ্নই রয়ে গেছে। বিগত সরকারগুলোর সময়ে এশিয়া এনার্জি কিংবা তাদের দেশীয় সহযোগীরা রূপ বদলে বারবার এই এলাকায় নিজেদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছে। জনগণের রক্তে অর্জিত চুক্তিকে উপেক্ষা করে নতুন মোড়কে উন্মুক্ত খনি চালুর নানা চক্রান্ত হয়েছে। তবে ফুলবাড়ীর জাগ্রত জনগণ বারবার সেই চক্রান্ত নস্যাৎ করে দিয়েছে।
ফুলবাড়ী আমাদের শিখিয়েছে যে, তথাকথিত 'উন্নয়ন'-এর নামে সাধারণ মানুষের ভিটেমাটি কেড়ে নেওয়া, বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস করা এবং পরিবেশিক ভারসাম্য বিনষ্ট করার অধিকার কোনো করপোরেট শক্তি বা সরকারের নেই।
উপসংহার: আমাদের জাতীয় দায় ও শিক্ষা
আজকের এই ২৬ আগস্ট কেবল শ্রদ্ধা জানানোর দিন নয়; এটি আত্মপর্যালোচনারও দিন। বর্তমান বাংলাদেশে যখন আমরা নতুন করে সার্বভৌমত্ব, পরিবেশরক্ষা এবং জাতীয় সম্পদের ন্যায়সঙ্গত ব্যবহারের কথা বলছি, তখন ফুলবাড়ীর শিক্ষা সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক। জলবায়ু পরিবর্তনের এই চরম সংকটের যুগে আমাদের চিন্তা করতে হবে যে; আমরা কী বহুজাতিক পুঁজিপতিদের মুনাফার জন্য আমাদের উর্বর কৃষি জমি ও জলাশয় বলি দেব, নাকি পরিবেশবান্ধব ও টেকসই জ্বালানি নীতির দিকে এগোব?
যে তরুণদের রক্তে ফুলবাড়ী রঞ্জিত হয়েছিল, তারা কোনো ব্যক্তিস্বার্থের জন্য প্রাণ দেননি; দিয়েছিলেন আগামীর বাংলাদেশের পরিবেশগত নিরাপত্তা ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায়। আজকের দিনে ফুলবাড়ীর সেই সকল বীর শহীদ ও আহত সংগ্রামীদের প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা। ফুলবাড়ী অভ্যুত্থান আমাদের চেতনায় চিরকাল প্রজ্জ্বলিত থাকুক এক অনির্বাণ শিখা হয়ে।
২৬ আগস্ট, ২০২৬
এস. এম. শুআইব ত্বাসীন,
লাভ রোড, তেজগাঁও