"কবুল"
শব্দটি উচ্চারণ করতেই গলায় কাঁটার মতো বিঁধল শুকেন্তোর। নিজের জীবন বিনাশকর বিষ যেন এই মুহুর্তে তার গলায় কেউ ঢেলে দিয়েছে। মৃত্যু যন্ত্রণার ন্যায় বেদনায় চটপট করে উঠলো বুকের ভেতর।
নিজের অভিশপ্ত ভাগ্যকে আরো একবার ধিক্কার জানালো।
সত্তর উর্ধ্ব এক লম্পট বৃদ্ধ কে তিন কবুল বলে বিয়ে করতে হবে, এই কি ছিলো তার অদৃষ্টে।
তাও আবার এই বৃদ্ধের ২১তম স্ত্রী সে!
ভাগ্যটা এতো নির্দয়ভাবে না লিখলে কি পারতেন না খোদা?
"অবশ্য আমার ভাগ্য ভালো ছিলই বা কবে!"আনমনে হাসলো শুকেন্তো।
শেষ বার কবুল বলার জন্য তাড়া দিলো। নিজের সামনে বসা ভয়ংকর দানবীয় মানুষটির ভয়ে ঢুক গিললো শুকেন্তো।
"কবুল"শব্দটি ঠোঁট নাড়িয়ে উচ্চারণ করল কোনোরকম।
সাথে সাথে ই ভয়ংকর ভাবে জয়ের হাসি দিলো মানুষ নামের বিভৎস লোকটি।
প্রতিটি মেয়ের মতো শুকেন্তোর মনেও তার বিয়ে নিয়ে লাজুক একটা স্বপ্ন আঁকা ছিলো।
তাকে ভালোবেসে জয় করে নিবে কোনো এক রাজপুত্র। রাজ্য না থাকলেও রাণীর মতো রাখার প্রতিশ্রুতি দিতে বুক কাঁপবে না যার।
অজানা অনুভূতি, মায়া জড়ানো সুখ, মৃদুমন্দ বুকের ব্যথা আর অচেনা এক ভয় জড়িয়ে বিয়ের পিড়িতে বসবে। তার পাশে ভূবণ ভোলানো হাসি নিয়ে থাকবে তার মা। অশ্রুসিক্ত নয়নে বারংবার আস্বস্ত করবে তাকে।
অথচ আজ?
কোথায় মা? কোথায় সেই রাজ্যহীন রাজপুত্র? কিছু ই নেই তার পাশে।
আছে এক দানবীয় অবয়ব। যাকে মানুষ হিসেবে ভাবতেও ঘেন্না হয় শুকেন্তোর।
--------------------------------
শুকেন্তো।
শুক্রবারে জন্ম তাই মা আদর করে নাম রেখেছে শুকেন্তো।
মায়ের একমাত্র সন্তান শুকেন্তো। গ্রামের এক গৃহস্থ পরিবারে কাজ করতো মা শাহানা আক্তার। বাবার আরেকটি সংসার থাকায় সেখানে তাদের ঠাঁই হয়নি কখনো।
শাহানা শান্ত, নিরীহ মহিলা।জোট ঝামেলা পছন্দ করেন না। তাই মেয়েকে নিয়ে নিজের মতো করে থাকেন। কিন্তু বিপত্তি বাঁধলো মেয়ে একটু বড় হতেই।
বাড়ন্ত শরীর, ফুটন্ত গোলাপের মতো স্নিগ্ধ কোমল মুখাবয়ব। ফর্সা না হয়েও কারো রুপ যে আকর্ষণীয় সুশ্রী বহন করে তার উদাহরণ শুকেন্তো। ঘন কালো পাপড়ি তে ঢাকা বড় টানা টানা দুটি চোখ।
ঘন কালো তেল চিটচিটে চুল।
ময়লা জামাতেও এই শ্যামবর্ণা মেয়েটি কে দারুণ মানিয়ে যায়।
শাহানা নিজে কষ্ট করলেও মেয়েকে পড়াশোনা করাতে চান। কিন্তু এই মেয়ে পড়াশোনায় একেবারে শূন্য মেধার। তাই তিনবছর ধরেই আঁটকে আছে ক্লাস থ্রি তে। তবুও হাল ছাড়েন না শাহানা আক্তার। শিক্ষকদের অনুরোধ করে আবার ভর্তি করিয়ে দিয়েছেন।
একবার টানা জ্বরে পড়লেন শাহানা। ঘরে চাল-ডাল টুকুও নেই। বাধ্য হয়ে কিশোরী মেয়েকে পাঠালেন ঐ গৃহস্থ বাড়ি কাজে। কাজ না করেও গত কয়েকদিন ধরে এটা ওটা এনে খাচ্ছে। এমনি এমনি আর কত দিবেন তারা। নির্ঘাত মুন্সি বাড়ির গৃহিনী আপা টা ভালো মানুষ। তাই এতটুকু সহায়তা পেয়েছে।
কদিন শুকেন্তো যাক, হাতের কিছু কাজ করে দিক। চেনা জানা মানুষ ই তো।
নিজেই খুশি মনে মুন্সী বাড়ি পাঠালেন মেয়েকে।
প্রচন্ড ঝড়-বৃষ্টি শুরু হয়েছে দুপুরের পর। বাতাসের ছুটে ঘরে টেকাও দায় যেন!
মেঘের গুমোট আঁধারে ক্ষণে ক্ষণে বজ্রপাতের ঝংকার। শিলাবৃষ্টি তে টুপ টাপ শব্দ ঝনঝনিয়ে উঠছে।
এমন সময় প্রকৃতির সমস্ত তান্ডব কে মাথায় নিয়ে শুকেন্তো ছুটে এসে মায়ের বুকে ঝাপিয়ে পড়ে।
মেয়েটা কাঁপছে আর কাঁদছে।
কথা বলার অবস্থায় নেই। কোনো রকমে লজ্জা ঢাকা দেওয়া জামার অনেকাংশে ই ছেঁড়া।
মায়ের বুকে মুখ গুজা অবস্থায় ফুঁপিয়ে বললো-মা,,,ও বাড়ির রতন আমাকে,,,!
মেয়ের বুক সাথে সাথে হাত দিয়ে চেপে ধরলেন শাহানা। মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করলেন।
মেয়েকে কোনো প্রশ্ন করার প্রয়োজন মনে করলেন না শাহানা। এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছেন অনবরত নৃত্য করা কাঁঠাল চাপা গাছের ডালে। কতটা ভয়ংকর পরিস্থিতি হলে এমন সময় তার মেয়েটা ছুটে আসলো তার কাছে, তা একজন মায়ের মন সহজেই বুঝতে পারে।
শাহানা আক্তারের কোমল চেহারায় ফুটে উঠলো ভয়ংকর তেজ।নিজের জীবনের প্রতিফলন যেন চোখের সামনে আবারো দেখতে পেলো। নিরীহ শাহানার শান্ত দিঘির মতো চোখ লাল হয়ে উঠলো।
কঠিন মূর্তি ধারণ করা শাহানা অস্পষ্ট স্বরে উচ্চারণ করলো-" এই জগতে ঘূর্ণিঝড়, সিডর,প্রলয়ংকরী সব তান্ডবের চেয়েও ভয়ংকর একজন বিকৃত পুরুষের রুপ। আর সেই বিভৎস মস্তিষ্ক ধ্বংসে একজন মা-ই যথেষ্ট। "
খাটের নিচ থেকে শাহানারার ব্যক্তিগত পুরনো টিনের ট্রাংক টি বের করলেন। হাতে তুলে নিলেন বহুবছর আগে লালে রঞ্জিত হওয়া সেই রাম দা।
ঝড়-ঝঞ্ঝা উপেক্ষা করে পা বাড়ালেন বাইরে।
শুকেন্তো নির্বাক চেয়ে আছে মায়ের এই রুপ।-ধূসররঙের শাড়ির আঁচল মাটিতে। চুলের বড় গোঁ ছাঁটা কাঁধের ডান-পাশ হয়ে সামনে চলে এসেছে।
মিনিট পাঁচে কের মধ্যেই ফিরে এসেছে শাহানা। হাতের কব্জি বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে রক্ত। ভেজা শাড়িতে রক্তের ফোঁটা গুলো কালো কোনো দাগের মতো দেখাচ্ছে। হাতের মুঠোয় কিছু একটা শক্ত করে ধরে আছে।
সেই টিনের ট্রাংক থেকে একটা বাক্স বের করলেন। সেই বাক্সে হাতে থাকা জিনিস টা রাখলেন। পাশাপাশি একই রকম দুটো জিনিস। একটা নিজের কিশোরী জীবনে রেখেছিলেন। আর আজ বিশ বছর পর সেই বাক্সে পাশাপাশি স্থানে আবারো,, রাখলেন।
কুটিল হাসি দিয়ে কাঁধ বাকিয়ে মেয়েকে বললেন -গোসল করে আয় শুকেন্তো। যতক্ষণ খুশি মাথায় পানি ঢালবি। এই নৃশংস পৃথিবীর বুকে টিকে থাকতে হলে চতুরতা শিখতে হবে মা। মাটির মতো নরম মনটা কে প্রয়োজনে বিবর্তিত করতে হবে কঠিন পাথরে।
করতে হবে পাথুরে পাথার।"
মায়ের এমন নির্লিপ্ত কণ্ঠে কিশোরী শুকেন্তোর বুক আরো তীব্র ভয়ে গুটিয়ে গেলো। তার মায়ের এই কন্ঠস্বর যে তার বড্ড অচেনা লাগছে।
পর্ব-১
গল্প: শুকেন্তো(পাথুরে পাথার গ্রন্থের একটি গল্প)