জামিলা ফুপি।নামের মতোই ও দেখতেও সন্দরী।চোখটার দিকে তাকালে মনে হয় ওই মিচমিচে কালো তারাটা থেকে এখনই ঝরে পড়বে কয়েক ফোটা জল।কাঁচা হলুদের মতো গায়ের রং।হাতদুটো রুটি বানানো বেলনের মতো সুঢৌল।চুলগুলো একটু কোঁকড়ানো।
ফুপিকে আমি যতোবার দেখেছি শাড়ির কুচি ভাঙা দেখিনি কখনো।যেন ঠোটে কেউ হাসি এঁকে দিয়েছে।কিন্তু হাসিটা কেমন শুকনো।যেন বহুদিন না খেয়ে থাকা মানুষের মুখ।
ফুপিকে আমি যখনই দেখি কেমন তার দিকে আমি তাকাতে পারি না। একটা অপরাধবোধ কাজ করে। আমি হয় দৃষ্টি নামিয়ে নেই নয়তো চারপাশ দেখবার বাহানায় ঘুরে তাকাই।
জমিলা ফুপি। আমার রক্তের কেউ না। কিন্তু ফুপি এতোই অমায়িক আর মমতাময়ী যে তাকে আমার পাড়ার সবাই নিজের ফুপির মতোই জানে।ফুপি যখন বাড়িতে আসে তখন কৌটা ভর্তি চকোলেট,বিস্কুট আর আঙ্গুর নিয়ে আসে।কালো কালো গোল গোল আঙ্গুর।সে হয়তো অন্য কিছুও নিয়ে আসতে পারে কিন্তু আমানে না। এই আঙ্গুরের প্রতি ফুপির ভালোবাসা এতো কেন সে আমরা জানি না। আমরা ছেলে পেলেরা ফুপি এলে দৌড়ে চলে আসতাম তার কাছে।কেউ একজন দেখলো ফুপিকে তো ভো দৌড়।ওই রিতু,মিতু, সাম্য,সিয়াম, হাবিব তাড়াতাড়ি আয়।জমেলা ফুবু আইছেএএএএ।
আমরাও হাতের ডাঙ্গুলি,গুলতি ফেলে আর টায়ার গাড়ি থামিয়ে দে ছুট।
ছুট্টে গিয়ে ফুপির সামনে। ফুপি যেন এই মুহুর্তটার জন্যই ওয়েট করছিলো।একগাল হাসি দিয়ে আমাদের কাঙ্খিত বস্তুগুলো বের করতে থাকে।সবার চোখ জ্বলজ্বল করে ওঠে।ফুপি এক এক করে সবার হাতে দুটো দুটো ছয়টা বস্তু তুলে দেয়।প্রথম জনকে দিলো তো পরের জনের তর সয় না। কখন হকতে পাবো আর টপাটপ গিলবো।ফুপি যেন আমাদের মনের কথা বুঝতে পারে। একেক জনের হাতে খাবার তুলে দেয় আর মাথায় চুলে হাত বুলিয়ে দেয়।আমরা খাবার হাতে নিয়ে একেকজন ঘুরঘুর করি চারদিকে।তাড়াতাড়ি খেয়ে ফেললে তো শেষ হয়ে যাবে।
ফুপি তাড়া দেয়-বাবু তোরা খা। আমি দেখি।
আমি টুপ করে একটা আঙ্গর মুখে দেই।ফুপি কেন যেন আমাকে বেশি আদর করতো। আমি দেখতে একটু গোলুগোলু ছিলাম বলেই কি না। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতো সে। আমি তার আদোর গিলে গিলে খাইতাম।
ফুপি আমাদের জন্য একটা ফুটবল নিয়ে আসছে এইবার।একটা গোল গোল জিনিস। যাকে সারাক্ষণ পা দিয়ে ঠেলতে হয়।বল পেয়েই আমরা খেলতে শুরু করলাম।ফুপি তাকিয়ে থাকলো শুধু।ফুপির চোখ ভিজে গেলো কি? আমার অতো দেখবার সময় কই?
রাতে আমি আর ভাইয়া পড়তে বসেছি।এমন সময় ফুপির কান্নার শব্দ শুনতে পেলাম। কেমন হাউমাউ করে কাঁদছে ফুপি।আমরা দু ভাইবোন দৌড়ে গেলাম। মা জানে ফুপি কাঁদছে। আমাদের ফেড়ালে আমরা ফিরবো না। তাই না করলো না। শুধু বললেন--
এই সাবধানে যা। আছাড় খেয়ে পড়বি।
গিয়ে দেখি ফুপি উঠোনে বসে কাঁদছে।দাদু ঘরে শুয়ে।সবসময় দেখতাম ফুপি দাদুকে কেন যেন সহ্য করতে পারতো না। দাদুকে দেখলেই ফুপি ক্ষেপে যেতো।
এখনো দাদুকে সে অভিশাপ দিচ্ছে।
-- তুই আমার জীবনটা শেষ করে দিছোস।তোর এতো খিদা ক্যা।আর কতো খাবি তুই?মরতে পারস না তুই?
আমার বুকটা কেমন আহত পাখির মতো হুহু করে উঠলো। ফুপির এতো কষ্ট কিসের? ইচ্ছে করছে ফুপির সব কষ্ট দূর করে দেই।কিন্তু সেইটা কিভাবে?
আমি বড় হলে পারবো তো? আহ্।কবে বড় হবো?
ফুপির কষ্ট দূর করতে, পারলে এখনই বড় হয়ে যাই।
এরপর অনেকদিন আর ফুপিকে দেখিনি।বুড়ো দাদু মারা গেছে।ফুপিও আর গ্রামে আসে না। নাকি আসে যখন আমি শহরে থাকি। আসলে আমার কলেজ শহরে। বাড়ি থেকে যাতায়াতে কষ্ট তাই হোস্টেলে উঠে গেছি।
কয়েকদিন হলো একটা ছেলে আমার পেছনে ঘুরঘুর করে।আমি প্রাইভেট পড়তে কিংবা কিছু কেনাকাটা করতে বের হলাম তো তার সাথে দেখা হয়ে যায়।এটা কাকতালীয় নাকি সে আমার জন্য ওয়েট করে বুঝি না। ছেলেটার চেহারা কার সাথে যেন মিলে যায়।আমি ভাবতে থাকি। কিন্তু মনে করতে পারি না। মনে হয় ওই চোখ মুখ ঠোট আমি আগেও কোথাও দেখেছি।
গ্রীষ্মের ছুটিতে বাড়ি আসছি দুদিন হলো। আম, কাঠালের মৌসুম। আব্বা ভীষন কাঠাল পছন্দ করে। আম ও পছন্দ করে। আব্বা আসলে খেতে ভালোবাসে খুব।
আমিও কিছুটা আব্বার মতো। ফুডি বলতে পারো। সারাদিন শুধু খাই খাই করে বেড়াই।মাও এটা সেটা করে সারাক্ষণ।
আছরের পর আমরা কয়েকজন হাঁটতে বের হইছি।মসজিদের সামনে যেতেই দেখি ছেলেটা।আমাকে দেখে মিষ্টি করে হাসলো। হাসিটা দেখে আমারও ভালো লাগলো।
রিতুরা কি বুজলো জানি না। কিন্তু কথাটা মায়ের কানে পৌছে গেলো।
আব্বা রাতে রক্তাক্ত প্রান্তর নাটকটা পড়ে শোনাচ্ছে।আসলে আব্বা মন্চ নাটকের সাথে যুক্ত।আব্বা যখন পড়ে মনে হয় ঘটনাগুলো আমার চোখের সামনে ঘটছে।যুদ্ধের ঘটনা গুলো যেন চাক্ষুষ করছি।তরবারি আর ঢাল তলোয়াড়ের ঝনঝনানি শুনতে পাই।
হঠাৎ দরোজায় চোখ পড়লো।দেখি মা ইশারায় ডাকছে।
-- আব্বা বাকিটা পড়ে শুনবো নি। আজ থাকুক।
আব্বা পড়া থামালো না। আমি উঠে গেলাম।
মা আমার হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে পাশের ঘরে গেলো।
আমার হাত চেপে ধরে বলতে লাগলো--
এইসব কি শুনতাইছি মাইয়া?
আমার বুকের ভেতর কেমন ঘন্টাধ্বনি বাজতে লাগলো। কি করেছি আমি?
মা কেমন উদভ্রান্তের মতো করছে। যেন অপ্রকৃতিস্থ মা।কোনো ভয়ঙ্কর ঝড়ের পূর্ভাবাস শুনে ফেলেছে সে।
-বল। তোর সাথে সামির কি সম্পর্ক?
আমি যেই ভয়টা পাচ্ছিলাম। ও তার মানে রিতু এসে লাগিয়ে দিয়েছে কথাটা।
মা ওর সাথে আমার--
আমার কথা মুখে থাকতেই মা বলতে শুরু করলো
-- ও কে তুই জানিস?
নাতো।কে?
তোর জামিলা ফুপির ছেলে।
ও তাইতো আমার এতো চেনা চেনা লাগছে।ফুপির চেহারার সাথে মিল আছে।কিন্তু ফুপির যে ছেলে আছে আমি তো সেইটাই জানি না।
--কিন্তু ওর বাপের নাম কি ও নিজেই জানে না।
মানে? আমি বসা থেকে উঠে দাঁড়ালাম।মায়ের মুখে এমন কথা শুনবো ভাবি নি।কিন্তু মা মিথ্যে কেন বলবে?
শোন --
এর পর মা যা বলল তার সারকথা এই--
জামিলা ফুপি যখন গায়ে গতরে একটু বড় হইলো বুড়া দাদু ওরে একদিন বললো- চল তোরে তর ঝি এর বাড়ি ঘুরবার নিয়া যাই।
সে তো মহাখুশি।যদিও কোনোদিন যায় নাই সে ও বাড়ি।তবে অভাবের সংসার ওদের। সেখানে গেলে অন্তত পেট ভরে ভাত খেতে পারবে দুবেলা সেই খুশিতে সে ঠোঁটে গোলাপি আলতা মেখে আগে আগে রওনা দিলো। তার জন্য কোন বিপদ অপেক্ষা করছিলো কি না হসে চিন্তাও করে নাই।
কতদূর পায়ে হেঁটে, কতদূর রিক্সায় করে সেখানে পৌঁছালো। যখন বাড়ির গেটের কাছে নামলো তারা ততক্ষণে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। বড় মসজিদের মাইক থেকে আজান ভেসে আসছে।
জমিলা ফুপি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে শুধু।কেমন অদ্ভুত জায়গা।সন্ধ্যা হয়ে গেছে তবু মহিলারা এমন আজগুবি সাজে সেজে দাঁড়িয়ে আছে কেন?কারও হাতে বিড়ি,কেউ হাসছে,কেউ আয়নায় নিজের মুখ দেখছে।
আজান শুনে দু একজন মাথায় কাপড় টেনে দিলো।
জামিলা ফুপি এসব দেখে ভরকে গেছে কিছুটা।তার পা চলছে না।
দাদু তার হাত ধরে টানতে টানতে ভেতরে নিয়ে গেলো। এটা কি সত্যি ঝি এর বাড়ি?
তাহলে এমন কেন?
কেমন ছোটো ছোটো রুম শুধু।বেশিরভাগ কক্ষের দরোজা লাগানো। কোন কোন ঘর থেকে হাসির শব্দ ভেসে আসছে।
দাদু একটা ঘরের সামনে গিয়ে দাড়ালো। ফুপি দাদুর হাত শক্ত করে ধরে আছে।ওরা ঘরের ভেতর প্রবেশ করলো।
বিভিন্ন আসবাবে সাজানো ঘরটায় একজন মহিলা পা মেলে আধশেয়া করে আছে। একটা মেয়ে পা টিপে দিচ্ছে।
আর একজন মাথার চুল বিনুনি করছে।ফুপি দের দেখে মহিলা সোজা হয়ে বসলো।
দাদু একগাল হাসি দিয়া মেঝেতেই বসে পড়লো।
-- তোর ভাস্তি নিয়া আইছি কি করবি কর।ওর একখান গতি কইরা দে।
মহিলা পান চিবোতে চিবোতে বললো -- রাইখ্যা যা। দেহুমনে।
জমিলা ফুপি ভয়ে কুঁকড়ে আছে।দাদুর গা ঘেঁষে বসে আছে সে।
ফুপির ঝি দাদুর হাতে ৫০০ টাকার একটা নোট ধরিয়ে দিলো। আর কাকে যেন ডাক দিলো।
-- এই রবি। এইদিকে আয় তো।
একটা লোক এলো হন্তদন্ত হয়ে। হাত কচলে বলল-
কি করন লাগবো কন ম্যাডাম।
আমার ভাইরে হোটেল থেইকা কিছু খাওয়া। আর রাইতে তোর সাথে রাহিস।সকালে উইঠা যাইবো গা।
আইস্যা।- বলে লোকটা চলে গেলো।
জমিলা ফুপির কান্না পেয়ে গেলো। কিন্তু দাদুর সেদিকে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই।সে শুধু ফুপিকে বলল--
কয়দিন থাক।তোর ঝি তোরে সব ব্যবস্থা কইরা দিবো। ডড়াইস না।
এ বলে ঘর থেকে বেড়িয়ে গেলো। ফুপি ভয়ে গুটিশুটি মেরে আছে।কেমন কান্না পাচ্ছে কিন্তু ভয়ে কাঁদকেও পারছে না।
এই মহিলাকে ফুপির আপন কেউ মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে কোনো রুপকার রাক্ষসী। যে কি না রাজ্যের সুন্দরী সুন্দরী অল্প বয়স্ক মেয়েদের তুলে নিয়ে যেতো আর রাক্ষস রাজাদের খুশি করতো।
যে মেয়েটা পা টিপছিলো তাকে বলল- এই লিলি ওরে কিছু খাইতে দে তো।
মেয়েটা এক প্লেট ভাত সাথে বোয়াল মাছের তরকারি।
ফুপি গোগ্রাসে গিললো সেগুলো। আহা!কতোদিন ভরপেট খায়না ফুপি।খাওয়ার পরে ভয় একটু কমলো যেন।
এবার মহিলার চুলে বিলি কাটছিলো যে মেয়েটা তাকে বলল--
ওরে একটু সাজাইয়া দে তো।
এই রাত করে ফুপি সাজবে কেন? সেইটা বুঝতে পারছে না সে।
মেয়েটা একটা কৌটার ভেতর থেকে সাজগোজের জিনিস বের করে ফুপিকে সাজিয়ে দিলো। ফুপি এমনিতে চাঁদের মতো সুন্দর।তার উপর তাকে মেকাপ দিয়ে সাজালো। সস্তা মেকাপ কিন্তু ফুপিকে বেমানান লাগছে না। তার রুপ যেন জোসনার মতো ঠিকরে বেরোচ্ছে।
বেশ রাত হয়ে গেছে।ফুপির ঘুম ঘুম লাগছে।চোখ লেগে আসছে কেমন। কিন্তু আচমকাই তন্দ্রা কেটে যাচ্ছে।
মেয়টা ফুপিকে একটা ঘরে নিয়ে গেলো। সেখানে তেমন আসবার নেই।একটা খাট,একটা টেবিল।টেবিলের উপর একটা প্লাস্টিকের জগ আর একটা কাচের গ্লাস।
মেয়েটা দুটো ট্যবলেট খাইয়ে দিলো ফুপিকে।কিসের ট্যবলেট সে জানেও না। কিন্তু ঘুম ছুটে গেলো।
মেয়েটা দরোজার সামনে দাঁড়িয়ে কার সাথে যেন কথা বলছে। একটা পুরুষ কন্ঠ ভেসে আসছে।
মেয়েটা একটা ছেলেকে সাথে নিয়ে ঘরে ঢুকলো। ফুপির পাশে বসিয়ে দিয়ে বললো
--বাহ্।দুইজনরে মানাইছে তো।বলে দরোজা চাপিয়ে দিয়ে হাসতে হাসতে চলে গেলো।
ফুপি ভয়ে মরে যায় অবস্থা। ছেলেটা দরোজায় সিটিকিনি লাগিয়ে ফিরে এলো। ফুপি করুন স্বরে বলল
-- আপনে কেডা? দরোজা লাগাইতেছেন ক্যান?
আমি বাইরে যামু।
ফুপি উঠতে চাইলে ছেলেটা ফুপির হাত ধরে ফেলল।সে নগদ পঞ্চাশ টাকা দিয়েছে। সে টাকা অসিল তো তার করতেই হবে।
ফুপি চিৎকার করতে চাইলো। ছেলেটা ধমকে উঠলো
-- কানবি তো মাইরা ফালামু।
ফুপি ভয় পেলো। সে কাঁদছে কিন্তু শব্দ বের হচ্ছে না। শুধু চোখের জল গড়িয়ে পড়ছে। দাদু আর ফুপি কতো কাছে।দাদু হয়তো ৫০০ টাকা বুকে নিয়ে শান্তির ঘুম দিচ্ছে। এপাশে মেয়ে তার সম্ভ্রম হারানোর কষ্টে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে।
এরপর শুরু হলো ফুপির অবর্ননীয় কষ্টের জীবন।রাত যায় খদ্দের বদলায়।ফুপি কোমল স্বভাবের। সে কারও সাথে কোনো কথা বলে না এখানে। চুপচাপ থাকে আর মনে মনে বেরোনোর পথ খোঁজে।কিভাবে সে মুক্তি পাবে এই কঠিন অন্ধকূপ থেকে।
কিন্তু একটা টেনশানের কারন ঘটে গেছে। গত চান্দে ফুপির মাসিক মিস করে গেছে। মানে পিরিওড হয়নি এ মাসে। ফুপি কাওকে বলতেও পারছে না। সরদারনি মহিলাকে বলার মতো সাহসও তার নেই।
একটা ছেলে প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে আসতো ফুপির কাছে। ফুপির সাথে একটা ভালো বন্ডিং হয়েছে তার।
ফুপি সাহস করে তাকে বলেই ফেলল--
জাবেদ, আমার মনে অয় বাচ্চা পেটে রে। জাবেদ জানে ফুপি মিথ্যে বলার মেয়ে নয়।তাই তার কপালে চিন্তার ভাজ পড়লো।
সে ফুপিকে বললো-- আমি তো আজ প্রস্তুতি নিয়ে আসি নাই।সামনে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত অপেক্ষা কর। আমি তোকে এখান থেকে নিয়ে যাবো।
ফুপি আবেগে জাবেদ কে জড়িয়ে ধরলো।
ফুপির অপেক্ষার প্রহর কাটে না। সপ্তাটাহ্ যেন একটু বেশিই লম্বা এইবার।
বৃহস্পতিবার বিকেল থেকেই ফুপি সব গোছগাছ করে রেডি।সন্ধ্যা যায় ফুপি দরোজার দিকে তাকিয়ে থাকে।রাত দশটা, এগারোটা, বারোটা বেজে যায় জাবেদ আর আসে না।
রাতের শেষ প্রহরে ফুপি বুঝতে পারলো আশা করে লাভ নেই।সে সবকিছু রেখে দিলো। আর ভাবলো সব পুরুষ এক। শুধু প্রয়োজনে কাছে আসে। আর মিষ্টি কথা শুনিয়ে হারায়।
আসল ঘটনা ফুপি কি করে জানবে? বাস্তবতা তো এটা যে -- জাভেদ সে রাতে টাকা পয়সা নিয়ে ঠিকই বের হয়েছিলো। কিন্তু বাস স্ট্যান্ডের কাছে আসতেই পুলিশ ধরে ফেলে ওকে। অকারনে জেলে পুড়ে দিলো তাকে।বিধাতা ফুপির ভাগ্য নিয়ে খেলা চালিয়ে যেতে লাগলো।
ফুপির মুক্তি পাওয়া হলো না অন্ধকার কারাগার থেকে।
এদিকে পেট ভারি হতে শুরু করেছে।ফুপির টেনশান বাড়ছে।কারও সাথে শেয়ারও করতে পারছে না। আহারে মা হওয়ার দিনগুলায় আপনজন পাশে না থাকার যে কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। ফুপির ঘুম হয়না, খাবার খেতে পারে না। কেমন যেন শ্বাসকষ্ট হয়।যেন দুনিয়ায় বাতাসের অভাব পরে গেছে।
মহিলা খদ্দের পাঠায় ঠিকই ঘরে। তাদের হাতে পায়ে ধরে বুঝিয়ে সুজিয়ে ফেরত পাঠিয়ে দেয় ফুপি।
ফুপি দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে সব। আর বুড়া দাদুকে অভিশাপ দেয়।
ফুপি মনে মনে আবার প্লান সাজাতে লাগলো।কি করে এখান থেকে বেরোতে পারবে সে।সেই সুযোগ স্রষ্টা করে দিলো।একটা সুন্দর দেখতে লোক। প্রায় ছত্রিশ সাইত্রিশ বছর বয়স।দেখতে সুঠাম দেহের অধিকারী। পেশায় ড্রাইভার।ফুপি তাকে সবটা বলল।লোকটা বুঝলো। বললো-- চলো এখান থেকে।
ফুপি খুশি মনে রাজি হলো। লোকটা ফুপির হাত ধরে এগোতে লাগলো। মহিলার সামনে গিয়ে বলল--
আমরা এখান থেকে চলে যাচ্ছি।
অন্য কারও ক্ষেত্রে হলে মহিলা হয়তো আটকে দিতো।টাকা দাবি করতো। কিন্তু ফুপির বেলায় কিছুটা দিল নরম হলো। শুধু বলল--
সাবধান। ওরে ধোঁকা দিবার সাহস করিস না।
ফুপিকে বাড়ি নিয়ে গেলো। বাড়িতে সবার কাছে পরিচয় দিলো-- আমরা বিয়ে করেছি। আমরা স্বামী- স্ত্রী।
বাড়ির মেয়ে হলে হয়তো ঝামেলা করতো। কিন্তু ছেলে বৌ নিয়ে আসছে। সবাই প্রথমে হাউকাউ করলেও পরে মেনে নিলো।
তাছাড়া ফুপির মুখ দেখে তারা হয়তো মনে মনে খুশিই হয়েছে। এতো সুন্দর বৌ তারা খুজলে পেতো কিনা সন্দেহ।
একদমে কথাগুলো বলে মা মা সবশেষে যে কথাটা বললো তাতে আমার কানে যেন কেউ গরম শিশা ঢেলে দিলো।
মা বললো--সামি তোর জামিলা ফুপির সেই ছেলেটা।যার বাবার নাম কি কেউ বলতে পারে না। ও পিতৃপরিচয়হীন।না জায়েজ সন্তান।
আমি অস্বীকার করতে পারবো না যে সামির প্রতি আমার কোনো ফিলিংস নেই।কিন্তু কেন?সামির পরিচয় নেই কেন?
এই সমাজ জামিলা ফুপিদের কেন এভাবে পদে পদে মনে করিয়ে দেয় ওদের আলোতে আসতে নেই।অন্ধকারেই ওদের স্থান।
ক্ষমা করো ফুপি।আমিও ওদের একজন যারা সমাজের প্রথাবিরুদ্ধ সিদ্ধান্ত নিতে পারবো না।
ছোটো বয়সে ভাবতাম কবে বড় হবো আর ফুপির কষ্ট দূর করবো।বড় তো হলাম কিন্তু কষ্ট লাঘব করবার পরিবর্তে আরও বেশি কষ্টের কারন হলাম।
--সায়মা সালাম।