অপ্রতিমের মতো একটি মৃত্যু আমাদের সম্মিলিত বিবেককে নাড়া দেয়। এই নাড়া খাওয়ার পর আমাদের প্রথম প্রতিক্রিয়া হয় নৈতিকীকরণ। আমরা একটি শোককে দ্রুত একটি শিক্ষায় রূপান্তরিত করতে চাই। এবং সেই শিক্ষার সবচেয়ে সহজলভ্য উপকরণ হলো পরিবার।
বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত সমাজে গত দুই দশকে 'প্যারেন্টিং' একটি নতুন ডিসকোর্স হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এটি একটি আমদানি করা, নগর-কেন্দ্রিক, উচ্চবিত্ত-মধ্যবিত্তের ভাষা। এই ডিসকোর্সটি আমাদের স্বস্তি দেয়। এটি আমাদের বলে, সমস্যাটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য। আপনি যদি সঠিকভাবে প্যারেন্টিং করেন, আপনার সন্তান নিরাপদ থাকবে।
কিন্তু এই স্বস্তিটি একটি ভ্রান্ত স্বস্তি। কারণ এটি সমস্যার দায়কে ব্যক্তিগত পরিসরে, পারিবারিক পরিসরে ঠেলে দেয়। রাষ্ট্র, সমাজ, রাজনীতি - এই বৃহত্তর কাঠামোগুলো তখন দায়মুক্ত হয়ে যায়। অপ্রতিমের হাতে আইফোন থাকাটা একটি ফ্যাক্ট, কিন্তু তার চেয়েও বড় ফ্যাক্ট হলো, একটি ১৩ বছরের কিশোর কেন এমন একটি পরিমণ্ডলে বড় হচ্ছে যেখানে একটি আইফোন তাকে সহিংসতার, আধিপত্যের, এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে পারে?
আপনারা যখন আঙুল উঁচিয়ে বলছেন "বাচ্চাটা কেন বখাটেদের সাথে মিশতো?", তখন যে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি আপনারা এড়িয়ে যাচ্ছেন তা হলো – আমাদের পাড়ায়, মহল্লায় 'বখাটে' তৈরি হওয়ার কারখানাটা কীভাবে চলছে? কারা তাদের পৃষ্ঠপোষক? তাদের হাতে ক্ষমতার যে ছোট ছোট উৎস, তা কোথা থেকে আসে?
আধুনিক মনোবিজ্ঞান এবং সমাজবিজ্ঞানে একটি প্রতিষ্ঠিত সত্য আছে – শিশুর বিকাশের জন্য দুটি জিনিস একসাথে প্রয়োজন: নিরাপদ আশ্রয় এবং উন্মুক্ত আকাশ। আপনি যখন তাকে একটি নিরাপদ বেজমেন্ট দেবেন তখন একইভাবে তাকে পৃথিবীর সাথে নিজের মতো করে মোকাবিলা করার স্পেসও আপনাকে দিতে হবে।
আমাদের সমাজে এখন প্যারেন্টিং-এর নামে যা চলছে, তা অনেক ক্ষেত্রেই এই দ্বিতীয় অংশটিকে অস্বীকার করে। আমরা শিশুকে ঘিরে একটি দুর্ভেদ্য দুর্গ তৈরি করতে চাই। তার স্কুল, তার কোচিং, তার বন্ধু, তার ফোন, তার ফেসবুক - সবকিছু নজরদারির আওতায় আনতে চাই। এই নজরদারির পেছনে ভালোবাসা আছে, এতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু এই ভালোবাসার ভেতরে একটি গভীর ভয়ও আছে। তা হলো এই সমাজের প্রতি ভয়, এই রাষ্ট্রের প্রতি ভয়।
মা-বাবা জানেন, বাইরের পৃথিবীটা আর আগের মতো নিরাপদ নয়। তারা জানেন, একটু অসাবধান হলেই তাদের সন্তান 'বিপথে' চলে যেতে পারে। এই ভয়টি অমূলক নয়। কিন্তু এই ভয় থেকে যখন অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ জন্ম নেয়, তখন তিনটি ঘটনা ঘটে।
প্রথমত, শিশুর স্বাভাবিক কৌতূহল, তার ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা, তার নিজের মতো করে ভুল করে শেখার প্রক্রিয়াটি বাধাগ্রস্ত হয়। একটি শিশু যদি কখনোই হোঁচট খেতে না পারে, সে হাঁটতে শেখে না।
দ্বিতীয়ত, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ শিশুর ভেতরে দুটি বিপরীত প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। একটি অংশ বিদ্রোহী হয়ে ওঠে, সে গোপন করতে শেখে, দ্বৈত জীবনযাপন করতে শেখে। আরেকটি অংশ অতিমাত্রায় নির্ভরশীল, উদ্বিগ্ন এবং সিদ্ধান্তহীন হয়ে পড়ে। উভয়ই মানসিক অস্বাস্থ্যের লক্ষণ।
তৃতীয়ত, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, প্যারেন্টিং দিয়ে আপনি একটি অসুস্থ সমাজের ভাইরাস থেকে আপনার সন্তানকে চিরকাল বাঁচিয়ে রাখতে পারবেন না। আপনি ঘরে এয়ার পিউরিফায়ার লাগাতে পারেন, কিন্তু বাইরের বাতাস যদি বিষাক্ত হয়, তাহলে একসময় না একসময় সেই বিষ ঘরে ঢুকবেই। আপনি আপনার সন্তানকে বলতে পারেন, কারো সাথে খারাপ ব্যবহার করো না। কিন্তু সে যখন দেখবে, পাড়ার সবচেয়ে 'সম্মানিত' মানুষটিই সবচেয়ে খারাপ ব্যবহার করে পার পেয়ে যাচ্ছে, তখন আপনার নৈতিক শিক্ষা তার কাছে একটি পরিহাসে পরিণত হবে।
নব্বই দশক পর্যন্ত বাংলাদেশের পাড়া-মহল্লায় 'সমাজ' বলে একটি প্রতিষ্ঠান ছিল। এই সমাজের অভিভাবক ছিলেন শিক্ষক, বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষ বা ক্লাবের সভাপতি। তাদের ক্ষমতা ছিল নৈতিক। তাদের কাছে বিচার নিয়ে যাওয়া যেত। তারা সালিশ করতেন। তাদের একটি সামাজিক বৈধতা ছিল। এই বৈধতা কোনো দলীয় পদ থেকে আসতো না, আসতো ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা থেকে।
এই কাঠামোটি ভেঙে পড়লো কখন? যখন রাষ্ট্রের ভেতরে রাজনৈতিক ক্ষমতার একাধিপত্য প্রতিষ্ঠার লড়াই শুরু হলো। যখন রাজনীতি আর আদর্শ বা নীতির লড়াই থাকলো না, হয়ে গেল ক্ষমতা দখলের এবং ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার একটি নিরন্তর প্রক্রিয়া।
এই প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজন হলো তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তৃত একটি নিয়ন্ত্রণ কাঠামো। এলাকার মসজিদ কমিটি, স্কুল কমিটি, বাজার কমিটি, ক্লাব, এমনকি শবেবরাতের মাহফিল বা পূজা উদযাপন কমিটি পর্যন্ত - সবকিছুই রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়ন্ত্রিত হতে শুরু করলো। যে ছেলেটি আগে পাড়ার ক্রিকেট টুর্নামেন্ট আয়োজন করতো, সে এখন রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় একটি পদ পেল। তার হাতে এলো একটি ক্ষুদ্র কিন্তু কার্যকর ক্ষমতা। সে এখন সালিশ করতে পারে, সে এখন চাঁদা তুলতে পারে, সে এখন ভয় দেখাতে পারে।
এই যে 'ল্যাং মারামারির রাজনীতি' - এই শব্দবন্ধটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। ল্যাং মারা মানে প্রতিপক্ষকে ফেলে দেওয়া। এই ফেলে দেওয়ার সংস্কৃতি যখন রাষ্ট্রের উপর থেকে নিচ পর্যন্ত বৈধতা পায়, তখন সমাজের প্রতিটি স্তরে তা চর্চিত হয়। স্কুলে, পরিবারে, বন্ধুদের আড্ডায়। অপ্রতিমের ঘটনাটি যদি আপনি গভীরভাবে দেখেন, সেখানে আপনি এই ল্যাং মারার সংস্কৃতির একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ দেখতে পাবেন। আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা, ছোট একটি বিরোধ থেকে সহিংসতায় চলে যাওয়া, এবং এই বিশ্বাস যে, জোর যার মুল্লুক তার।
রাষ্ট্র যখন তার নাগরিকদের সহিষ্ণু হতে শেখায় না, প্রতিপক্ষকে নির্মূল করতে শেখায়, যখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো - পুলিশ, প্রশাসন, বিচার ব্যবস্থা - দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, তখন সমাজের ভেতরে একটি বার্তা যায়: ন্যায়বিচার বলে কিছু নেই, আছে ক্ষমতার বিচার। এই বার্তাটি একটি ১৩ বছরের কিশোরের মনেও গেঁথে যায়। সে শেখে, টিকে থাকতে হলে শক্তিশালী হতে হবে, এবং শক্তিশালী মানে পাড়া বা মহল্লার বড় ভাইদের সাথে থাকতে হবে।
যখন সমাজ অভিভাবক ছিল, তখন একটি কিশোর অপরাধ করলে তাকে শাসন করার, বোঝানোর একটি সামাজিক প্রক্রিয়া ছিল। তার বাবাকে ডাকা হতো, স্কুলের শিক্ষককে জানানো হতো। একটি সামাজিক লজ্জার ব্যবস্থা ছিল।
যখন রাজনৈতিক ক্ষমতা অভিভাবক হলো, তখন এই প্রক্রিয়াটি উল্টে গেল। এখন একটি কিশোর যদি ক্ষমতাসীন বলয়ের সাথে যুক্ত থাকে, তবে তার অপরাধকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়। কারণ সে ক্ষমতার একটি বর্ধিত হাত। আর যদি সে ক্ষমতার বাইরে থাকে, তবে তার সামান্য অপরাধকেও বড় করে দেখানো হয়, তাকে উদাহরণ হিসেবে শাস্তি দেওয়া যায়।
এই দ্বৈত নীতিই সমাজের নৈতিক ভিত্তিকে ধ্বংস করে দিয়েছে। এখন আর 'ভালো-মন্দ' বলে কিছু নেই, আছে 'আমাদের লোক' এবং 'ওদের লোক'। এই বিভাজনটি যখন শিশুদের মধ্যে ঢুকে যায়, তখন তারা আর নৈতিকতার ভিত্তিতে বন্ধুত্ব করে না, করে ক্ষমতার ভিত্তিতে। অপ্রতিমের ঘটনায় যে 'বড়দের সাথে মেশা'র কথা বলা হচ্ছে, তা এই ক্ষমতার বলয়ের সাথে মেশাই। একটি ১৩ বছরের শিশু বুঝতে শেখে, স্কুলের ভালো ছাত্র হওয়ার চেয়ে এলাকার বড় ভাইয়ের সাথে একটি সেলফি তোলা বেশি নিরাপত্তা দেয়।
এতো কথা বলবার অর্থ এই নয় যে, প্যারেন্টিং-এর কোনো প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন আছে। কিন্তু প্যারেন্টিং-কে তার সঠিক জায়গায় রাখতে হবে।
প্যারেন্টিং হলো একটি মাইক্রো-লেভেলের চর্চা। এটি একটি শিশুকে ব্যক্তিগতভাবে সাহসী, সংবেদনশীল এবং যুক্তিবাদী হতে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু প্যারেন্টিং একটি ম্যাক্রো-লেভেলের অসুস্থতাকে সারাতে পারে না। আপনি আপনার ঘরের ভেতরে যতই আলো জ্বালান, বাইরে যদি ঘুটঘুটে অন্ধকার থাকে, তাহলে আপনার সন্তানকে একদিন না একদিন সেই অন্ধকারে বেরোতেই হবে।
তাই মূল প্রশ্নটি প্যারেন্টিং-এর নয়, মূল প্রশ্নটি রাষ্ট্রের চরিত্রের।
এজন্য রাষ্ট্রকে কয়েকটি কাজ করতে হবে।
প্রথমত, রাষ্ট্রকে তার দুর্বৃত্তায়ন বন্ধ করতে হবে। রাষ্ট্র যখন নিজেই দুর্বৃত্তদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়, যখন মাদক, চাঁদাবাজি, দখলদারির সাথে রাজনৈতিক ক্ষমতার একটি অলিখিত চুক্তি তৈরি হয়, তখন সমাজের প্রতিটি শিশু সেই দুর্বৃত্তায়নের সংস্পর্শে আসে। রাষ্ট্রকে এই চুক্তি ভাঙতে হবে। আইনের শাসনকে দলীয় বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠতে হবে।
দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক ক্ষমতা চর্চার অপসংস্কৃতি পাল্টাতে হবে। রাজনীতি মানে যদি শুধুই প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার খেলা হয়, তাহলে সেই খেলা সমাজের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়বে। রাজনীতিতে সহনশীলতা, প্রতিপক্ষের প্রতি সম্মান, এবং নিয়মতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে গণতন্ত্র না থাকলে, রাষ্ট্রে গণতন্ত্র থাকে না, সমাজেও থাকে না।
তৃতীয়ত, সমাজকে তার স্পেস ফিরিয়ে দিতে হবে। রাষ্ট্রের এই সর্বগ্রাসী আধিপত্য কমাতে হবে। একটি স্কুল কমিটি কেন রাজনৈতিক বিবেচনায় গঠিত হবে? একটি মসজিদ কমিটি বা একটি খেলার মাঠের কমিটি কেন দলীয় কার্যালয় থেকে নিয়ন্ত্রিত হবে? সমাজের নিজস্ব প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। শিক্ষককে শিক্ষক থাকতে দিতে হবে, তাকে দলীয় কর্মী বানানো যাবে না। পাড়ার বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষটির সামাজিক মর্যাদাকে ফিরিয়ে আনতে হবে। যখন সমাজ তার নিজের অভিভাবকত্ব ফিরে পাবে, তখনই শিশুরা একটি সুস্থ পরিবেশে বড় হওয়ার সুযোগ পাবে।
শেষ পর্যন্ত, অপ্রতিমের মৃত্যু আমাদের একটি কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়। আমরা কি একটি ঘটনাকে একটি বিচ্ছিন্ন 'পারিবারিক ব্যর্থতা' হিসেবে দেখে দায়মুক্ত হতে চাই, নাকি এই ঘটনাকে একটি আয়না হিসেবে দেখতে চাই, যেখানে আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের অসুস্থ চেহারাটি ফুটে উঠেছে?
প্যারেন্টিং নিয়ে আলাপ তোলা সহজ। কারণ এটি আমাদের ব্যক্তিগত পরিসরে থাকে, এটি আমাদের রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করে না। কিন্তু শুধু প্যারেন্টিং নিয়ে আলাপ করে আমরা মূল সমস্যাকে ইগনোর করছি। আমরা ভুলে যাচ্ছি, একটি শিশু শুধু তার পরিবারে বড় হয় না, সে একটি সমাজে, একটি রাষ্ট্রে বড় হয়। পরিবার যদি হয় একটি নৌকা, সমাজ হলো নদী, আর রাষ্ট্র হলো সেই নদীর স্রোত। নদীর স্রোত যদি উল্টো দিকে যায়, যদি নদীতে বিষ মেশানো থাকে, তাহলে শুধু নৌকার বৈঠা ঠিক করে আপনি খুব বেশি দূর যেতে পারবেন না।
আমাদের নদীটাকে বাঁচাতে হবে। স্রোতটাকে ঠিক করতে হবে। তবেই নৌকাগুলো নিরাপদে চলবে।
২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬